kalerkantho


জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্যোগ মোকাবেলায় ডেল্টা প্ল্যান ২১০০

♦ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে আজ অনুমোদন
♦ ২০৩১ সালের মধ্যে প্রথম ধাপ বাস্তবায়ন

আরিফুর রহমান   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্যোগ মোকাবেলায় ডেল্টা প্ল্যান ২১০০

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতির আচরণ। বাড়ছে লবণাক্ততা। বৃষ্টিপাতের ধরনে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। শীতকালের পরিধি কমে এসেছে। ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে বন্যা। জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। প্রকৃতির এই বৈরী আচরণ মোকাবেলায় ১০০ বছর মেয়াদি বদ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ নামের মহাপরিকল্পনাটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় উত্থাপন করা হচ্ছে। রাজধানীর শেরেবাংলানগরে অনুষ্ঠেয় সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে।

আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ১০ বছরের প্রেক্ষিত পরিকল্পনার পর এবার গ্রহণ করে শতবছর মেয়াদি বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা (ডেল্টা প্ল্যান ২১০০)। মহাপরিকল্পনাটি গ্রহণ করা হয় ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডসের বদ্বীপের আদলে। ২৬টি গবেষণাপত্র তৈরি করে চার বছর ধরে সেগুলোর ওপর অর্থনীতিবিদ, পানি, জলবায়ু বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক শেষে পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বদ্বীপ পরিকল্পনায় ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য ৮০টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫টি ভৌত অবকাঠামোর প্রকল্প ও ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দক্ষতা ও গবেষণাবিষয়ক প্রকল্প। বাস্তবায়নে খরচ ধরা হয়েছে তিন হাজার ৭০০ কোটি ডলার; বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ তিন লাখ কোটি টাকারও বেশি।

কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, একসঙ্গে নয়; বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে বদ্বীপ পরিকল্পনা। প্রথমে ২০৩১ সাল নাগাদ, এরপর ২০৫০ সাল নাগাদ, এরপর ২১০০ সাল পর্যন্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। পাঁচ বছর পর পর পুরো বদ্বীপ পরিকল্পনার তথ্য হালনাগাদ করবে কমিশন। বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কত টাকা খরচ হতে পারে, তারও একটি ধারণা দিয়েছে জিইডি। বলা হয়েছে, বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিবছর দেশজ আয়ের ২.৫ শতাংশ অর্থের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে এই ব্যয় দেশজ জাতীয় আয়ের মাত্র ০.৮ শতাংশ। এই টাকা কোথা থেকে আসবে তারও পথ বাতলে দিয়েছে কমিশন। বলা হয়েছে, প্রতিবছর জাতীয় আয়ের ২.৫ শতাংশের মধ্যে ২ শতাংশ জোগান দিতে হবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। বাকি ০.৫ শতাংশ আসবে বেসরকারি খাত থেকে। বদ্বীপ পরিকল্পনাটি তৈরিতে নেদারল্যান্ডস সরকার এরই মধ্যে ৮৭ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

জিইডি সদস্য ড. শামসুল আলম (সিনিয়র সচিব) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহ ও নির্দেশনায় আমরা নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতায় ২০১৪ সালে প্রথম বদ্বীপ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করি। পরিকল্পনাটি তৈরি করতে গিয়ে আমরা ২৬টি গবেষণাপত্র প্রণয়ন করেছি। সব মহলের সঙ্গে কথা বলে দলিলটি প্রণয়ন করা হয়েছে।’ শামসুল আলম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সেদিক মাথায় রেখে আমরা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি। এটি একটি যুগান্তকারী ঐতিহাসিক দলিল। এই দলিল সামনে রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারলে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব।’

