kalerkantho


সড়কে মৃত্যুর মিছিল

গেটম্যান ঘুমে কোথায় ছিলেন স্টেশন মাস্টার?

নুপুর দেব ও এনায়েত হোসেন মিঠু, চট্টগ্রাম    

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



গেটম্যান ঘুমে কোথায় ছিলেন স্টেশন মাস্টার?

গতকাল ভোরে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বারইয়ারহাট লেভেলক্রসিংয়ে একটি বাসে ট্রেনের ধাক্কায় এক বাসযাত্রী নিহত ও ২২ জন আহত হয়েছে। লেভেলক্রসিং থেকে বাসটিকে প্রায় ৫০০ মিটার ঠেলে নিয়ে যায় ট্রেনটি। ছবি : স্টার মেইল

লেভেলক্রসিংয়ের গেট বন্ধ নেই, যাত্রীবাহী বাসটি পার হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তখন এসে একটি ট্রেন বাসটিকে ধাক্কা দেয়। ক্রসিংয়ে গেট আছে, গেটম্যানও আছেন; তাহলে ট্রেন আসার সময় গেট বন্ধ করা হয়নি কেন? এ প্রশ্নই গতকাল রবিবার ঘুরপাক খেয়েছে চট্টগ্রামের রেল কর্মকর্তাদের মধ্যে। মিরসরাইয়ের বারইয়াহাট লেভেলক্রসিংয়ে ভোরে দুর্ঘটনায় এস আলম পরিবহনের বাসটির এক যাত্রী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে ২০ জন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গেটম্যান মোহাম্মদ আরিফ ঘুমিয়ে ছিলেন বলে গেট বন্ধ করা হয়নি। বারইয়াহাট লেভেলক্রসিংয়ের কাছেই চিনকি আস্তানা রেলস্টেশন। নিয়ম অনুযায়ী ট্রেন আসার আগেই গেটম্যানকে অবহিত করবেন এবং গেটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন কাছের স্টেশনে দায়িত্বরত স্টেশন মাস্টার।

দুর্ঘটনার পর সকাল ৮টায় চিনকি আস্তানা রেলস্টেশনের দায়িত্বে আসেন প্রধান স্টেশন কর্মকর্তা মঈনুল হুদা মজুমদার। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওয়াহিদুল আলম তখন স্টেশন মাস্টারের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি একবার বলছেন গেটম্যানকে জানিয়েছেন। আবার বলছেন জানাননি। আসলে কোনটা সত্যি আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানেন না। তবে শুনেছি গেটম্যান আরিফ তখন ঘুমিয়ে ছিল। দুর্ঘটনার পর সে গাঢাকা দিয়েছে।’

স্টেশন মাস্টার ওয়াহিদুল আলমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, স্টেশন মাস্টার ওয়াহিদুল আলমের ‘ভুল ও অবহেলার’ কারণে গতকালের এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাস্থলে যাওয়া পূর্ব রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানা যায়।

পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফিরোজ ইফতেখারকে প্রধান করে বিভাগীয় পর্যায়ে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তিন দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ফিরোজ ইফতেখার বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি। তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার পাহাড়তলী অফিসে আমরা বসব। ওই স্টেশনে তিনজন মাস্টার আছেন। আজকে (গতকাল) স্টেশনে কর্তব্যরত মাস্টার (সহকারী স্টেশন মাস্টার) ছিলেন ওয়াহিদুল আলম। তাঁকে সাময়িক সাসপেন্ড করা হয়েছে।’

লেভেলক্রসিং এলাকার একজন চা দোকানি নাম প্রকাশ না করা শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, আরিফ প্রায়ই রাতের বেলায় গেটরুম বন্ধ করে রাখেন। অনেক সময় মেয়েছেলে নিয়ে ভেতরে আড্ডা দেন। তাঁর করণে বেশ কিছু দুর্ঘটনা এখানে ঘটেছে। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

স্থানীয় লোকজন বলছে, প্রায় রাতেই দায়িত্ব পালন করেন আরিফ। রাত ১টার পরই তিনি ঘুমিয়ে যান। অনেক সময় ট্রেন লেভেলক্রসিং অতিক্রম করার সময় গেট বন্ধ করা হয় না।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের চট্টগ্রামে দায়িত্বরত একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘শুধু গেটম্যানের নয়, স্টেশন মাস্টারেরও এখানে গাফিলতি রয়েছে। আশা করছি তদন্তের পর সব বেরিয়ে আসবে।’

জানা গেছে, বছর দুয়েক আগেও গেটম্যান আর স্টেশন মাস্টারের গাফিলতির কারণে বারইয়াহাট লেভেলক্রসিং এলাকায় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পড়েছিল খাগড়াছড়িগামী ইকোনো বাস সার্ভিসের একটি গাড়ি। সেবার প্রাণ হারিয়েছিল দুজন যাত্রী, আহত হয়েছিল ৩০ জন। তখন একটি তদন্ত কমিটিও হয়েছিল। এই তদন্তের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এড়িয়ে গেছেন। কেউ বলছেন কমিটি হয়েছে জানেন, কিন্তু পরে কী হয়েছে সেটা তাঁরা জানেন না।



মন্তব্য