kalerkantho


মাদক মামলায় ঠিকভাবে আইন অনুসরণ হচ্ছে না

বিচারে সুবিধা পাবে আসামিরা

আশরাফ-উল-আলম   

১৪ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



মাদক মামলায় ঠিকভাবে আইন অনুসরণ হচ্ছে না

জাবেদ ইমাম ভোলায় সিনিয়র সহকারী জজ হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বর রাজধানীর নিউ মার্কেট থানা এলাকায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন পুলিশের হাতে। তাঁকে বহনকারী মাইক্রোবাস থেকে ৩৪২ বোতল ফেনসিডিল জব্দ করা হয়েছিল। কিন্তু মামলা দায়ের ও জব্দ তালিকায় ত্রুটি থাকায় মামলা দায়েরকারী পুলিশ কর্মকর্তাকে তলব করেছিলেন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। ওই ত্রুটির কারণে জাবেদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হলেও বিচারিক আদালত জাবেদকে চার বছরের বেশি কারাদণ্ড দিতে পারেননি। মামলায় দুর্বলতার সুযোগে হাইকোর্ট থেকে বেকসুর খালাস পান জাবেদ।

মাদকদ্রব্য জব্দ করা হলে মামলা হয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে। তবে জব্দ তালিকা তৈরি করতে হয় ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা অনুযায়ী। এতে আলামত জব্দ করার বিষয়ে পাঁচটি শর্ত রয়েছে। ১০৩ ধারার (১) উপধারায় বলা হয়েছে, তল্লাশি করার আগে তল্লাশির জন্য প্রস্তুত কর্মকর্তা বা অন্য কোনো ব্যক্তি যে স্থানে তল্লাশি করা হবে সেই এলাকার দুই বা ততোধিক সম্মানিত বা গণ্যমান্য অধিবাসীকে তল্লাশিতে হাজির থাকতে বা সাক্ষী হতে আহ্বান জানাবেন। প্রয়োজনে তল্লাশি কর্মকর্তা লিখিত আদেশ দিতে পারবেন। এই ধারার (২) উপধারায় বলা হয়েছে, সম্মানিত ব্যক্তিদের সামনে তল্লাশি করতে হবে। ওই সময় জব্দ সামগ্রীর তালিকা প্রস্তুত করবেন তল্লাশি কর্মকর্তা বা অন্য কোনো কর্মকর্তা। তালিকা প্রস্তুত হলে  জব্দ তালিকায় উপস্থিত ব্যক্তিদের স্বাক্ষরও নিতে হবে। (৩) উপধারায় রয়েছে, তল্লাশির স্থানে দখলদার উপস্থিত থাকতে পারবেন। (৪) উপধারায় বলা হয়েছে, জব্দকৃত সামগ্রীর তালিকা দখলকারকে দিতে হবে। (৫) উপধারায় বলা আছে, লিখিত আদেশ দ্বারা আহ্বান করা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া তল্লাশি কার্যক্রমে হাজির হতে বা সাক্ষী হতে অস্বীকার বা অবহেলা করেন তিনি দণ্ডবিধির ১৮৭ ধারায় অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন।

জাবেদ ইমামের ক্ষেত্রে এসব বিধি-বিধান পালন করা হয়নি, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরেও ত্রুটি ছিল। ৩৪২ বোতল ফেনসিডিল তাঁর দখল থেকে উদ্ধার করা হলেও তার ওজন বা পরিমাণ কত ছিল তা এজাহার বা চার্জশিটে উল্লেখ ছিল না।

মাদকের মামলার জব্দ তালিকা, এজাহার ও তদন্তে এমন ত্রুটি থাকার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এ ধরনের ত্রুটি আর সাক্ষী হাজির না হওয়ার কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা মামলার ৬০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যায়।

পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে নিরীহ কাউকে হয়রানি করতে না পারে সে উদ্দেশ্যেই সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তল্লাশি করা এবং জব্দ তালিকায় সাক্ষীদের স্বাক্ষর নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। মাদকবিরোধী চলমান অভিযানে অনেক ব্যক্তিকে মাদকদ্রব্যসহ আটক করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। বেশ কিছু মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সংশ্রিষ্ট জব্দ তালিকায় এলাকার সম্মানিত বা গণ্যমান্য ব্যক্তি তো দূরের কথা স্থানীয় কাউকেই সাক্ষী করা হয়নি। ফলে এসব মামলায় আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হবে বলে মনে করেন আইনজীবীরা।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মো. বোরহান উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, মাদকের মামলার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার বিধান মানা হয় না। এ কারণে বেশির ভাগ আসামি খালাস পাচ্ছে। মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধারকালে আইনের বিধান মানা উচিত। না হলে মাদকবিরোধী চলমান অভিযান সফল হবে না।

ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের সাবেক পিপি ও বিশিষ্ট আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী কালের কণ্ঠকে বলেন, আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাক্ষী করতে হবে। কিন্তু ঘটনাস্থলের তাত্ক্ষণিক পরিস্থিতিতে হয়তো এমন সাক্ষী পাওয়া যায় না। তাই উচ্চ আদালতও ক্ষেত্র বিশেষে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সাক্ষী করা বাধ্যতামূলক নয়। আবার উচ্চ আদালতে এমন সিদ্ধান্তও আছে যে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাক্ষী করা বাধ্যতামূলক। বিচারিক আদালতে আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষকে দুই ধরনের সিদ্ধান্ত শুনানির সময় উপস্থাপন করতে দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিও দেখা দেয়। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত মূল আইন অনুসরণ করা। কারণ মূল আইন অনুসরণ না করলে আসামির সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকে।

