kalerkantho


ট্রাম্প-পুতিন প্রথম শীর্ষ বৈঠক

অতীত ঠেলে একত্রে হাঁটার প্রত্যয়

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



অতীত ঠেলে একত্রে হাঁটার প্রত্যয়

ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে গতকাল বৈঠকের শুরুতে করমর্দন করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি : নিউ ইয়র্ক টাইমস

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—বিশ্বের দুই পরাশক্তি। সেই সঙ্গে একে অপরের সবচেয়ে বড় শত্রুও। এই দুই দেশের দুই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক হলো গতকাল সোমবার। আর ঐতিহাসিক এ বৈঠকের আয়োজন করা হয় ‘নিরপেক্ষ’ ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে। সেখানে দেশটির প্রেসিডেন্ট প্যালেসে বসে ‘একান্তে’ কথা বলেন তাঁরা। আর প্রথম সাক্ষাতেই দুই নেতা প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন যে অতীতকে পেছনে ফেলে নতুন করে একসঙ্গে হাঁটতে চান তাঁরা।

ট্রাম্প এমন সময় পুতিনের সঙ্গে বসলেন, যখন বেশ কয়েকটি ইস্যু নিয়ে ঘরে-বাইরে চাপের মুখে আছেন তিনি। সবচেয়ে বড় চাপে আছেন ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে। বলা হয়, রাশিয়ার ওই হস্তক্ষেপ ট্রাম্পকে হিলারির বিপক্ষে জয় পেতে সহায়তা করেছে। গত শুক্রবার ওই অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা এফবিআইয়ের সাবেক প্রধান রবার্ট মুলার এও জানিয়েছেন যে মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপে অন্তত ১২ রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন।

ট্রাম্প ও পুতিন বরাবরই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। এটা অনুমেয়ই ছিল যে, দুই নেতার গতকালের বৈঠকে এ নিয়ে কথা হবে। হয়েছেও। কিন্তু দুই নেতার কেউই নিজেদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।

বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই পুতিন বলেন, ‘মার্কিন নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে আমাদের মধ্যে কথা হয়েছে। সেখানে আমি ট্রাম্পকে তাই বলেছি, যা আগে একাধিকবার বলেছি। রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কখনো হস্তক্ষেপ করার পরিকল্পনা করেনি। যদি এ ধরনের কোনো কথা ওঠে, তবে আমরা সে বিষয়ে সামনাসামনি কথা বলতে প্রস্তুত আছি।’

ট্রাম্পের বক্তব্যও ছিল পুতিনের অনুরূপ। তিনি বলেন, ‘রাশিয়া যদি হস্তক্ষেপ করত, তাহলে সেটা অনেক আগেই সামনে আসত।’ এ সময় এক সাংবাদিক রবার্ট মুলারের তদন্তের দিকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি পুতিনকে বিশ্বাস করেন, নাকি মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনীকে?’ এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ট্রাম্প তা এড়িয়ে যান।

এরপর উত্তর কোরিয়া ইস্যু নিয়ে কথা বলেন পুতিন। তিনি বলেন, ‘আমরা খুবই খুশি যে বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’ ইউক্রেন ইস্যুতে রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, ইউক্রেন সংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র আরো নমনীয় এবং ধীরস্থিরভাবে এগোতে পারত। উল্লেখ্য, রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রুশপন্থী বিদ্রোহীদের সামরিক সহযোগিতা দেয়।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের মধ্যে অনেক বিষয়ে খোলাখুলি এবং গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে।’ সিরিয়া ইস্যু নিয়ে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সিরিয়ার হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে ভবিষ্যতে আমাদের দুজনের মধ্যে আরো অনেক বৈঠক হবে। দুজনের আজকের বৈঠক হলো শুভ সূচনা।’

ট্রাম্প ও পুতিনের এ বৈঠকের দিকে নজর ছিল গোটা ইউরোপেরও। কারণ গত বুধবার ব্রাসেলসে ন্যাটো সম্মেলনে গিয়ে রাশিয়াকে সহযোগিতার জন্য জার্মানির কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। তিনি অভিযোগ তোলেন, ‘জার্মানি রাশিয়া দ্বারা পুরো নিয়ন্ত্রিত। এটা একেবারে অপ্রত্যাশিত।’ জার্মানি রাশিয়াকে ধনী বানাচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি। এ অবস্থায় সামনাসামনি পুতিনকে ট্রাম্প কিছু কড়া কথা শোনাবেন বলেও আশা করেছিলেন ইউরোপের নেতারা। কিন্তু সে রকম কিছুই ঘটেনি।