ষাটের দশক থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পর গত ৪৭ বছরে দেশে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, কৃষি উন্নয়নে বহু নীতি-কৌশল ও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর পরও কেন বদ্বীপ পরিকল্পনা? পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাধীনতার পর যত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তা অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে নেওয়া হয়েছে। বদ্বীপ পরিকল্পনায় সারা দেশের চিত্র তুলে আনা হয়েছে। নদ-নদী, পানি, জলাভূমি, মাটি, পাহাড়, সমতল, হাওরসহ সব দিক বিশ্লেষণ ও গবেষণা করে বদ্বীপ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সে কারণে সময়ও বেশি লেগেছে। উদাহরণ দিয়ে কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ৬৪ জেলার মধ্যে কোন জেলা কম ঝুঁকিতে আর কোন জেলা বেশি ঝুঁকিতে আছে, তার একটি বিশদ তালিকা করা হয়েছে বদ্বীপ পরিকল্পনায়; যেটি আগে কখনো হয়নি। গাজীপুর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ময়মনসিংহ, নীলফামারী ও শেরপুর—এই সাতটি জেলা সমুদ্র ও প্রবহমান নদী থেকে অবস্থানগত দূরত্বের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ঝুঁকিমুক্ত। এ ছাড়া বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ জেলা ১৮টি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এমন উপকূলীয় জেলা ১৯টি, হাওর ও আকস্মিক বন্যাকবলিত জেলা সাতটি, নদী অঞ্চল ও মোহনাবেষ্টিত জেলা ২৯টি, নগর এলাকা সাতটি এবং পার্বত্য জেলা তিনটি। সরকার চাইলে ঝুঁকিপূর্ণ জেলার তালিকা ধরে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে। ডেল্টা প্ল্যানের বিষয়টি গত রবিবার গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এই পরিকল্পনার গুরুত্বও উল্লেখ করেন।

কমিশনের দেওয়া তথ্য মতে, বদ্বীপ পরিকল্পনায় ছয়টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার কৌশলের বিষয়ে। এর পরে পানি নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া টেকসই নদী অঞ্চল, জলাভূমি সংরক্ষণ, আন্তর্দেশীয় নদীর পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কথাও বলা হয়েছে বদ্বীপ পরিকল্পনায়।

পরিকল্পনা কমিশন মনে করে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে হলে অভিন্ন ৫৭ নদীর সন্তোষজনক অগ্রগতি অপরিহার্য। যেকানো উদ্বেগ, অভিযোগ এবং তথ্যবিনিময়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে কৌশলগত সংলাপেরও বিকল্প নেই বলে মত কমিশনের। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে অভিন্ন নদীর সমস্যা সমাধানের জন্য কূটনৈতিক ও প্রায়োগিক দক্ষতা দুটিই প্রয়োজন। বহুমুখী নদী অববাহিকা প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে এই দক্ষতার বিকল্প নেই। যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে জিইডি। এ ছাড়া ভাটির দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ উজানের দেশগুলোর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ক্ষতিকর প্রভাবে বেশ কিছু বাস্তব ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবেলায় কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর জোর দিতে বলেছে কমিশন।

জিইডির করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রধান ৩২টি নদীর পানির গুণগত মান বেশ খারাপ, যা গুরুতর পরিবেশগত অবনতি ঝুঁকিতে। এ ছাড়া দেশের ১৩ শতাংশ সরবরাহ করা পানিতে এখনো আর্সেনিক সমস্যা আছে। আরো নতুন নতুন নদী শিল্পায়ন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, নগরায়ণ, লবণাক্ততাসহ বিভিন্ন ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা কমিশনের। তাই নদ-নদী রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে বদ্বীপ পরিকল্পনায়।

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতার আলোকে কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ গঠন করবে ডেল্টা নলেজ ব্যাংক। তাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তথ্য নিয়ে একটি ডিজিটাল লাইব্রেরি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বদ্বীপ পরিকল্পনা অনুমোদনের পর ডেল্টা আইন তৈরির কাজ শুরু হবে। এ ছাড়া ডেল্টা তহবিল ও স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা সংগঠনের কাজও একই সময়ে শুরু হবে।

পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য ও জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা করে স্বাদু পানির নদীর বিষয়ে বিশদভাবে বলা হয়েছে। এ ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, নদী অঞ্চল ও মোহনা, নগর অঞ্চল এবং আন্তর্দেশীয় নদী নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনায় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, উজানের পানিপ্রবাহের বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে দেশের অভ্যন্তরে বাঁধ বা ব্যারাজ নির্মাণ করা যেতে পারে। তবে পানিসংক্রান্ত সমস্যা কূটনৈতিকভাবেই সমাধানের পরামর্শ কমিশনের। কমিশন আরো পরামর্শ দিয়েছে, বদ্বীপ পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আনতে হবে। সংস্থাগুলোর সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, কৃষি, এলজিইডি, বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কমিশন থেকে।



মন্তব্য