kalerkantho


রাঙামাটির ‘মাটি’ ফের কাড়ল ১১ প্রাণ

বৃষ্টিতে পাহাড়ধস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন মহেশখালীতে আরো একজনের মৃত্যু

রাঙামাটি প্রতিনিধি   

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



রাঙামাটির ‘মাটি’ ফের কাড়ল ১১ প্রাণ

রাঙামাটি শহরের পুলিশ লাইনস এলাকায় পাহাড়ের পাশের এ সড়কটি গতকাল এভাবেই ধসে পড়ে। ছবি : কালের কণ্ঠ

গেল বছরের পাহাড়ধসের ভয়ংকর ছবি এখনো স্মৃতিতে তাজা। বছর ঘুরতেই রাঙামাটি পাহাড়ের ‘মাটি’ আবারও বিধ্বংসী হয়ে উঠল। এবার কেড়ে নিল ১১ প্রাণ। অবিরাম বর্ষণে পাহাড়ধসের শঙ্কায় সবার নজর যখন পার্বত্য শহর রাঙামাটির দিকে, ঠিক সে সময় প্রকৃতি সবাইকে অবাক করে দিয়ে নিজের ধ্বংসলীলা চালিয়ে গেল রাঙামাটির নানিয়ার চর উপজেলায়। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে নানিয়ার চরের আলাদা চার স্থানে পাহাড়ধসে এ প্রাণহানির ঘটনায় নতুন করে ভয় জন্ম নিয়েছে রাঙামাটিবাসীর মনে। ২০১৭ সালের ১২ জুন পাহাড়ধসে ১২০ জনের মৃত্যুর ঠিক ৩৬৫ দিনের মাথায় ফের এই জীবন ছেদের ঘটনা ঘটল।

নিহতদের মধ্যে সাতজন দুই পরিবারের। তারা হলো নানিয়ার চর উপজেলার ৩ নম্বর বুড়িঘাট ইউনিয়নের ধর্মচরণ কার্বারিপাড়ার ফুলদেবী চাকমা (৫৫), তাঁর মেয়ে  ইতি দেওয়ান (১৯), পুত্রবধূ স্মৃতি চাকমা (২৩) ও নাতি আয়ুব দেওয়ান (দেড় মাস); সদর ইউনিয়নের বড় পুলপাড়ার সুরেন্দ্র চাকমা (৫৫), তাঁর স্ত্রী রাজ্যদেবী চাকমা (৫০) ও মেয়ে সোনালি চাকমা (১৪)। অন্যরা হলো সাবেকক্ষং ইউনিয়নের বড় পুলপাড়ার রমেল চাকমা (১৪), বুড়িঘাট ইউনিয়নের হাতিমারাপাড়ার রিপেল চাকমা (১৪) ও রীতা চাকমা (৮) এবং ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের মনতলাপাড়ার বৃষ কেতু চাকমা (৬০)।

নানিয়ার চর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কোয়ালিটি চাকমা জানান, তিন দিন ধরে অবিরাম বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের এ ঘটনা ঘটে। নানিয়ার চরে অতীতে এমন পাহাড়ধস না হওয়ায় প্রস্তুতিও তেমন একটা ছিল না। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার স্থানগুলো দুর্গম হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারকাজও চালানো যায়নি।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশীদ জানান, তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের প্রত্যেক প্রতিবারকে ২০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে শহরের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের মানুষকে সরে যেতে বলা হয়েছে। পর্যাপ্ত খাদ্য, অর্থ ও ওষুধ মজুদ আছে।

জেলা প্রশাসন ছাড়াও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকেও নিহত প্রত্যেক পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা।

এদিকে তিন দিন ধরে চলা অবিরাম বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাঙামাটি। জেলার বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে ২৫ স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। রাঙামাটি শহরের শাহ উচ্চ বিদ্যালয়, রাণী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাহাড়ধসের কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে। এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নতুন ভবনের বিশাল দেয়াল ধসে পড়েছে।

রাঙামাটি শহরের টেলিভিশন উপকেন্দ্র আশ্রয়কেন্দ্রে গতকাল বিকেল পর্যন্ত ১১০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া রাঙামাটি বেতার কেন্দ্র আশ্রয়কেন্দ্রেও শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। পৌর এলাকায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে ২১টি আশ্রয়কেন্দ্র।

রাঙামাটির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত সোমবার ভোর ৬টা থেকে গতকাল ভোর ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাঙামাটি জেলায় ২৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক ছাড়াও রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের একাধিক স্থানে সড়কে ফাটল ও ধসের কারণে যান চলাচল বিঘ্নিত হয়েছে। জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি মঈনুদ্দিন সেলিম জানান, সড়কে সমস্যার কারণে যাত্রীবাহী বাস দুই দিন ধরে চলাচল বন্ধ আছে। তবে ছোট ছোট গাড়ি চলছে।

রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী আবু মুছা জানান, রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ঘাগড়ার দেপ্প্যছড়ি, মগাছড়ি, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ স্কয়ার এলাকা, পাসপোর্ট অফিস এলাকাসহ বেশ কিছু স্থানে সড়কে ফাটল ও পাহাড়ধসের কারণে যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে।

এদিকে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে ভয় ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে রাঙামাটিতে। এরই মধ্যে নানিয়ার চরে ১১ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর আরো বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে স্থানীয় লোকজন। তবে আশার বিষয়, গতকাল বিকেল থেকে বৃষ্টি কমে আসায় ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে থাকে মানুষ।