গতকাল সকালেই ট্রাম্প হেলসিংকির প্রেসিডেন্ট প্যালেসে পৌঁছান। পুতিন পৌঁছান দুপুরের দিকে; নির্ধারিত সময়ের ঘণ্টাখানেক পর। প্রেসিডেন্ট প্যালেসে প্রথমেই দুই নেতা অংশ নেন ফটো সেশনে। সেখানে তিন সেকেন্ডের জন্য করমর্দন করেন তাঁরা। এরপর পুতিনের উদ্দেশে ট্রাম্পের প্রথম বাক্যটি ছিল, ‘বাণিজ্য থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র, পরমাণু অস্ত্র, চীন—সব কিছু নিয়েই কথা হবে। গত কয়েক বছরে আমাদের সম্পর্ক খুব একটা ভালো যায়নি। আমি সত্যিই মনে করি যে পুরো বিশ্ব আমাদের একসঙ্গে দেখতে চায়। আমরা পরমাণু শক্তিধর দুই দেশ। রাশিয়ার সঙ্গে একই পথে হাঁটা হবে দারুণ এক ব্যাপার।’ সফল বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য পুতিনকে অভিনন্দনও জানান ট্রাম্প।

ফটো সেশনের পর বৈঠক শুরুর আগ মুহূর্তে রুশ ভাষায় একটি বিবৃতি দেন পুতিন। তাতে তিনি ট্রাম্পের উদ্দেশে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট, আপনার সঙ্গে দেখা করতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত। সর্বশেষ দেখা হওয়ার পর এত দিন আপনার সঙ্গে শুধু টেলিফোনেই কথা হয়েছে। বিশ্বের নানা সমস্যা এবং আমাদের নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলার উপযুক্ত সময় চলে এসেছে।’

এরপর শুরু হয় দুই নেতার ‘একান্ত’ বৈঠক, যেখানে তাঁদের সঙ্গে নিজেদের দুই দোভাষী ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিলেন না। একান্তে কথা বলার এ সিদ্ধান্ত অবশ্য ট্রাম্পেরই। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর পেছনে সম্ভাব্য তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ট্রাম্প নিজের মতো করে পুতিনকে বুঝতে এবং ‘লিডার টু লিডার’ সম্পর্ক গড়তে চান। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকের ক্ষেত্রেও তিনি একই কাজ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, এর আগে বিদেশি নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হয়েছে। এ কারণে তিনি বৈঠকে কোনো সহযোগী রাখার বিপক্ষে। তৃতীয়ত, ট্রাম্প মনে করেন, পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের সময় সহযোগী রাখলে তাঁদের যে কেউ রাশিয়া নিয়ে ‘উল্টাপাল্টা’ মন্তব্য করে বসতে পারেন। তবে গতকাল হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, অল্প সময়ের মধ্যে দুই নেতার মধ্যে আরেকটি বৈঠক হবে, যেখানে দুই দেশের অন্য কর্মকর্তারাও উপস্থিত থাকবেন। অবশ্য অনেক মার্কিন সিনেটর মনে করেন, একান্ত বৈঠকের নামে ট্রাম্প হয়তো কিছু লুকাতে চাইছেন।

গতকালের বৈঠকটি শুরু হয় স্থানীয় সময় দুপুর সোয়া ২টায় (বাংলাদেশ সময় বিকেল সোয়া ৫টা)। বৈঠকের জন্য নির্ধারিত সময় ছিল দেড় ঘণ্টা। কিন্তু শেষ হয় প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা পর। বৈঠকের পর মধ্যাহ্নভোজে যান দুই নেতা। এরপর অংশ নেন যৌথ সংবাদ সম্মেলনে।

বৈঠকের জন্য হেলসিংকি বেছে নেওয়ার কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কাছে ফিনল্যান্ড ঐতিহাসিকভাবেই নিরপেক্ষ একটি রাষ্ট্র। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট প্যালেসে যখন ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক চলছিল, তখন বাইরে ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রার (ফিনল্যান্ডে গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ) মধ্যে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করছিল পরিবেশবাদীরা। তাদের হাতে যেসব প্ল্যাকার্ড ছিল, সেগুলোর একটিতে ট্রাম্প ও পুতিনের উদ্দেশে লেখা ছিল, ‘পৃথিবী নয়, পারলে আমাদের হূদয় উষ্ণ করুন।’

গতকাল হেলসিংকিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের মধ্যেও বৈঠক হয়েছে। এটি ছিল ল্যাভরভের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পম্পেওর প্রথম বৈঠক। সূত্র : এএফপি, বিবিসি।



মন্তব্য