kalerkantho


সড়কে মৃত্যুর মিছিল

তবু বেপরোয়া চালকরা

পার্থ সারথি দাস   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



তবু বেপরোয়া চালকরা

ফাইল ছবি

নাটোর-পাবনা মহাসড়কে গত ২৫ আগস্ট বাস ও লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। ওই ঘটনায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গঠিত ১০ সদস্যের তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব সফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটির সদস্যরা সর্বশেষ ঘটনাস্থলে যান গত মঙ্গলবার। সফিকুল ইসলাম গতকাল রবিবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, লেগুনাচালকের বেপরোয়া ও ভুল চালনার কারণেই ওই দুর্ঘটনা ঘটেছে। চালকের কোনো বৈধ লাইসেন্স ছিল না। এ ধরনের হালকা যানবাহন মহাসড়কে নিষিদ্ধ। তার পরও পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলছে।

জানা যায়, নাটোরগামী বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে বিপরীত দিকে থেকে আসা যাত্রীবাহী লেগুনাটি দুমড়েমুচড়ে গিয়েছিল আরা বাসটিও পড়ে গিয়েছিল পাশের খাদে। তাতে লেগুনার চালক আব্দুর রহিমও নিহত হন। ওই দুর্ঘটনার তদন্ত করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) স্থানীয় কর্মকর্তারাও। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, লেগুনাটি ছাড়ার পর থেকে এলোমেলোভাবে চালাচ্ছিলেন চালক। দুর্ঘটনার সময় চালক মোবাইল ফোনে কথাও বলছিলেন।

বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ওই লেগুনার কোনো নিবন্ধনই ছিল না। চালকেরও লাইসেন্স ছিল না। দুর্ঘটনার সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ছিল। মহাসড়কের ওই অংশ মোটামুটি ভালো। দুর্ঘটনার স্থানে কোনো বাঁক নেই। তদন্তে দেখা গেছে, লেগুনার চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার ডান দিকে চলে গিয়েছিলেন, তখন বিপরীত থেকে বেপরোয়া গতিতে আসা বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন অধিদপ্তর ও সংস্থা তৎপরতা বাড়িয়েছে। একের পর এক সভা হচ্ছে। রাস্তায় জোরদার করা হয়েছে অভিযান। এর পরও থেমে নেই সড়কে প্রাণহানি। প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ১০ জনের প্রানহানি ঘটছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি নানা উদ্যোগের মধ্যেও ঈদের আগে ও পরে ১৩ দিনে ২৩৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত এবং ৯৬০ জন আহত হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হওয়ার দিন থেকে এক মাসের মধ্যে সড়কে প্রাণহানির নেপথ্যে চালকের অযোগ্যতা, মহাসড়কে নিষিদ্ধ যানবাহনের যাত্রী পরিবহন, চালকের বেপরোয়া ও ভুল গাড়ি চালনার তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৩ দিনে এত দুর্ঘটনার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের গাড়ির মধ্যে ৬.৬ শতাংশ ছিল নসিমন-করিমন, ৫.৯ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজি বাইক এবং ১১.১৫ শতাংশ ছিল অটোরিকশা।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরও সড়কে শৃঙ্খলা আসেনি, সড়ক নিরাপদও হয়নি। এ জন্য বিভিন্ন সংস্থার দায় নির্দিষ্ট করা আছে। দায়িত্বহীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। পাশাপাশি পরিবহন নেতাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে শুরু করে সবাই সড়ক নিরাপত্তা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে যখন রাত-দিন গলদঘর্ম তখনও কিছু অসাধু অতি লোভী মালিক ও পরিবহন শ্রমিকের বেপরোয়া মানসিকতায় সড়কে নৈরাজ্য ও হত্যা থামানো যাচ্ছে না। পরিবহন শ্রমিকরা যেন আক্রোশ মেটাচ্ছে অথবা কেউ তাদের উসকে দিচ্ছে। বেশির ভাগ দুর্ঘটনার বড় কারণ অতিরিক্ত গতি। এ জন্য চালক দায়ী। তারা বেশি ট্রিপ দিতে চায়। মালিকদের বলা হয়েছে চালকদের একটানা গাড়ি চালাতে বাধ্য না করতে। সরকার নির্দেশ দিলেও তারা এটা মানছে না।’ 

সরকার ২০১৫ সালের আগস্টে প্রজ্ঞাপনে বলেছিল, অটোরিকশাসহ তিন চাকার যানবাহন চলতে পারবে না ২২টি জাতীয় মহাসড়কে। তার পরও এসব যানবাহন চলছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে লেগুনা ও অটোরিকশার চলাচল এখন আগের চেয়ে বেশি। গত ২৪ আগস্ট মহাসড়কের ফেনী অংশে শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ছয়জন যাত্রীর প্রাণ যায়। বিআরটিএর মাঠপর্যায়ের তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, দুটি যানবাহনই চট্টগ্রামের দিকে ছুটছিল। দুর্ঘটনাস্থল থেকে ৭০ থেকে ১০০ মিটার দূরে থাকা পুলিশ সদস্যরা অটোরিকশাকে থামতে সংকেত দেন। অটোচালক মহাসড়কের বাঁ পাশে না থেমে ডান দিকে দ্রুত ঘুরিয়ে নেয়। অটোরিকশাটি রাস্তার মাঝখানে চলে যায় এবং বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ওই সময় বাসের গতিও ছিল বেশি।

সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মধ্যেও যাত্রীদের বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হচ্ছে। গত ২৭ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগরীর সিটি গেট এলাকায় রেজাউল করিম রনিকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। এতে প্রাণ হারান রেজাউল। তিনি বাঁশবাড়িয়া থেকে ফিরতি পথে ভাটিয়ারী নেমে সেখান থেকে ৪ নম্বর বাসে করে সিটি গেটের দিকে ফিরছিলেন। পথে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি ঝগড়ায় রূপ নিয়েছিল। রেজাউল বড় ভাইকে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানান। এর কিছু সময় পর বাস থেকে ফেলে দেওয়া হয় তাঁকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, রেজাউলকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ফেলে দেওয়ার পর যাত্রীরা বাস থামাতে বললেও চালক বাস দ্রুত চালাচ্ছিল। ১০০ মিটার সামনে গিয়ে সিটি গেটের কাছে বাস থামিয়ে চালক ও সহকারী পালিয়ে যায়। চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে রেজাউলকে হত্যার ঘটনায় হেলপার মানিক সরকারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত শনিবার ভোরে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগড় উপজেলার হাজিরহাটে অভিযান চালিয়ে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগে ২১ জুলাই ঢাকায় যাওয়ার পথে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র সাইদুর রহমান পায়েলকে বাস থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। গত মঙ্গলবার কুষ্টিয়া শহরের চৌড়হাস মোড়ে আট মাসের সন্তান আকিফাকে কোলে নিয়ে সড়ক পার হচ্ছিলেন মা রিনা খাতুন। ওই সময় একটি চলন্ত বাসের ধাক্কায় কোল থেকে দূরে ছিটকে পড়ে শিশু আকিফা। বাসটি রাজশাহী থেকে ফরিদপুরের দিকে যাচ্ছিল। কুষ্টিয়া শহরের চৌড়হাস মোড়ে যাত্রী ওঠানোর জন্য সেটি দাঁড়িয়ে ছিল। রিনা থেমে থাকা বাসের সামনে দিয়ে আকিফাকে কোলে নিয়ে সড়ক পার হচ্ছিলেন। কোনো শব্দ না করে, হর্ন না বাজিয়ে বাসটি চলতে শুরু করলে বাসের ধাক্কায় আকিফা সড়কে ছিটকে পড়ে। তবে বাসচালক দ্রুত পালিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা ছুটে গিয়ে আকিফাকে উদ্ধার করে। পরে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান রিনা। চিকিৎসকদের পরামর্শে আকিফাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হলেও গত বৃহস্পতিবার মারা যায় শিশুটি। দুর্ঘটনার কারণ জানতে ঘটনাস্থলে যাবে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রধান সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ সপ্তাহের শেষ দিকে আমরা তদন্তে নামব।’

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লাইসেন্স আছে, এমন চালকও বেপরোয়া। কারণ অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর এত বেশি লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে যে তা যোগ্য ব্যক্তিদের দেওয়া হচ্ছে কি না এ নিয়ে সন্দেহের কারণ আছে।’

ঈদুল আজহার আগে ও পরে নরসিংদী, ফেনী ও নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের করা তদন্ত কমিটির সদস্যরা এরই মধ্যে নাটোর ও ফেনীতে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। জানা গেছে, ওই সব সড়ক দুর্ঘটনার পরই সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বলেছেন দ্রুত তদন্ত করতে। কুষ্টিয়ায় মায়ের কোলের শিশুর প্রাণহানির পর মন্ত্রী সেই ঘটনারও তদন্ত করতে বলেছেন মন্ত্রণালয়ের কমিটিকে।

ঢাকায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার স্থানের কাছে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে গত ১ জুলাই বসুমতি পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় নিহত হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র এস এম শাহরিয়ার সৌরভ সেজান। তিনি মিরপুর ডিওএইচএসের বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে আশকোনার উদ্দেশে বেরিয়েছিলেন। ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি সাহান হক বলেন, ওই ঘটনায় মামলার তদন্ত চলছে। চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ২ জুলাই সকালে মিরপুরে চিড়িয়াখানা এলাকায় বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহত হন রিকশার যাত্রী সৈয়দ মাসুদ রানা। তিনি বিইউবিটির বিবিএর চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। এক মাসেও তদন্ত শেষ হয়নি। শাহ আলী থানার ওসি আনোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ঘটনার দিনই পরে অভিযান চালিয়ে চালককে ধরা হয়। মামলার তদন্ত চলছে।



মন্তব্য