kalerkantho


চলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু বাজপেয়ি

কলকাতা প্রতিনিধি   

১৭ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



চলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু বাজপেয়ি

প্রায় দুই মাস হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি (৯৩)। গতকাল বৃহস্পতিবার দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এআইআইএমএস) হাসপাতাল এক বিবৃতিতে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও বিশেষ অবদান ছিল ভারতের তিনবারের এ প্রধানমন্ত্রীর। আর সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৫ সালে তাঁকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা’ দেয় বাংলাদেশ সরকার।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, গত ১১ জুন কিডনি ও মূত্রনালিতে সংক্রমণ এবং ফুসফুসের সমস্যা নিয়ে এআইআইএমএস হাসপাতালে ভর্তি হন অটল বিহারি বাজপেয়ি। কিন্তু শেষ কয়েক  বছরে ক্রমে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ায় সমস্যা গভীরতর হয়। গত বুধবার থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার ক্রমে অবনতি হতে থাকে। রাখা হয় লাইফ সাপোর্টে। কিন্তু গতকাল সেই লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, মৃত্যু হয় ভারতরত্ন বাজপেয়ির।

বাজপেয়ির জন্ম ১৯২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর; মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রে। ১৯৩৯ সালে তিনি যোগ দেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘে (আরএসএস)। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ওই সময় তিনি মাসখানেক জেলও খেটেছেন। ১৯৮০ সালে বাজপেয়ি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি হন। এরপর ১৯৯৬, ১৯৯৮, ১৯৯৯—তিনবার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে বসেন অটল বিহারি বাজপেয়ি। প্রথম দফায় ১৩ দিন, দ্বিতীয় দফায় ১৩ মাস আর তৃতীয় দফায় পূর্ণ সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের দায়িত্বভার সামলেছেন তিনি। ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাজপেয়িকে দেওয়া হয় ভারতরত্ন উপাধি।

রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য থাকলেও বিরোধীদের সঙ্গে বরাবরই সুসম্পর্ক ছিল তাঁর। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের অন্যতম প্রিয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বাজপেয়ি। ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আঙিনায় তিনি ছিলেন ‘নরম মুখ’। আরএসএসের সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। কিন্তু দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর প্রতি ছিল অপার শ্রদ্ধা। এক টালমাটাল সন্ধিক্ষণে দেশকে নেতৃত্ব দেন তিনি। একদিকে জোট রাজনীতির উত্থান, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে বড়সড় পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। কিন্তু হাজার ঝড়ঝাপ্টা সামলেও নিজের হাসিমুখটা সব সময় ধরে রাখেন বাজপেয়ি।

জীবনের অন্তিম বছরগুলো অবশ্য খুব ভালো গেল না বাজপেয়ির। এ পণ্ডিত ও রাজনীতিকের স্মৃতি লোপ পেয়ে গিয়েছিল ২০০৯ সালে এক স্ট্রোকের পর। ফলে অসামান্য বাগ্মিতার জন্য খ্যাতি ছিল যাঁর, সেই বাজপেয়ি কয়েক বছর ধরে কথা বলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিলেন অনেকটাই।

আরএসএসে যুক্ত থাকায় তাঁর চারপাশে উগ্র হিন্দুত্ববাদীর অভাব কখনোই ছিল না। কিন্তু নিজেকে সেই দলে মিশিয়ে দেননি কোনো দিন। সম্ভবত সে কারণেই তিন তিনবার বিজেপির বাইরের দলগুলোর সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নিতে পেরেছিলেন তিনি।

রাজনীতির মতো আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বেশ দক্ষ ছিলেন বাজপেয়ি। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে বড়সড় পদক্ষেপ নিয়েছিল ভারত। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে সঙ্গে নিয়ে ভারত-পাকিস্তান বাসযাত্রার সূচনা করেছিলেন বাজপেয়ি। বলেছিলেন, ‘বন্ধু বদলানো যায়; কিন্তু প্রতিবেশী নয়।’

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধেও বিশেষ অবদান ছিল বাজপেয়ির। সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৫ সালে তাঁকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা’ দেয় বাংলাদেশ সরকার। শারীরিক অসুস্থতার কারণে বাজপেয়ির হয়ে সেই সম্মাননা গ্রহণ করেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে পাঠ হওয়া বাংলাদেশ সরকারের এক মানপত্রে বলা হয়, অটল বিহারি বাজপেয়ি একাত্তরে লোকসভার সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। ‘অর্গানাইজার’ পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে স্বাগত জানান এবং বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দিতে ও মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

মানপত্রে আরো বলা হয়, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারের সমর্থন-প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার দাবিতে ১২ আগস্ট ভারতের সংসদ ভবনের সামনে বিশাল জনসমাবেশ হয়। সেখানে বাজপেয়ি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতার সমর্থনে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন।’

এদিকে অটল বিহারি বাজপেয়ির মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘অটল বিহারি বাজপেয়ির মৃত্যুতে আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক শূন্যতার সৃষ্টি হলো। এ অঞ্চলের উন্নয়নে তাঁর অবদান জনগণ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’ রাষ্ট্রপতি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।

পৃথক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি বাজপেয়ির বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।

পশ্চিমবঙ্গের মুখমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘খুব দুঃখ পেলাম উনার (বাজপেয়ি) মৃত্যুর সংবাদে। আমাদের দেশের খুব বড় ক্ষতি হয়ে গেল। উনার সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত আমার সারা জীবন মনে থাকবে।’

আজ শুক্রবার বাজপেয়ির অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। তাতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।



মন্তব্য