kalerkantho


ছাত্রলীগের প্রতি প্রধানমন্ত্রী

সম্পদের লোভে গা ভাসালে হারিয়ে যাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সম্পদের লোভে গা ভাসালে হারিয়ে যাবে

বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারী ও স্বাধীনতাবিরোধীরা এখনো নানা ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘এখনো দেখি, কতগুলি প্রেতাত্মা ঘুরে বেড়ায়, যারা আমাদের স্বাধীনতা চায়নি, যারা আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল, যারা সব সময় স্বাধীনতার বিরুদ্ধেই কাজ করেছে।’ তিনি বলেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে পা রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চেয়েছিল ওই ষড়যন্ত্রকারীরা। গতকাল শুক্রবার বিকেলে গণভবনে এক আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ওই আলোচনাসভার আয়োজন করে ছাত্রলীগ।

গতকাল বিকেল ৫টা ৪৯ মিনিট থেকে প্রায় ৪০ মিনিটের বক্তব্যে শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আদর্শিক কর্মী হিসেবে গড়ে ওঠার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ছাত্রলীগকে গড়ে তুলতে হবে একটি আদর্শের সংগঠন হিসেবে। ছাত্রলীগের প্রত্যেক সদস্যকে লেখাপড়া শিখতে হবে। এ ছাড়া তিনি স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীর নানা ষড়যন্ত্র, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বর্ণনা তুলে ধরেন।

স্বাধীনতাবিরোধী একটি বিশেষ গোষ্ঠীর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্ভাগ্য আমাদের, এখনো দেখি, কতগুলি প্রেতাত্মা ঘুরে বেড়ায়, যারা আমাদের স্বাধীনতা চায়নি, যারা আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল, যারা সব সময় স্বাধীনতার বিরুদ্ধেই কাজ করেছে, ১৫ আগস্টের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল, যারা ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃত করে দিয়েছিল। একটা সদ্য স্বাধীন দেশ, দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশ। স্বাধীনতার পরপরই এটা হলো না সেটা হলো না—নানা অপপ্রচার, কারা লিখেছিল, কারা বলেছিল! আর পঁচাত্তরের পর তো তারা দ্বিগুণ উৎসাহে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তাদের সেই ষড়যন্ত্র তো এখনো শেষ হয়নি। ছোট্ট শিশু একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, রাস্তায় নেমেছে। ওই শিশুদের যে ক্ষোভ, শিশুদের যে বিক্ষোভ, তাদের যে বিক্ষুব্ধ মন সেটাকে কাজে লাগিয়ে, ওই ছোট্ট শিশুদের ঘাড়ে পা দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য একদল নেমে পড়ল। এদের মধ্যে অনেকে জ্ঞানী-গুণী, অনেকেই আঁতেল, অনেকেই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। ওই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্নরা কী করেছে? ডিজিটাল বাংলাদেশ করে দিয়েছি আর তারই সুযোগ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে বিভিন্ন অপপ্রচার চালাল, মিথ্যা কথা বলে মানুষকে উসকানি দেওয়া হলো। তাদের এই উসকানির জন্য কত শিশুর জীবন যেতে পারত চিন্তা করেনি। বরং ওই শিশুদের বিক্ষুব্ধ মনকে ব্যবহার করে নিজের ফায়দা লুটতে চেয়েছিল। আমরা যখনই ব্যবস্থা নিলাম তখনই চারদিকে যেন হাহাকার। আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও বিভিন্ন চাপ।’

নীতির প্রশ্নে কোনো আপস নাই : শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটা কথা দেশে-বিদেশে সকলের মাথায় রাখা উচিত। আমি স্কুলজীবন থেকে রাজনীতি করি, বৈরী পরিবেশে, আইয়ুব খানের শাসনামলে। আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট। আমাদের বইয়ে একটা চ্যাপ্টার ছিল ২০ নম্বরের। আমি ওই ২০ নম্বর ছাড়াই ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলাম। কারণ আমার হাত দিয়ে আইয়ুব খানের প্রশংসা লিখব না, লিখতে পারি না, আমি সেই মানুষ। আমি ফেল করতে পারতাম বা থার্ড ডিভিশন পেতে পারতাম। কিন্তু নীতির প্রশ্নে কোনো আপস নাই, এটাই হলো কথা। রাজনীতি করেছি কখনো কোনো পদপদবি চাইনি। সংগঠনের প্রয়োজনে যখন যেখানে যেটা হওয়া দরকার সেটা হয়েছি। আমি, কামাল (বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেখ কামাল) আমাদের দায়িত্বটা পালন করেছি ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে।’

