kalerkantho


রাশিয়ার উৎসবে বাজল সালাহর বিদায়ের রাগিণী

সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে প্রতিনিধি   

২০ জুন, ২০১৮ ০০:০০



রাশিয়ার উৎসবে বাজল সালাহর বিদায়ের রাগিণী

গোলের পর আরতিম জিউবার উল্লাস। মিসরকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে শেষ ষোলো প্রায় নিশ্চিত করল স্বাগতিকরাই। ছবি : এএফপি

রেড স্কয়ারের পাশের মস্কোভা নদীতে যে কুলকুল ধ্বনি; কোনইয়ুশেনায়া স্কয়ারসংলগ্ন মইকার জলেও সে সুর। মিসরীয় সমর্থকদের গানও মিশে মিশে একাকার মস্কো আর সেন্ট পিটার্সবার্গে। ওই ভিন্ন ভাষার বিন্দুবিসর্গও কি ছাই বোঝা যায়! কিন্তু সে তরুণদল তা বুঝিয়ে দেয় বৈশ্বিক সর্বজনীন ইশারার ভাষায়, ‘মো সালাহ, মো সালাহ—তুমিই মিসরের রাজা’।

হ্যাঁ, বিশ্বকাপে ‘ফারাও রাজা’ এসেছিলেন মিসরীয়দের স্বপ্নপুরুষ হয়ে। কাল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে নেমে গোলও করলেন পেনাল্টি থেকে। কিন্তু ততক্ষণে যে বড্ড দেরি হয়ে গেছে! দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ১৭ মিনিটের ঝড়ে তিন গোলে এগিয়ে তখন রাশিয়া। শেষ পর্যন্ত স্বাগতিকরা জিতেছে ওই ৩-১ ব্যবধানে। টানা দুই জয়ে রাশিয়ার নকআউট পর্বে যাওয়া যেমন নিশ্চিতপ্রায়; তেমনি টানা দুই হারে মিসরের বাড়ি ফিরে যাওয়াও।

সালাহর ওই ইনজুরিটাই তাহলে কাল হলো!

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে লিভারপুলের জার্সিতে দুর্দান্ত এক মৌসুম কাটানোর পর নজরে এসেছেন সবার। কিন্তু সর্বজনের সহানুভূতিমাখা ভালোবাসা চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে সের্হিয়ো রামোসের ফাউলের শিকার হয়ে। সে কারণে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ খেলতে পারেননি সালাহ; উরুগুয়ের কাছে হেরে যায় দল। কাল যা-ও মাঠে নামলেন, ফিরতে পারলেন না নিজেতে। হ্যাঁ, পেনাল্টি থেকে গোল করেছেন সত্যি। কিন্তু লিভারপুলের লাল জার্সির ওই ক্ষিপ্রতা দেখা যায়নি মিসরের সাদাতে। বেশ কিছু হাফ চান্সকে যে কাজে লাগাতে পারেননি সালাহ! ইনজুরির ধকল বয়ে বেড়ানোর কারণেই হয়তো বা!

রাশিয়ার অবশ্য এসবে বয়েই গেছে! স্বাগতিক দেশ হিসেবে তারা নকআউট পর্বে যেতে পারবে কি না, এ নিয়ে আশঙ্কার কমতি ছিল না।  কিন্তু প্রথম দুই ম্যাচের বিস্ফোরক জয়ে সে জোগাড়যন্ত্র করে রাখল তারা। সৌদি আরবকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর মিসরকে ৩-১ ব্যবধানে। +৭ গোল পার্থক্যের কারণে নকআউট পর্বে যাওয়ার আগাম উৎসব সেরে নিতে পারে রাশিয়া।