পাহাড়ধসে মহেশখালীতে একজনের মৃত্যু

কক্সবাজার থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, তিন দিনের টানা বর্ষণে কক্সবাজারের মহেশখালীতে পাহাড়ধসে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বর্ষণে কক্সবাজারের বেশ কিছু নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

ঝোড়ো হাওয়ার কারণে সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের হোয়ানক ইউনিয়নের পানিরছড়ায় গতকাল সকালে পাহাড়ধসে প্রাণ হারান কৃষক বাদশা মিয়া। মহেশখালী থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ জানান, সকালে পাহাড়ের পাদদেশে নিজের ক্ষেত দেখার জন্য গেলে আকস্মিক পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে। এতে বাদশা মিয়া মাটিচাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।

এদিকে টানা বর্ষণে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলের পানিতে কক্সবাজার-টেকনাফ শহীদ এটিএম জাফর আলম সড়কের রামু দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের এক কিলোমিটার এলাকা ডুবে গেছে। এ কারণে গতকাল সকাল থেকে সড়কটিতে কক্সবাজার জেলা শহরের সঙ্গে টেকনাফের যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়।

তলিয়েছে খাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, পাহাড়ি ঢল ও অবিরাম বর্ষণে খাগড়াছড়ি সদরের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেছে। চেঙ্গী নদীর দুই কূল উপচে খাগড়াছড়ি শহর, শহরতলি ও আশপাশের বেশির ভাগ পাড়া ও গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জেলা সদরের মুসলিমপাড়া, গঞ্জপাড়া, কালাডেবা, শান্তিনগর, বাঙ্গালকাঠি, গোলাবাড়ী, কমলছড়ি, খবংপুরিয়া, সিঙ্গিনালার কমপক্ষে ৫০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

চেঙ্গীর মতো মাইনী ও ফেনী নদীর পানিও বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার উদ্যোগে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে তিন শতাধিক পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঁচা ও আধাকাঁচা বহু বসতবাড়ি। গত সোমবার রাত ৯টার পর থেকে গোটা খাগড়াছড়িতে বিদ্যুৎ নেই। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক পরিস্থিতিও নিভু নিভু।

পাহাড়ি ঢলের কারণে খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি-ফেনী-ঢাকা সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি ওঠায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। দুপুরের দিকে ঢাকা ও ফেনীর গাড়ি ছেড়ে গেলেও বিকেল পর্যন্ত চট্টগ্রামের কোনো গাড়ি ছেড়ে যায়নি। খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়ক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

পৌর মেয়র রফিকুল আলম জানান, পৌর এলাকায় ৬০০ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে শুকনা খাবার ও খিচুড়ি বিতরণ করা হয়েছে। পৌর এলাকায় আটটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসক মো. রাশেদুল ইসলাম জানান, পৌর এলাকায় ৩৫০ পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুরো জেলার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। বন্যার্তদের দেখতে ছুটে যান শরণার্থীবিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি। তিনি গোলাবাড়ী এলাকা, শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া বন্যার্তদের খোঁজখবর নেন।

এদিকে টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকলে খাগড়াছড়িতেও পাহাড়ধসের শঙ্কা রয়েছে। শহরের শালবন, সবুজবাগ, কুমিল্লা টিলায় ছোট আকারে কয়েকটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে।

সাজেক ও লংগদুর সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ, দুই উদ্ধারকর্মী নিখোঁজ

দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি জানান, বন্যাকবলিত দীঘিনালার ১৫ আশ্রয়কেন্দ্রে চার শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। গতকাল ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দিনভর পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় দীঘিনালার সঙ্গে মেরুং, লংগদু, বাঘাইছড়ির গাড়ি যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তিতে রয়েছে মানুষ। দীঘিনালার খালকূলপাড়ায় উদ্ধারকাজ করার সময় ইঞ্জিনচালিত নৌকা ডুবে দুই উদ্ধারকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁরা হলেন অনুপম চাকমা ও পিকা চাকমা।

এদিকে রাঙামাটির বাঘাইছড়ির বাঘাইহাট বাজার এবং আশপাশের বসতিগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। সেখানেও পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। শতাধিক পরিবার দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। বাঘাইহাট বাজারসহ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ রয়েছে সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ।

দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শেখ শহীদুল ইসলাম জানান, বন্যাকবলিত এলাকাসহ আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা লোকজনের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি

বান্দরবান থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গতকাল দুপুরে বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় বান্দরবানের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ফলে বন্ধ হয়ে থাকা বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কে বিকল্প উপায়ে বড় বড় কিছু যানবাহন চলাচল করছে। এদিকে যাত্রীবাহী গাড়িগুলোর সরাসরি চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীসাধারণকে হাঁটুপানি ভেঙে কিংবা ভ্যানগাড়িতে চড়ে প্লাবিত অংশ পার হতে হচ্ছে। তবে ডাইভারসন সড়ক থেকে পানি না নামায় এখনো বন্ধ রয়েছে বান্দরবান-রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক।

বান্দরবান মৃত্তিকা সংরক্ষণ ও পানি উন্নয়ন কেন্দ্র সোমবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেন জানান, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোথাও পাহাড়ধস বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।



মন্তব্য