kalerkantho


ডেইলি সানের গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

পরিকল্পিত শিল্পায়ন ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ কঠিন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



পরিকল্পিত শিল্পায়ন ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ কঠিন

গতকাল ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের কনফারেন্স রুমে ডেইলি সান আয়োজিত ‘পাওয়ার রোডম্যাপ : টার্গেট ২০২১’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য ঘড়ির কাঁটা নয়, অফিসের সময় পরিবর্তনের পরামর্শ এসেছে এক গোলটেবিল বৈঠক থেকে। বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত ওই আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেছেন, গ্রীষ্মকালের জন্য অফিসের একটি সময় এবং শীতকালের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের সভাকক্ষে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সান আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব পরামর্শ দেন। সামিট পাওয়ার লিমিটেডের সহযোগিতায় বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অফিসের সময় পরিবর্তন একটি উপায় হতে পারে এবং প্রস্তাবটি নিয়ে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। এর আগে ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টার জন্য এগিয়ে আনে। কিন্তু ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিয়মটি প্রতিপালনে সমস্যা দেখা দেওয়ায় পরবর্তী সময়ে সরকার সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এবার নতুন করে আলোচনায় উঠে এলো অফিসের সময় পরিবর্তনের বিষয়টি।

ডেইলি সানের সম্পাদক এনামুল হক চৌধুরীর সঞ্চালনায় সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব আহমেদ কায়কাউস, পিডিপির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মঈন উদ্দিন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম তামিম, অধ্যাপক এজাজ হোসেনসহ অন্যরা। পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ মনে করেন, পরিকল্পিত শিল্পায়ন ছাড়া দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা নিশ্চিত করা অনেকটা কঠিন। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া একসময় গ্রাম ছিল। কিন্তু সেসব এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে শিল্প গড়ে ওঠায় বিদ্যুতের চাহিদা হয়ে ওঠে সীমাহীন। গুলশান বারিধারার মতো আবাসিক এলাকাতে বাণিজ্যিক ভবন গড়ে ওঠায় সেখানেও বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। অথচ সাভার আশুলিয়ায় যদি পরিকল্পিত শিল্পায়ন হতো, তাহলে সরকারের কাছে একটি ধারণা থাকত কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। নসরুল হামিদ বলেন, ‘বিদ্যুতের চাহিদার শেষ নেই। মধ্যম আয়ের দেশে যেতে হলে মাথাপিছু দৈনিক এক হাজার ২০০ কিলোওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন। এখন মাথাপিছু আছে ৫০০ কিলোওয়াট। তাই আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে। সঙ্গে দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লে মানবসম্পদ সূচকেরও (এইচডিআই) অগ্রগতি হয়।’ পরিকল্পিত শিল্পায়ন ছাড়া অন্য কোথাও বিদ্যুৎ দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে বলেও মন্তব্য করেন নসরুল হামিদ।

বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব আহমেদ কায়কাউস বলেন, ‘বিদ্যুৎ নিয়ে আমরা ২০৪১ সাল পর্যন্ত একটি পথনকশা তৈরি করছি। দেশে এখন লোডশেডিং নেই। যেটা হচ্ছে, সেটা স্থানীয় সমস্যার কারণে।’ তিনি বলেন, রেন্টাল, কুইক রেন্টালের কারণে দেশে অনেক সমালোচনা হয়েছে। দেশ দেউলিয়া হয়ে যাবে বলে অনেকে মন্তব্য করেছে। কিন্তু দেশ দেউলিয়া হয়নি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কম। অথচ আমাদের দেশে ৩২ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র তেলের ওপর নির্ভরশীল। তেলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে ১৫-১৬ টাকা। আমাদের তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো উচিত। এলএনজির ওপর জোর দেওয়া উচিত। কিন্তু এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে আমাদের দক্ষতা ও সক্ষমতার ঘাটতি ফুটে উঠেছে। ২০১০ সালের একটি উদ্যোগ ২০১৮ সাল লেগে গেছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অফিসের সময় পরিবর্তনের পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে সাগরভিত্তিক না করে ভূমিভিত্তিক এলএনজি স্থাপনের পরামর্শও দেন ম তামিম।

আরেক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক এজাজ হোসেন অভিযোগ করেন, সরকার বলছে, দেশে লোডশেডিং হয় না। কিন্তু এই তথ্য ঠিক নয়। দেশে লোডশেডিং হয়। কিন্তু সরকার সে তথ্য দিচ্ছে না। তিনি বলেন, সরকার বলছে, দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১৭ হাজার মেগাওয়াট। যদি এতই সক্ষমতা থাকে, তাহলে লোডশেডিং হয় কেন?। বিদ্যুতে ট্রান্সমিশন ও বিতরণ লাইনে যে সমস্যা রয়ে গেছে, সেটি সমাধানের পরামর্শ দেন তিনি।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মঈন উদ্দিন বলেন, তিন কোটি ৪২ লাখ পরিবারের মধ্যে আমরা এখন পর্যন্ত তিন কোটি আট লাখ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ফেলেছি। বাকি আছে ৩৪ লাখ। আশা করছি, চলতি অর্থবছরের মধ্যে শতভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি বলেন, পল্লী বিদ্যুতে বড় যে সমস্যা সেটি হলো বাংলাদেশের আবহাওয়া। কোনো ঝড় ও দুর্যোগ এলে তার প্রভাব পড়ে বিদ্যুতের খুঁটির ওপর। বর্ষা মৌসুমে কালবৈশাখীতে পল্লী বিদ্যুতের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ সময় তিনি সাবস্টেশনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর তাগিদ দেন।

সামিট পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‘আমাদের দেশে বিদ্যুতের ট্রান্সমিশন ও বিতরণ লাইন ব্যবস্থা সরকারের হাতে। এ দুটিকে বেসরকারি খাতে দিলে আরো ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব। কোল পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড সিপিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যেগুলো, সেখানে বিদেশ থেকে কয়লা আমদানিতে সমস্যা তৈরি হয় নদীর নাব্য সংকটের কারণে। আমরা মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নে একটি চ্যানেল প্রশস্তের কাজে হাত দিয়েছি। এটি বাস্তবায়ন হলে দৈনিক ৮০ হাজার টন নিয়ে একটি জাহাজ উপকূলে আসতে পারবে। ২০২২ সালের মধ্যে চ্যানেল নির্মাণের কাজ শেষ হবে বলে জানান তিনি। বিজিএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান বলেন, ২০০৯ সালে আমাদের রপ্তানির আকার ছিল এক হাজার ১০০ কোটি ডলার। সেটি বেড়ে এখন তিন হাজার কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। রপ্তানি বাড়ার পেছনে প্রধান হাতিয়ার ছিল বিদ্যুৎ। তিনি বলেন, বাসাবাড়িতে এখন লোডশেডিং দেখা যায় না। তবে শিল্প-কারখানায় এখনো মাঝেমধ্যে লোডশেডিং দেখা যায়। বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এমনটি হচ্ছে বলে জানান ফারুক হাসান। তাই ট্রান্সমিশন ও বিতরণ লাইনে সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।



মন্তব্য