এই আইনজীবী আরো বলেন, মাদকের মামলায় প্রায়ই দেখা যায় সাক্ষী হাজির হয় না। হাজির হলেও আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে যায়। ফলে আসামি খালাস পেয়ে যায়। এ কারণে সাক্ষীদের কাছ থেকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করানো উচিত। কিন্তু মাদকের মামলায় এমনটা করানো হয় না।

বিলিয়ার গবেষণা কর্মকর্তা ও আইনজীবী শাহনেওয়াজ পাটোয়ারী বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রত্যেক সদস্য আইনের লোক। তাঁদের উচিত আইন অনুসরণ করে কাজ করা। ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার বিধান অনুসরণ করেই মাদকদ্রব্য উদ্ধারসংক্রান্ত মামলায় জব্দ তালিকা করতে হবে। এটা না করার কারণে আসামিরা বিশেষ সুবিধা পায়।

এ প্রসঙ্গে হাইকোর্টের একটি সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ আছে ঢাকা ল রিপোর্টসের (ডিএলআর) ৪৫তম সংখ্যায়। সুবোধ রঞ্জন গং বনাম রাষ্ট্র মামলায় হাইকোর্ট বলেছেন, সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তল্লাশি চালানোর বিধান করার লক্ষ্য হচ্ছে তদন্তকারী কর্মকর্তার পক্ষে সম্ভাব্য চাতুরী ও মনগড়া কিছু করার বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ তৈরি করা। তল্লাশি যে সততার সঙ্গে হয়েছে তা নিশ্চিত করা তার জন্য বাধ্যতামূলক। একই মামলায় আরো বলা হয়েছে, সম্মানিত বা গণ্যমান্য দুই বা ততোধিক এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে জব্দ তালিকা প্রস্তুত করা বাধ্যতামূলক। এটা আইনের বিধান।

৬০ ডিএলআরে বর্ণিত হাইকোর্টের আরেকটি সিদ্ধান্তে উল্লেখ আছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার বিধান না মেনে কোনো আলামত উদ্ধার ও জব্দ তালিকা প্রস্তুত না করা আইনসম্মত হবে না। কঠোরভাবে আইনের এই বিধান মানতে হবে। আর বিধান না মানলে আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা প্রমাণ করা সহজ হবে না বলেই মনে করেন আইনজীবীরা।

গত ৬ এপ্রিল রাজধানীর নিউ মার্কেট উপডাকঘরের সামনে রাস্তার ওপর একটি ভ্যানগাড়িতে রাখা ককশিটের বাক্স তল্লাশি করে এক লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। ওই সময় গ্রেপ্তার করা মো. শফিক ও আ. রহিম পুলিশের কাছে স্বীকার করেন যে তাঁরা ইয়াবা কারবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। মামলার নথি থেকে দেখা যায়, ঘটনাস্থলে একটি জব্দ তালিকা তৈরি করা হয়। কিন্তু জব্দ তালিকায় ডাকঘরের কেউ সাক্ষী নেই। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ইয়াবা জব্দ করা হয়। শুক্রবার ডাকঘর বন্ধ থাকলেও নিরাপত্তারক্ষী থাকার কথা। আ. হালিম ও কাজী রোমান নামে দুজন এবং এক পুলিশ কনস্টেবলকে সাক্ষী করা হয়েছে। আ. হালিমের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানার বড়গাঁও গ্রামে। আর কাজী রোমান নিউ মার্কেট এলাকার বর্জ ব্যবস্থাপনা অফিসের লাইনম্যান। আইনে আছে এলাকার দুজন সম্মানিত ব্যক্তি হতে হবে। এ ক্ষেত্রে  আইন অনুসরণ করা হয়নি।

গত ১৯ এপ্রিল মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের সেনপাড়া পর্বতা মোড়ে একটি দোকানের সামনে রিপা আক্তার নামে এক নারীর কাছ থেকে ১০ হাজার ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করে র‌্যাব। এ নিয়ে মিরপুর থানায় মামলা করা হয়। জব্দ তালিকা থেকে দেখা যায়, ঘটনাস্থলের আশপাশের কেউ সাক্ষী নেই।

গত ২৯ জুন হাজারীবাগে অভিযান চালিয়ে ৫৫ গ্রাম গাঁজাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এসংক্রান্ত জব্দ তালিকায় ওই এলাকার কোনো সাক্ষী নেই। জব্দ তালিকায় যে দুই ব্যক্তির স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে তাঁরা মোহাম্মদপুর থানার বাসিন্দা।

গত ১৯ মে ফকিরাপুল থেকে একটি মাইক্রোবাস আটক করে ৪৬ কেজি গাঁজা উদ্ধার করে ডিবি। ওই ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। এসংক্রান্ত জব্দ তালিকার সাক্ষী পশ্চিম বাসাবোর আমিরুল ইসলাম ও পিরোজপুরের আবুল কালাম।

গত ১৪ মে মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে একটি কাভার্ড ভ্যান আটক করে ৪০ হাজার ইয়াবা বড়ি উদ্ধার এবং আটক করা হয় মুহিন পাটোয়ারী নামের এক ব্যক্তিকে। বনানী থানায় করা মামলার জব্দ তালিকায় স্থানীয় কোনো সম্মানিত ব্যক্তি সাক্ষী নেই। দুজন সাক্ষীর একজন যশোরের, অন্যজন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা অসংখ্য মামলায়ই এমন অবস্থা দেখা গেছে।

 



মন্তব্য