kalerkantho


তিস্তায় বাড়ছে প্রতীক্ষা

মেহেদী হাসান   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



তিস্তায় বাড়ছে প্রতীক্ষা

তিস্তা চুক্তি সই নিয়ে বাংলাদেশের প্রতীক্ষার প্রহর বাড়ছে। নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুতে গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে বৈঠকের পর কূটনৈতিক সূত্রগুলোর কাছ থেকে এমন আভাস মিলেছে।

উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তিস্তা চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

গতকাল সকালে কাঠমাণ্ডুতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা হয়েছে বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিমসটেক রিট্রিট সেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট—দুজনই ছিলেন। তাঁরা রোহিঙ্গা ইস্যুতে কথা বলেছেন।’

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে আলোচনা হয়েছে কি না—জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক গতকাল কাঠমাণ্ডুতে সাংবাদিকদের বলেছেন, বিমসটেকে রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। তবে শীর্ষ নেতাদের রিট্রিট সেশনে যে আলোচনা হয়নি, এমনটি বলা যায় না।

বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল দুপুরে ঢাকায় ফিরেছেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সাত দেশীয় কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জোট বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ভারত, মিয়ানমারসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সফর বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠকে উভয় দেশ নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

ভারতীয় সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের আসাম রাজ্যে বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব যাচাইপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন না হতে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছেন। একইভাবে তিনি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে থাকবেন বলে জানিয়েছেন।

তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ নিয়ে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে অগ্রগতির তেমন কোনো ইঙ্গিত মেলেনি। ভারত বরাবরই বলে আসছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি সই করতে ভারত অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু এ চুক্তি সইয়ের জন্য ভারতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক যে ঐকমত্য প্রয়োজন, তা এখনো অর্জিত হয়নি। বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তি সইয়ে এখনো রাজি নন।

গত বছর এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, শুধু তাঁর সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারই তিস্তা ইস্যু সমাধান করতে পারে। বাংলাদেশে চলতি বছরের শেষ দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই হিসাবে শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের মেয়াদ আর প্রায় চার মাস বাকি আছে।

বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময় বলেছেন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি আগামী নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ আশা করে, চুক্তি সই করার মাধ্যমে ভারত তার অঙ্গীকার পূরণ করবে।

তবে ভারতীয় সূত্রগুলো বলছে, ওই দেশেও আগামী বছরের মাঝামাঝি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেই নির্বাচনের আগে তিস্তা চুক্তি সই করা বেশ জটিল। কারণ মমতা বন্দোপাধ্যায়ের যুক্তি হলো—তিস্তার পানিবণ্টন হলে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে। নির্বাচনের আগে তিস্তা চুক্তি সইয়ে তোড়জোড় হলে তার প্রভাব ভারতের নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ভারত জোর দিয়ে বলছে, চুক্তি না হলেও তিস্তার পানিপ্রবাহে তারা কোনো বাধা দিচ্ছে না।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সফরের সময় সে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর ঢাকায় ফিরে গত ৩০ মে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের অঙ্গীকার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি কারো ওপর ভরসা করে চলি না। আমার দেশের পানির ব্যবস্থা কিভাবে করতে হবে, সেটা আমি করে যাচ্ছি। আমি নদীর ড্রেজিং করছি, জলাধার তৈরি করছি।’

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম গত ৭ জুলাই ভারতের প্রভাবশালী নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনে (ওআরএফ) বক্তৃতা অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য এখন আর নির্বাচনী ইস্যু নয়। তিনি আরো বলেন, ‘আজ বা কাল (ভবিষ্যতে বোঝাতে) আনুষ্ঠানিক চুক্তি হবে। আমাদের ধৈর্য ধরা উচিত। এটি দুই প্রতিবেশীর মধ্যে এখন আর কোনো সমস্যা সৃষ্টি করছে না।’

এদিকে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্যগুলোতে কথিত অনুপ্রবেশকারী বা অবৈধ অভিবাসী ইস্যু সম্পর্কে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এটি একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। ২০১৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রচারণার সময়ও এটি গুরুত্ব পেয়েছিল। এবারও এমন প্রচারণার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে এ বিষয়টিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই দেখছে বাংলাদেশ।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা এবং সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার জোরালো আগ্রহ আছে। এ সম্পর্ক এরই মধ্যে এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর জন্য মডেল।



মন্তব্য