kalerkantho


দুই মাসের টার্গেট নিয়েছে বিএনপি

এনাম আবেদীন   

১১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



দুই মাসের টার্গেট নিয়েছে বিএনপি

সরকারকে চাপে ফেলতে আগামী সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর এই দুই মাসের আন্দোলনের টার্গেট নিয়ে নামছে বিএনপি। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মাস সেপ্টেম্বরে বিএনপি প্রথমে ‘নির্বাচনকালীন সরকারে’র রূপরেখা ঘোষণা করবে। এরপর ওই ঘোষণা মানার জন্য তারা সরকারকে আলটিমেটাম তথা সময়সীমা বেঁধে দিতে পারে। সরকার এতে সাড়া না দিলে ধাপে ধাপে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার কথা ভাবছে বিএনপি। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে তাঁদের এমন পরিকল্পনা  ও ভাবনার কথা জানা গেছে। বিএনপির সিনিয়র অন্তত চারজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্য নতুন কোনো কৌশল নেই। সেপ্টেম্বরের শুরুতে কালো পতাকা মিছিল, মানববন্ধন বা বিক্ষোভ এবং পরে সরকারের ‘অ্যাকশন’ অনুযায়ী ধাপে ধাপে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। তাঁরা বলেন, সরকার দমন-পীড়ন শুরু করলে প্রথমে হরতাল এবং পরে অবরোধের মতো লাগাতার কর্মসূচিও আসবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া এ দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন কঠিন। ফলে বিএনপিকে আন্দোলনে যেতেই হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘উপযুক্ত সময়ে বিএনপির দাবি-দাওয়া জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। এর আগেও আমরা বলেছি, নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা ছাড়া এ সরকারের অধীনে নির্বাচন সম্ভব নয়। তবে আন্দোলন কখন থেকে শুরু হবে তার দিনক্ষণ আগাম বলা সম্ভব নয়।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি না করলে বিএনপি আন্দোলনে যাবে। কারণ দেশে যে বিদ্যমান কাঠামো এতে নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া সমান কথা। তিনি বলেন, এটি এখন শুধু বিএনপির নয়, সরকারের বাইরে থাকা সব দলের দাবি। ফলে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন দিতে হবে।

মির্জা ফখরুল আরো বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যথাসময়ে আন্দোলনে নামবে বিএনপি।

নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাব যথাসময়ে দেওয়া হবে বলে জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে চলে। বিএনপিকে দমাতে চাইলে কী হবে? কোটা ও ছাত্রদের আন্দোলন কি সরকার দমন করতে পেরেছে?’ তিনি আরো বলেন, সরকারের সময় শেষ। দুই মাস আন্দোলনের জন্য যথেষ্ট সময়। 

বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, গত কয়েক বছর ‘সহায়ক সরকারের’ কথা বলা হলেও বিএনপি এখন নামকরণ হিসেবে ‘নির্বাচনকালীন সরকারের’ কথাই বলবে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক, সহায়ক বা নির্বাচনকালীন তিন সরকারের রূপরেখা একই হবে। একই রূপরেখা বিএনপির সঙ্গে ঐক্যে আগ্রহী দলগুলোর পক্ষ থেকেও আলাদাভাবে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। সূত্রের দাবি, রূপরেখার খসড়া ওই দলগুলোর কাছেও পাঠানো হয়েছে। তারা বিষয়গুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছে। দলগুলো সম্মত হলে একই রূপরেখা আলাদাভাবে ঘোষণা করা হবে এবং এরই সূত্র ধরে চিন্তা করা হচ্ছে যুগপৎ আন্দোলনের। ঐক্যপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ৬ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবে তিনটি দলের নেতাদের সঙ্গে এক মঞ্চে উঠে বক্তৃতা করেন মির্জা ফখরুল। সেখানে সরকারকে প্রতিরোধ করার ডাক দিয়েছেন অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন ও মাহমুদুর রহমান মান্না।

এ ছাড়া ‘নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করার’ প্রতিবাদে এরই মধ্যে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে আটটি দলের সমন্বয়ে গঠিত বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষ থেকে। গত ১৮ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে সিপিবি নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়াসহ নির্বাচনকালে প্রকৃত নিরপেক্ষ সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন কর্তৃত্বের জন্য তিনি সংবিধান সংশোধনের দাবি জানান।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখায়ও সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবিসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং সঙ্গে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি থাকবে। নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে আন্দোলনে ‘উদারপন্থী’দের পাশাপাশি বাম দলগুলোর সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যেও কাজ করছে বিএনপি। নির্বাচনী জোট না হলেও সুষ্ঠু নির্বাচনের ধারা ফিরিয়ে আনতে অন্তত ওই দলগুলো সমর্থন দেবে বলে মনে করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। আর এ জন্য দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে এ বিষয়ে কথা বলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিকল্পধারা, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে কথা বলতে মির্জা ফখরুলকে এবং গণফোরামের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মওদুদ আহমদকে।

নজরুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির এখনকার বেশির ভাগ দাবির মিল রয়েছে। ফলে নির্বাচনী ঐক্য না হলেও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তাদের সঙ্গে আন্দোলন ভবিষ্যতে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তিনি বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে সব দলের সমর্থন আদায়ে বিএনপি কাজ করে যাচ্ছে।

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচির ভিত্তিতে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের আলোচনা চলছে। তারা কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। আমরাও দিয়েছি। এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আমরা একমত হলে বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব।’



মন্তব্য