kalerkantho


গোলাম সারওয়ার চলে গেলেন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



গোলাম সারওয়ার চলে গেলেন

খ্যাতিমান সাংবাদিক সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ২৫ মিনিটে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

অনুভবে-কর্মে নিষ্ঠাবান সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার প্রত্যাশা করতেন বার্তাকক্ষেই মৃত্যুকে বরণ করতে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সাংবাদিকতা করতে। প্রকৃতপক্ষে তা-ই হয়েছে। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার আগের দিনও সাংবাদিকতায় যুক্ত থেকেছেন এ অন্তপ্রাণ সাংবাদিক।

সম্পাদক পরিষদের সভাপতি এবং প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) চেয়ারম্যান দৈনিক সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের মৃত্যুতে সাংবাদিকতা জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দুঃসংবাদটি আসতেই শেষ কর্মস্থল সমকালের তাঁর সহকর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। একুশে পদকপ্রাপ্ত ৭৫ বছর বয়সী গোলাম সারওয়ার স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

দৈনিক সমকালের নির্বাহী সম্পাদক ও কবি মুস্তাফিজ শফি বলেন, সিঙ্গাপুর থেকে মরদেহ দেশে আনার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কিংবা রাতে মরদেহ দেশে পৌঁছার সম্ভাবনা রয়েছে। গত রাতে তিনি আরো জানান, কখন, কোথায় জানাজা ও দাফন হবে—এখনো সে সিদ্ধান্ত হয়নি।

গোলাম সারওয়ারের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। পৃথক শোকবার্তায় তাঁরা মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া গোলাম সারওয়ারের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী তরিকুল ইসলাম, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট শিল্পপতি আহমেদ আকবর সোবহান, সমকালের প্রকাশক ও বিশিষ্ট শিল্পপতি এ কে আজাদ প্রমুখ।

অসুস্থতা অনুভব করার পর গত ২৯ জুলাই মধ্যরাতে গোলাম সারওয়ার রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি হন। ল্যাবএইড কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. সোহরাবুজ্জামানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ৩ আগস্ট মধ্যরাতে সমকাল সম্পাদককে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। পরদিন সকালে তাঁকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর তাঁর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতিও হয়েছিল। নিউমোনিয়া সংক্রমণ হ্রাসের পাশাপাশি ফুসফুসে জমে থাকা পানিও কমে গিয়েছিল। হার্টও স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিল। কিন্তু রবিবার হঠাৎ করে রক্তচাপ কমে যায়। গতকাল বিকেল ৫টায় লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয় তাঁকে। রাত ৯টা ২৫ মিনিটে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে মৃত ঘোষণা করে। সিঙ্গাপুরে গোলাম সারওয়ারের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী সালেহা সারওয়ার, দুই ছেলে গোলাম শাহরিয়ার রঞ্জন ও গোলাম সাব্বির অঞ্জন, জামাতা মিয়া নাইম হাবিব এবং সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি শরিফুল ইসলাম রয়েছেন। 

গোলাম সারওয়ার ষাটের দশক থেকে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে সাংবাদিকতায় যুক্ত থেকে দেশের গণমাধ্যমকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি হাতে-কলমে গড়ে তুলেছেন অসংখ্য সাংবাদিককে। দৈনিক ইত্তেফাকে দীর্ঘ ২৭ বছর বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সাপ্তাহিক পূর্বাণীর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন। পূর্বাণীতে তাঁরই সম্পাদনায় এ দেশে প্রথম ম্যাগাজিন আকারে বৃহদায়তনের ঈদ সংখ্যা প্রকাশের রীতি শুরু হয়। এ ছাড়া তিনি দেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দৈনিক যুগান্তর ও সমকালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে সাফল্য অর্জন করেন। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক এবং এর ছয় বছর পর ২০০৫ সালে আরেকটি নতুন দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পালন করে যান সেই দায়িত্ব।

তাঁর জন্ম ১৯৪৩ সালের ১ এপ্রিল বরিশালের বানারীপাড়ায়। বাবা মরহুম গোলাম কুদ্দুস মোল্লা ও মা মরহুমা সিতারা বেগম দম্পতির জ্যেষ্ঠ সন্তান গোলাম সারওয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্মানসহ এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় ১৯৬২ সালে চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদীর বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা হিসেবে তাঁর সাংবাদিকতা পেশার সূচনা। একই বছর দৈনিক সংবাদের সহসম্পাদক হিসেবে যুক্ত হন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত সংবাদে চাকরিরত ছিলেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন নিজ এলাকা বানারীপাড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের পর কয়েক মাস বানারীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে ইত্তেফাকে সিনিয়র সহসম্পাদক হিসেবে যুক্ত হন। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত যথাক্রমে প্রধান সহসম্পাদক, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশের দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকদের সংগঠন বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি অসংখ্য ছড়া লিখেছেন। সত্তরের দশকেও ছড়ায় সচল রেখেছিলেন নিজের কলম। ‘রঙিন বেলুন’ নামে শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত ছড়ার বইটি তাঁর ছড়া সৃষ্টির উজ্জ্বল নিদর্শন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংগীত জগতে একসময় তিনি ছিলেন ঘনিষ্ঠ। তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি গান আজও শ্রোতাহৃদয়ে শিহরণ জাগায়। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে ‘সম্পাদকের জবানবন্দি’, ‘অমিয় গরল’, ‘আমার যত কথা’, ‘স্বপ্ন বেঁচে থাক’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।



মন্তব্য