kalerkantho


‘বাঙালির বিশ্বকাপ’ শুরু আজ

সনৎ বাবলা   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘বাঙালির বিশ্বকাপ’ শুরু আজ

এ দেশের ফুটবল ঠেকে আছে সাফে গিয়ে। একটুও আগে বাড়তে পারেনি, বরং খানিকটা পিছিয়েছে। ১৫ বছর আগে এই টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতার পর রং হারিয়েছে বাঙালির ফুটবল। হারিয়েছে আঞ্চলিক পরাশক্তির আসনটিও। গত তিন আসরে সেমিফাইনালে গ্রুপ পর্ব উতরাতে না পারার ব্যর্থতায় রসাতলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে ফুটবলের। এ প্রেক্ষাপটে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ হয়ে গেছে বাঙালির বিশ্বকাপসম টুর্নামেন্ট। ফুটবলের মানদণ্ড এটাই। জিতলে সাড়া পড়বে, গলাগলি হবে আর হারলে গালাগাল! এই শঙ্কা ও সম্ভাবনা মাথায় নিয়েই আজ বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে শুরু হচ্ছে বাঙালির সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। আসরের প্রধান পৃষ্ঠপোষক উত্তরা মোটরস।

এটা আসলে বাঙালিরই টুর্নামেন্ট। এই খেলাকে নিয়ে তারা যেভাবে মাথায় তুলে নাচে, খেলোয়াড়রা যে রকম টেনশন অনুভব করে আর সংবাদমাধ্যম যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেটা আর কোনো দেশের বেলায় হয় না। একসময় একই ফুটবল সমতলে দাঁড়ানো ভারত এখন এ টুর্নামেন্টের রোমাঞ্চ গায়ে মাখে না। সাতবার জিতলে যা হয় আর কী। একবারের জয়ী বাংলাদেশের সেই অহমিকা দেখানোর সুযোগ নেই। এবারের বাস্তবতা বরং আরো কঠিন। স্বাগতিক হয়ে খেলবে, সবাই নিজের দলের খেলা দেখতে মাঠে আসবে। জনতার মন রাঙানোর সুযোগ এটাই। প্রতিপক্ষ সেই ভুটান, ২০১৬ সালে যাদের কাছে ৩-১ গোলে হেরে ফুটবলের যে লেজে-গোবরে অবস্থা হয়েছিল। দেড় বছর পর আজ তার শোধ নেওয়ার ম্যাচ! বাংলাদেশের ইংলিশ কোচ জেমি ডে ম্যাচটাকে আর দশটি সাধারণ ম্যাচের মতো করে দেখানোর চেষ্টা করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ভুটান হারের সেই ট্র্যাজেডি দগদগে ঘা হয়ে আজও খোঁচাবে তপু-মামুনুলদের। ভেতর থেকে জাগিয়ে তুলবে লড়াইয়ের নতুন সঞ্জীবনী। হারের প্রতিশোধ জয় দিয়ে হলেই জমে যায় ‘বাঙালির বিশ্বকাপ’। ফুটবল পিপাসুরা আবার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের পথ ধরবে, গ্যালারিতে হুল্লোড় উঠবে। বাংলাদেশ দলও বাড়তি আত্মবিশ্বাস নিয়ে নামবে পরের দুই ম্যাচে পাকিস্তান ও নেপালের বিপক্ষে। দশ বছর পর সেমিতে উত্তোরণের স্বপ্ন ফিরবে বাস্তব হয়ে।

তবে পাকিস্তানও ঢাকায় এসেছে ফুটবলের রং বদলানোর ব্রত নিয়ে। তিন বছর পাকিস্তানের জাতীয় দল নামের কোনো বস্তু না থাকলেও তাদের ব্রাজিলিয়ান কোচ জোসে অ্যান্থোনিও নোগেইরোর লক্ষ্য সেমিফাইনাল, ‘নানা কারণে অনেক দিন খেলার বাইরে ছিল দলটি। এখন এই দলটা গঠন করছি কাতার বিশ্বকাপ বাছাই সামনে রেখে। আমাদের আপাতত লক্ষ্য সেমি-ফাইনাল। এই গ্রুপ থেকে সেমিতে ওঠা কঠিন। তার পরও আমরা চাই সেমি-ফাইনালে খেলতে।’ এশিয়ান গেমসে পাকিস্তান হারিয়েছে নেপালকে। আবার নেপালের সঙ্গে আছে নতুন প্রেরণা। ২০১৬ সালে তারা এখান থেকে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ জিতে ফিরেছে। সেই প্রাইজমানির অর্ধেক বকেয়া থাকলেও তাদের সেই আত্মবিশ্বাসে তো কেউ ভাগ বসাতে পারেনি।