সেন্ট পিটার্সবার্গের সকালে রোদ্দুরে হাসা আকাশ কাল বিকেলে হয়ে যায় মেঘকালো। বৃষ্টির সঙ্গে শীতের রেণু উড়ে আসে পাশের বাল্টিক সাগর থেকে। ৬৪ হাজার ধারণক্ষমতার নতুন স্টেডিয়ামে তবু মানুষ এসেছে পিঁপড়ার মতো। পিলপিল করে, সারি বেঁধে। প্রথমার্ধ অবশ্য হতাশ করেছে তাদের। কোনো গোল হয়নি যে! বিশ্বকাপের ৩২ দলের প্রথম ১৬ ম্যাচের কোনোটি গোলশূন্য থাকেনি। অনাকাঙ্ক্ষিত সে প্রথমের আশঙ্কা জেঁকে বসে শুরুর দিকে রুশদের মিসের মহড়ায়। পরের দিকে সালাহর হাফ চান্স কাজে না লাগানোয়। বিশেষত ৪২তম মিনিটে মারোয়ান মোহসেনের ডামিতে যে বল, সেটিকে তেকাঠিতে রাখা উচিত ছিল। ভেতরে কাট করে বাঁ পায়ে মারা শটটি বেরিয়ে যায় বার ঘেঁষে।

প্রথমার্ধের শুরুতে যেমন রুশ আধিপত্য, দ্বিতীয়ার্ধেও তাই। পার্থক্য বলতে, এবার গোল আদায় করে নেয় তারা। একটি নয়, দুটি নয়, তিন-তিনটি। সেটিও প্রথম ১৭ মিনিটের মধ্যেই। গোলমুখে রোমান জোবনিনের বাজে শটে বিপদের আশঙ্কা ছিল না। কিন্তু মিসরের ডিফেন্ডার আহমেদ ফাতের পায়ে লেগে দিক বদলে তা জড়িয়ে যায় জালে। চলতি বিশ্বকাপ শুরু হলো মাত্র; তাতেই এটি পঞ্চম আত্মঘাতী গোল। এর চেয়ে বেশি হয়েছে কেবল ১৯৯৮ আসরে—ছয়টি।

দ্বিতীয়ার্ধের দ্বিতীয় মিনিটের এই গোলের পর রুশদের লাল-বিপ্লবের মশাল জ্বলে ওঠে দাউদাউ করে। ৫৯তম মিনিটে পেয়ে যায় তারা দ্বিতীয় গোল। এবার ওভারল্যাপিংয়ে মারিও ফের্নান্দেসের ক্রসে সহজ লক্ষ্যভেদ দেনিস চেরিশেভের। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় ম্যাচে এটি তাঁর তৃতীয় গোল। এর খানিক পরই স্ট্রাইকার আরতিম জিউবার বিশ্বকাপে দ্বিতীয় গোল। ইলা কুতেপোভের বল দারুণভাব নামিয়ে সামনে থাকা ডিফেন্ডারকে ধোঁকা দিয়ে জড়িয়ে দেন জালে। মাঝবৃত্তের কাছে এই গ্রহের সবচেয়ে দুঃখী মানুষটির মতো কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তখন সালাহ। বজ্রাহতের মতো। সর্বহারার মতো।

৭৩তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করেন তিনি। তবে সে গোলের সাধ্য কি সালাহকে সান্ত্বনা দেবার! রাশিয়ায় এসেছিলেন তারকাকুলে বৃহস্পতি হওয়ার আকাঙ্ক্ষায়, ফিরে যাচ্ছেন খসে পড়া বিবর্ণ এক তারকার হতাশায়! হলেনই বা তিনি ‘ফারাওদের রাজা’, কিন্তু সে পতিত সম্রাটকে মনে রাখার দায় কী বিশ্বকাপের!

 

 

সেনেগালের চমক, জাপানের শিকার কলম্বিয়া

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ১৬ বছর আগে খেলোয়াড় হিসেবে সেনেগালের প্রথম বিশ্বকাপ স্মরণীয় করে রেখেছিলেন আলিউ সিসে। সেবার আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের শূলে বিদ্ধ করা ‘তেরাঙ্গা লায়ন্স’দের স্বপ্নযাত্রা থেমেছিল কোয়ার্টার ফাইনালে তুরস্কের কাছে হেরে। সেই ২০০২ আসরের পর এবার বিশ্বকাপে ফিরে দারুণ চমকে শুরু সেনেগালের, কোচও সেই আলিউ সিসেই। ‘এইচ’ গ্রুপের ম্যাচে তারা কাল স্পার্তাক স্টেডিয়ামে ২-১ গোলে হারিয়ে দিল ইউরোপের প্রতিষ্ঠিত শক্তি পোল্যান্ডকে। এদিন একই গ্রুপের আগের ম্যাচটি অঘটনের বিশ্বকাপে দেখাল আরেকটি অঘটন। এবার জাপানের শিকার কলম্বিয়া। ভাবা যায়, যে কলম্বিয়া গত বিশ্বকাপে ৪-১ গোলে হারিয়েছিল তাদের, সেই হামেস রোদ্রিগেসের দলকে এবার প্রথম দেখাতেই জাপানিরা হারিয়ে দিয়েছে ২-১ গোলে! ম্যাচের শুরুতেই অবশ্য এ শঙ্কা উঁকি দিয়েছিল, তৃতীয় মিনিটেই যখন লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান কলম্বিয়ার অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার কার্লোস সানচেস।