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী ছিলাম দুবার, এখন তৃতীয়বার। আমি তো নিজেকে পরিবর্তন করতে যাইনি। প্রধানমন্ত্রী হলেই যে ওই ব্র্যান্ডের জিনিস পরতে হবে, আমার তাঁতের শাড়ি ছেড়ে ওই ফ্রেন্চ শিফন পরতে হবে, সেই মেকআপ লাগাতে হবে, মাথায় চুল বাড়াতে হবে, এসব করিনি। আমার চিন্তা একটাই—মানুষের জন্য কতটা করতে পারলাম, দিতে পারলাম। ওই দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন আমার বাবা, তাদের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন আমার মা।’

শিক্ষা নিয়ে আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করতে হবে : ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া তাদের বিরুদ্ধে যখন আমরা আন্দোলন করেছি প্রত্যেকটা আন্দোলন, সেখানে যদি শহীদের তালিকা দেখি, সেখানে দেখব ছাত্রলীগের শহীদের সংখ্যাটাই সব থেকে বেশি। তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বারবার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কাজেই সেই ছাত্রলীগকে সংগঠন হিসেবে সেভাবে গড়ে তুলতে হবে একটা আদর্শের সংগঠন হিসেবে। আরেকটা কথা লেখাপড়া শিখতে হবে। ধনসম্পদ চিরদিন থাকে না। শিক্ষা এমন একটি সম্পদ যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। কাজেই ছাত্রলীগের প্রত্যেকটা ছেলেমেয়েকে নিজেকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। আর সেই শিক্ষা নিয়ে একটা আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করতে হবে।’

যদি সম্পদের লোভে গা ভাসিয়ে দাও তবে হারিয়ে যাবে : সরকারপ্রধান বলেন, ‘এখন আমার বয়স হয়ে গেছে। তোমরাই তো ভবিষ্যৎ। তোমরাই আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবে। কাজেই তোমাদেরই এই আদর্শের পতাকা সমুন্নত রেখে প্রগতির পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তোমাদের আদর্শ শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি। কাজেই শিক্ষার মশাল জ্বেলে শান্তির পথ ধরে প্রগতির পথে তোমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশকে একটি উন্নত সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদের যে লক্ষ্য তা বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের যতটুকু করার তা করে যেতে পারব। তারপর তো তোমাদের হাল ধরতে হবে। নিজেদের যদি নেতা হিসেবে গড়তে পারো তবে পারবে আর যদি সম্পদের লোভে গা ভাসিয়ে দাও তবে হারিয়ে যাবে। বহু ছাত্র নেতা হারিয়ে গেছে। কেউ বিএনপিতে, কেউ এখানে সেখানে, যারা লোভে পড়েছিল তারা চলে গেছে; তারা কিন্তু কিছু দিয়ে যেতে পারেনি। যারা আদর্শ নিয়ে আছে তারাই কিন্তু দেশকে কিছু দিতে পারছে।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘আমরা রাজনীতি দেখি, কত রকমের রাজনীতি, কেউ রাজনীতি করি শুধু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। কেউ রাজনীতি করি রাজনীতির ছত্রছায়ায় ধনসম্পদের মালিক, অর্থসম্পদের মালিক হওয়ার জন্য। কেউ রাজনীতি করে সামাজিকভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। কিন্তু জনগণের কথা চিন্তা করে, জনগণের কল্যাণের কথা ভেবে, জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা মনে করে যারা কাজ করে ইতিহাস তাদেরই স্বীকৃতি দেয়, মর্যাদা দেয়। ইতিহাসে তাদের নামই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে। শত চেষ্টা করেও সে নাম কখনো মুছে ফেলা যায় না। সেই প্রমাণ রেখে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’

আলোচনাসভায় সভাপতিত্ব করেন ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন আর সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। আলোচনাসভায় শেখ হাসিনার হাতে আলাদাভাবে দুর্লভ কিছু স্থিরচিত্র তুলে দেন ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা।



মন্তব্য