kalerkantho


আন্দোলন, নির্বাচন ও বড় ঐক্যের পথেই বিএনপি

এনাম আবেদীন    

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



আন্দোলন, নির্বাচন ও বড় ঐক্যের পথেই বিএনপি

নির্বাচন নিয়ে সংলাপের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কোনো আশা না দেখলেও রাজনৈতিক কৌশলে আপাতত কোনো পরিবর্তন আনবে না বিএনপি। দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার নির্দেশিত পথেই হাঁটবে দলটি। অর্থাৎ আন্দোলন ও নির্বাচন প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের’ ওপরই জোর দেবে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির একাধিক সিনিয়র সদস্যের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের এমন মনোভাবের কথা জানা গেছে।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে গত ২৫ আগস্ট কারাগারে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই দিন এক ঘণ্টার আলাপে আন্দোলন ও নির্বাচন প্রস্তুতির পাশাপাশি বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়টিও দ্রুত নিষ্পত্তি করার তাগিদ দেন খালেদা জিয়া।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি কারো নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সরকারপ্রধান আরো বলেন, নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার সিদ্ধান্ত বিএনপির নিজস্ব। তাদের বাধা দেওয়ার কিছু নেই, দাওয়াত দেওয়ারও কিছু নেই।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তাঁর এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আরো গণবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। তাঁর ও সরকারের এই রিজিড (কঠোর) সিদ্ধান্ত দেশকেও  সংঘাতের দিকে নিয়ে যাবে।’

বিএনপির দাবি নাকচ হওয়া প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সব সময়ই নাকচ করে আসছেন, এ আর নতুন কী! অতীতেও নাকচ করেছেন আবার কথাও বলেছেন। রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপির কর্মকৌশল নিয়ে এখনো দলীয় ফোরামে আলোচনা হয়নি। তবে খালেদা জিয়ার নির্দেশনা অনুযায়ী আন্দোলন ও নির্বাচন এবং জাতীয় ঐক্যের বিষয়টিতে বিএনপি গুরুত্ব দেবে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও প্রায় একই রকম মন্তব্য করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আলোচনা হবে না বলেছেন। কিন্তু বিএনপি তো কোনো আলোচনা বা সংলাপের প্রস্তাব এখনো দেয়নি। বিএনপি কিছু দাবিদাওয়া উত্থাপন করেছে। এখন সরকার না মানলে বিএনপির কী করণীয় আছে! বিএনপি আন্দোলন করবে, নির্বাচনেরও প্রস্তুতি আছে। দেখা যাক সময় আছে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামে কোনো বৈঠক হয়নি। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত বিএনপি অপেক্ষা করবে। এরপর সিদ্ধান্ত নেব, যাব কি যাব না। তবে তার আগে আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি থাকবে।’

নেতাকর্মীরা চাঙ্গা : জানা গেছে, গত ১ সেপ্টেম্বর নয়াপল্টনে বিশাল জনসভা করার মধ্য দিয়ে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। দলটির মধ্যে আলোচনা হলো বিএনপি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জানা যায়, ঢাকায় শীর্ষস্থানীয় নেতাদের পাশাপাশি লন্ডনে বসবাসরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জনসভাটি সংগঠিত করার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করেছেন। আর ব্যাপক জনসমাগম হওয়ায় দলটির নেতারাও কিছুটা বিস্মিত হয়েছেন। কারণ তাঁরা আশা করেননি যে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ ওই জনসভায় অংশ নেবে। ফলে এ ঘটনায় নেতাকর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরেছে। এটি আগামী দিনে সরকারবিরোধী আন্দোলনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে বিএনপি।

দলটির নেতাদের মতে, শুধু ঐক্যবদ্ধ থেকে এগোতে পারলে এবং সর্বশেষ জনসভার মতো এখন থেকে সংগঠিত হতে থাকলে গ্রেপ্তার-নির্যাতন করে সরকার বিএনপিকে খুব বেশি কাবু করতে পারবে না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতে, ১২ বছর যাবৎ বিএনপি অত্যাচার-নির্যাতনের মধ্যে আছে। আগামী দিনে আরো বাড়তে পারে। কিন্তু এসব উপেক্ষা করেই বিএনপি এগিয়ে যাবে।

এ ছাড়া নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ‘অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করছে বিএনপি। সর্বশেষ কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের ‘স্বরূপ’ উন্মোচিত হয়েছে বলেও মনে করে দলটি। পাশাপাশি বিকল্পধারা, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য প্রতিষ্ঠা হলে রাজনৈতিকভাবে তাদের শক্তি আরো বেড়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির তুলনায় সরকার এবার নির্বাচনের আগে অনেক বেশি চাপে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত কিছু দাবি মেনে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে রাজি হবে বলে মনে করেন বিএনপির নেতারা। তাই তফসিল ঘোষণার আগে ও পরের সময়টিতে হরতাল-অবরোধ দিয়ে সরকারকে কঠোর চাপে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।

আন্দোলন প্রস্তুতির পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতিও কৌশলগত বলে জানা যায়। কারণ দলটি মনে করে, আলোচনার সম্ভাবনা সরকার এখন যতই নাকচ করুক, একপর্যায়ে চাপের মুখে কিছু না কিছু দাবি মানতে তারা বাধ্য হবে। বিশেষ করে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন দেওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে। ফলে হঠাৎ করে দাবি মানা হলে নির্বাচনে যেতে বিপত্তি এড়াতে মনোনয়নসংক্রান্ত বিষয় ছাড়াও নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজটি বিএনপি করে রাখছে।

এদিকে বিরোধী পাঁচটি দলের শীর্ষ পাঁচ নেতাকে নিয়ে শনিবার প্রধানমন্ত্রীর করা মন্তব্যেও খুশি বিএনপি। দলটি মনে করে, জামায়াতসহ কিছু ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব থাকলেও প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের নেতাদের নেতিবাচক বক্তব্য তাদের ঐক্যপ্রক্রিয়াকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, ‘সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে তাঁদের (আওয়ামী লীগ) দলের ছাড়া অন্য দলের কাউকে তাঁরা মানুষই মনে করেন না। তাই উদারপন্থী দলগুলোরও এখন মনে হবে যে আমাদের মধ্যে ঐক্য ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।’ তাঁর মতে, সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্য ঐক্যপ্রক্রিয়া আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।

অবশ্য এ বিষয়ে বেশ কৌশলী জবাব দেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে ঐক্যের কথাবার্তা বা আলোচনা চলছে এটি ঠিক। তবে সরকার কোনো দিকে ঠেলে নিয়ে গেলে সেদিকে যাব, এমন কথা নেই। রাজনীতি যেদিকে থাকবে সেদিকেই আমরা যাব।’



মন্তব্য