বাংলাদেশের গ্রুপে চারটি সমমানের দল হওয়ায় আগাম কিছু বলা কঠিন। তুলনায় ‘এ’ গ্রুপটা যেন পরিষ্কার। ভারত, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে সেমিফাইনালে ফেভারিট প্রথম দুই দল। সেখানে ভারত এসেছে অনূর্ধ্ব-২৩ দল নিয়ে। সুবাদে মালদ্বীপকে কেউ কেউ টুর্নামেন্ট ফেভারিট ভাবছে। কিন্তু মালদ্বীপের কোচ পিটার সেগ্রেট অত সরলীকরণ করে ভাবতে চান না, ‘সম্প্রতি ভারতের অনূর্ধ্ব-২০ দল হারিয়েছে আর্জেন্টিনাকে। সুতরাং এত সরলভাবে বিশ্লেষণে গেলে হবে না। তবে আমরা একটা ভবিষ্যতের দল তৈরি করছি। এখানে যারা এসেছে তাদের সম্মান জানাতে হবে, একটা ভালো টুর্নামেন্ট খেলতে এখানে এসেছে তারা।’ তবে মালদ্বীপে এই ক্রোয়েশিয়ান বংশোদ্ভূত জার্মান কোচের সমালোচনা হচ্ছে আলী আশফাককে দলের বাইরে রাখায়।

দক্ষিণ এশীয় ফুটবলে আলী আশফাক বিশাল তারকা। সাফ টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ২০ গোলের মালিক তিনি। তাঁর সামর্থ্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, ভারতীয় হলে প্রচার-প্রসারের গুণে আকাশ-উচ্চতা হতো! দুই পায়ে যার এমন জাদুর পরও একটু বয়স হয়ে গেছে বলে কি না দলের বাইরে। বটবৃক্ষের বয়সের চেয়ে ছায়াটাই যে অনেক বড়। সেই ছায়া উপেক্ষা করার মতো সাহস দেখিয়েছেন মালদ্বীপের কোচ! আর বাংলাদেশের ইংলিশ কোচ তিন মাস ধরে কাজ করে এমন এক ছায়াতল খুঁজে পাননি। গোলের কথা বললে তিনি হাসেন। যে গোল ম্যাচ জেতায়, সেই গোলের মানুষটিরই খোঁজ পাননি এখনো। দেশে চরম স্ট্রাইকার সংকটে জেমির বাজি এশিয়াডের দল। এশিয়ান গেমসে ইতিহাস গড়া তরুণদের হাতে এখন লাল-সবুজের পতাকা।

অনেকের আশা, তাদের হাত ধরেই ১৫ বছর পর ফিরবে সাফ শিরোপা। স্বপ্নে লাগাম দিয়ে সেমিফাইনালে রাখলেই বরং স্বাগতিক দর্শকদের জন্য টুর্নামেন্টটা উপভোগ্য হবে। এটুকু হলেই উত্তোরণ, এর চেয়ে বেশি হলে গৌরবের। তবে আয়োজক হিসেবে ইতিমধ্যে প্রশ্নের মুখে পড়েছে তাদের মান। সব সময় দলগুলোকে নিয়ে সাফের আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনটি হয় পাঁচতারা হোটেলের বড় হলঘরে। আগে ঢাকাসহ অন্যান্য দেশেও তাই হয়েছে। কিন্তু সেটি গতকাল হয়েছে বাফুফের ছোট সম্মেলন কক্ষে, যেখানে মানুষে ঠাসাঠাসি অবস্থা। মাইকে গোলযোগ তো আছেই। ভজঘট নাকি বাফুফেরই, আয়োজন বাবদ সাফের দেওয়া সাড়ে তিন লাখ ডলার থেকে ‘টাকা বাঁচানোর’ ধান্ধা শুরু করেছে। ‘বাঙালির বিশ্বকাপ’ থেকে ফুটবলাররা খুঁজছে গৌরব আর বাফুফে খুঁজছে টাকা!



মন্তব্য