kalerkantho


বঙ্গবন্ধুর লেখা নিয়ে বেরোচ্ছে আরো ৩ বই

নওশাদ জামিল   

১৫ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



বঙ্গবন্ধুর লেখা নিয়ে বেরোচ্ছে আরো ৩ বই

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ প্রকাশের পর দেশ-বিদেশের অসংখ্য পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয়েছে তাঁর ভিন্নমাত্রিক লেখকসত্তা। বিশিষ্টজনরা বলছেন, তাঁর এ দুটি বই শুধু জীবনস্মৃতি নয়, তা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক দলিল। জাতির পিতার আরো কিছু লেখা নিয়ে নতুন তিনটি বই প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি বইয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে বইটির ভূমিকা লিখছেন। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, কয়েক মাসের মধ্যেই আলোর মুখ দেখবে বইটি। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর লেখা নিয়ে আরো দুটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত রয়েছে। ছাপার কাজও অনেক দূর এগিয়েছে। আগামী বছর তা প্রকাশিত হবে।

বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক ও বিশিষ্ট লোকসংগ্রাহক শামসুজ্জামান খান বলেন, বঙ্গবন্ধুর লেখালেখির মূল প্রেরণা দিতেন তাঁর স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধুকে লেখার খাতা ও ডায়েরি দিয়ে তিনি লিখতে বলতেন। বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ কারাবাসে যেমন প্রচুর পড়াশোনা করেছেন, তেমনি অনেক লিখেছেনও। তাঁর লেখা বিভিন্ন খাতা ও ডায়েরি থেকে দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও আরো কিছু খাতা ও ডায়েরি রয়েছে। সেগুলো থেকে বঙ্গবন্ধুর আরো তিনটি বই প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

শামসুজ্জামান খান আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় চার-পাঁচটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি লিখেছেন। ষাটের দশকে বিভিন্ন সময় লেখা তাঁর ডায়েরি, কারাবাসের সময় লেখা ডায়েরি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও চীন সফর নিয়ে আরো তিনটি নতুন বই প্রকাশিত হবে। বই তিনটির সম্ভাব্য নাম ‘চীন ভ্রমণ’, ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ ও ‘স্মৃতিকথা’।

জানা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পঞ্চাশের দশকে চীন ভ্রমণ নিয়ে লিখেছিলেন স্মৃতিকথামূলক রচনা। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে রয়েছে চীন ভ্রমণের কিছু অংশ। চীন ভ্রমণের বাকি অংশটুকু নিয়ে, সেই ভ্রমণের কিছু দুর্লভ আলোকচিত্র নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে নতুন বই ‘চীন ভ্রমণ’। বইটি ১৬০ থেকে ১৭০ পৃষ্ঠা হবে। বইটির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা লেখা শেষ হলেই বাংলা একাডেমিতে প্রকাশিত হবে এ বই। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চীন ভ্রমণ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর এ বইটির প্রাথমিক নাম ঠিক করা হয়েছিল ‘নয়াচীন’। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাম দিয়েছেন ‘চীন ভ্রমণ’।

বাংলা একাডেমি সূত্রে জানা যায়, কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নিয়ে প্রকাশিত হবে বঙ্গবন্ধুর আরেকটি নতুন বই। ষাটের দশকের শেষার্ধের এ মামলা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বেশ কিছু ডায়েরি ও খাতা পাওয়া গেছে। তাতে তিনি লিখে গেছেন আগরতলা মামলার নানা বিবরণী ও গণ-অভ্যুত্থানের নানা তথ্য। বইটির পাণ্ডুলিপিও প্রস্তুত করা হয়েছে। ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে প্রকাশিত হবে বইটি।

এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন সময় লেখা নানা স্মৃতিকথা নিয়ে প্রকাশিত হবে আরেকটি নতুন গ্রন্থ। বইটিতে থাকবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মৃতি, রাষ্ট্র পরিচালনা, বিদেশ ভ্রমণ, বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়ক ও বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে তাঁর সখ্য এবং নানা স্মৃতিবিজড়িত লেখা। ‘স্মৃতিকথা’ শিরোনামে বইটি আগামী বছর প্রকাশিত হবে।

শামসুজ্জামান খান বলেন, তিনটি বইয়ের পূঙ্খানুপুঙ্খ দেখভাল করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যরা। বই তিনটির ভূমিকাও লেখার দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর পরামর্শ ও দিকনির্দেশনায় প্রকাশিত হচ্ছে এ তিনটি বই। 

এর আগে ২০১২ সালে ইউপিএল থেকে প্রকাশ হয় বঙ্গবন্ধুর লেখা প্রথম বই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘কারাগারের রোজনামচা’। ইতিমধ্যে দুটি বই-ই বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পাঠকের কাছে। সংশ্লিষ্ট প্রকাশনী সংস্থায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই দুটি বই বাংলাদেশে বই বিক্রির ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ইতিমধ্যে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে বইটির চাহিদা। এ ছাড়া ‘কারাগারের রোচনামচা’ বেরোনোর এক বছরের কম সময়ের মধ্যে বিক্রি হয়েছে ৭০ হাজার কপি।

বঙ্গন্ধুর লেখক সত্তা ও তাঁর রচনা ঐতিহাসিক দলিল : বঙ্গবন্ধুর লেখা দুটি বই প্রকাশের ফলে তিনি এক শক্তিমান ও স্বাপ্নিক লেখক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। বিশিষ্টজনরা তাঁর রচনাকে বাঙালির ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই দুটি পাঠ করলে তাঁরই কণ্ঠ শোনা যায় পাতায় পাতায়। তিনি যেভাবে কথা বলতেন, যে সব শব্দ ব্যবহার করতেন, ঠিক সেভাবেই তিনি ডায়েরি লিখেছেন। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা আনার জন্য কিভাবে সংগ্রাম করেছেন চব্বিশটি বছর সে সবই লিখেছেন। ফলে তাঁর রচনা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির অনন্য দলিল।

আনিসুজ্জামান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শুধু রাজনীতিক নন, তিনি যে কত বড় ও শক্তিমান লেখক ছিলেন তা বই দুটি পাঠ করলে আরো পরিষ্কার হয়ে যায়। জেলখানায় বসে তাঁর কর্মজীবন ও আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ লেখার ক্ষেত্রে নিজেকে কখনো বড় করে তুলে ধরেননি। দেশের মানুষ ও দলের কর্মীদের প্রাধান্য দিয়ে ডায়েরি লিখেছেন। অত্যন্ত নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে অবলোকন করেছেন ঘটনাপ্রবাহ এবং তা লিখেছেন। এখানেও তিনি অত্যন্ত মহান ব্যক্তিত্ব ও লেখকের পরিচয় রেখেছেন।’



মন্তব্য