বক্সের ভেতর শিনজি কাগাওয়ার শট ফেরাতে হাত উঁচু করে ফেলেছিলেন কার্লোস। গোলমুখী শট সেই হাতে লাগতেই রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে কার্লোসকে মাঠছাড়া করেন, জাপানকে দেন পেনাল্টি। বরুশিয়া ডর্টমুন্ড তারকা কাগাওয়া সেই সুযোগ হাতছাড়া করেননি। মোরদোভিয়া এরেনায় ম্যাচের তৃতীয় মিনিটেই তাই জাপান এগিয়ে যায় ১-০ ব্যবধানে। বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম লাল কার্ডের রেকর্ড এটি। শুরুর এই ধাক্কায় দমে না যাওয়া হোসে পেকারম্যানের দল ফলও পায়। বিরতির মিনিট ছয়েক আগে বক্সের সামনে রাদামেল ফালকাওকে ফাউল করা হলে ফ্রিকিক পায় কলম্বিয়া, সেখান থেকেই গড়ানো এক শটে লক্ষ্য ভেদ করেন কুইন্তেরো পানিয়াগুয়া। কিন্তু আকিরা নিশিনোর গতকালের জাপান ১০ জনের কলম্বিয়াকে ঠিকই আটকে রেখেছে। অপ্রত্যাশিত পেনাল্টিতে এগিয়ে যাওয়ার পর তারা এই লিডটাই ধরে রাখার চেষ্টা করছিল নিচে নেমে গিয়ে। কিন্তু কলম্বিয়া সমতা ফিরিয়ে ফেললে দ্বিতীয়ার্ধে আবার তারা চড়াও হয় ১০ জনের দলের ওপর। এই অর্ধে শীর্ষ পারফরমার কাগাওয়াকে উঠিয়ে নিয়ে আরেক অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড কেইসুকে হোন্ডাকে নামান নিশিনো। ৭৩ মিনিটে হোন্ডার কর্নারেই মাথা ছুঁইয়ে দলকে জয়সূচক গোলটা এনে দিয়েছেন ওসাকো। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম এশিয়ান দল হিসেবে দক্ষিণ আমেরিকান কোনো প্রতিপক্ষকে হারাল ব্লু সামুরাই।

পোলিশদের বিপক্ষে সেনেগালের এগিয়ে যাওয়াটা অবশ্য আত্মঘাতী গোলে। ৩৭ মিনিটে ইদ্রিসা গুইয়ের জোরালো শট ডিফেন্ডার থিয়াগো কোইনেকের পায়ে লেগে উল্টো পোল্যান্ডের জালেই জড়ায়। দ্বিতীয়ার্ধেও আরেকটি ভুলের মাসুল গুনতে হয় পোলিশদের। গ্রেগর্জ ক্রাইচুইয়াকের ভুল ব্যাক পাসে বল ইয়ান বেদনারেকের কাছে যাওয়ার আগেই লুফে নেন এমবায়ে নিয়াং। পোল্যান্ডের গোলরক্ষকও বক্স ছেড়ে বেরিয়ে আসেন কিন্তু তাঁকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া ফাঁকা পোস্টে বল ঠেলে নিয়াং ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। ৮৬ মিনিটে ক্রাইচুইয়াক একটি গোল শোধ করলেও বাকি সময়ে সেনেগালের চমক আটকে দেওয়ার মতো কিছু করতে পারেনি পোলিশরা।



মন্তব্য