kalerkantho


বগুড়ায় অভির ‘তুফান কাণ্ড’

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বগুড়ায় অভির ‘তুফান কাণ্ড’

কাওসার অভি

গত বছরের আগস্টে বাসা থেকে তুলে নিয়ে মেয়েকে ধর্ষণের পর মা-মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছিল বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান সরকার। বর্বর ওই ঘটনার এক বছর পর সেই বগুড়াতেই এবার প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এক কলেজছাত্রীকে তুলে নিয়ে তার গোপনাঙ্গে ছুরিকাঘাত করেছে বগুড়া শহর যুবলীগের সভাপতির বখাটে ছেলে কাওসার অভি (২২)। এ ঘটনার পর চিকিৎসারত ওই ছাত্রীকে অনবরত প্রাণনাশের হুমকিও দিচ্ছে বখাটে অভি, তার মা ও তার বাহিনীর সদস্যরা। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ ঘটনার পর থেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বর্বর ওই ঘটনার শিকার ছাত্রী ও তার পরিবার। প্রভাবশালী মহল থেকে অসহায় পরিবারটিকে হুমকি দিয়ে বলা হচ্ছে—‘থানা কিংবা মিডিয়ায় অভিযোগ করে কোনো লাভ হবে না। বরং আপস করাই ভালো।’

বখাটে কাওসার অভি বগুড়া শহর যুবলীগের সভাপতি মাহফুজুর রহমান জয়ের ছেলে এবং জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহনের ভাতিজা। তার পরিবারের আরো কয়েকজন সদস্য রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বগুড়া শহরতলির পালশা এলাকার দিনমজুর জাহিদুর রহমানের মেয়ে স্থানীয় একটি কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি বিউটিশিয়ানের কাজ করে। মেয়েটির ওপর নজর পড়ে বখাটে অভির। দীর্ঘদিন ধরে সে মেয়েটিকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। বিষয়টি জানার পর মেয়েকে বখাটে অভির হাত থেকে রক্ষা করতে বিয়ে ঠিক করেন মা-বাবা। বিয়ে ঠিক করার খবর পেয়ে বখাটে অভির বাহিনীর সদস্যরা বৃহস্পতিবার বিকেলে বাদুরতলা এলাকায় যেখানে পার্লারে কাজ করত মেয়েটি সেখানে হানা দেয়।

তারা প্রকাশ্যে মেয়েটিকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় কার্টনারপাড়ার একটি বাসায়। সেখানে দীর্ঘ সময় তাকে আটকে রেখে বখাটে অভির কথায় রাজি হতে বলা হয়। কিন্তু মেয়েটি কোনোভাবে রাজি না হওয়ায় তার শরীরের পেছন দিকের গোপনাঙ্গে ছুরি মারে বখাটে অভি। এরপর তাকে ওই বাড়ি থেকে বের করে  হুমকি দিয়ে বলা হয়, ‘কোথায় কার কাছে কি অভিযোগ করবি কর। কেউ কিছু করতে পারবে না।’ বাড়ি থেকে বের হয়ে মেয়েটি স্থানীয়দের সহযোগিতায় শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেয়। এরপর বৃহস্পতিবার রাতেই মেয়েটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (শজিমেক) ভর্তি করা হয়।

গতকাল শনিবার সকালে বগুড় শজিমেক হাসপাতালের মহিলা সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ঘটনার শিকার মেয়েটি নেই। ভোররাতে মেয়েটি এবং তার পরিবারের সদস্যরা ভয়ে হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে গেছে। পরে শহরতলির পালশা এলাকায় মেয়েটির বাড়িতে গেলে দেখা হয় তার বাবা জাহিদুর রহমানের সঙ্গে। আতঙ্কে প্রথমে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। আশ্বস্ত করলে পরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে মেয়েটি বড়। তিনি একটি সিগারেট কম্পানিতে পার্টটাইম কাজ করেন। পরিবারের হাল ধরতে বড় মেয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি বিউটিশিয়ানের কাজ করে। এর মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে গেল।

তিনি আরো বলেন, ‘শুক্রবার বিকেলে বখাটে অভির মা ১০-১২ জনকে নিয়ে শজিমেক হাসপাতালে এসেছিল। তারা ঘটনাটি আপস করার প্রস্তাব দেয়। পরে হুমকি দিয়ে বলে, মেয়েকে যেন হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে যাই। পুলিশ ও মিডিয়াকে জানালে আমাদের কাউকে বেঁচে থাকতে দেবে না। এসব হুমকির পর প্রাণভয়ে ভোরে হাসপাতাল থেকে মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে আসি।’

এদিকে গতকাল এই বর্বর ঘটনাটি বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূইয়া জানতে পারেন। তিনি অসহায় পরিবারটিকে সব ধরনের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেন। ওই এলাকার পৌর কমিশনার ও প্যানেল চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলামও পরিবারটির সদস্যদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। এসব আশ্বাসের পর গতকাল বিকেলে মেয়েটির বাবা জাহিদুর রহমান বগুড়া সদর থানায় বখাটে অভির বিরুদ্ধে মামলা করেন।

বগুড়া সদর থানার ওসি বদিউজ্জামান জানান, মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। অভিযুক্ত বখাটে অভিকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান শুরু হয়েছে।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূইয়া বলেন, ‘অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। আর ভুক্তভোগী পরিবারটির নিরাপত্তায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



মন্তব্য