kalerkantho


সিপিডির বাজেট পর্যালোচনা

রাজস্ব আদায়ের প্রস্তাব অবাস্তব

শিক্ষায় বরাদ্দ খুবই কম স্বাস্থ্যের অবস্থাও করুণ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ জুন, ২০১৮ ০০:০০



রাজস্ব আদায়ের প্রস্তাব অবাস্তব

ছবি: কালের কণ্ঠ

প্রস্তাবিত বাজেটে উচ্চবিত্তদের নানাভাবে ছাড় দিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অন্যদিকে বিকাশমান মধ্যবিত্তের ওপর চাপ আরো বাড়ালেন। বাজেটে বিত্তশালীদের দেওয়া হয়েছে সুবিধা। আর মধ্যবিত্তের ওপর চাপানো হয়েছে করের বোঝা। প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে এমন মূল্যায়ন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির।

বৃহস্পতিবার সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যে বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তার পর্যালোচনা করে সিপিডি বলেছে, ‘এটি নবীন বাংলাদেশের জন্য প্রবীণ বাজেট।’ সিপিডি বলেছে, নির্বাচনের সময় যারা রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থায়ন করে, আসছে বাজেটে তাদের হাত ভরে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ‘রাজনীতির অর্থনীতি’ কাজ করেছে বলেও অভিমত সিপিডির। তাদের মতে, সরকারের কাছে যাদের কণ্ঠস্বর পৌঁছেছে, তারা ছাড় পাচ্ছে। কিন্তু যাদের কণ্ঠস্বর সরকারের কাছে পৌঁছে না তারা বঞ্চিত হচ্ছে। যেমনটা দেখা যাচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের দিকে তাকালে।

বাজেট ঘোষণার পর থেকে ৩৫ জন গবেষক নির্ঘুম ১৮ ঘণ্টা প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করার পর গতকাল শুক্রবার রাজধানীর লেকশোরে সংবাদ সম্মেলন করে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে ব্যাংক মালিকদের। বিনিয়োগ বাড়বে এবং সুদের হার এক অঙ্কের ঘরে (১০-এর নিচে) নেমে আসবে, এমন যুক্তি দেখিয়ে বাজেটে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট কর হার আড়াই শতাংশ (৪০ শতাংশ থেকে ৩৭.৫ শতাংশ) কমানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। কোনো ধরনের মূল্যায়ন ছাড়া এভাবে করপোরেট কর হার কমানো উচিত হবে না বলে অভিমত সিপিডির। মাঝারি ফ্ল্যাটের দামের ওপর ভ্যাটের হার কমিয়ে, ছোট ফ্ল্যাটের দামের ওপর ভ্যাটের হার বাড়িয়ে মধ্যবিত্তের কষ্ট আরো বাড়াতে চাইছেন অর্থমন্ত্রী। আর বিত্তশালীকে দিতে চাইছেন মুক্তি। গবেষণা সংস্থাটি মনে করে, প্রস্তাবিত বাজেট মধ্যবিত্তের সংকট আরো বাড়াবে। ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা আগের মতো আড়াই লাখ টাকাই থাকছে।

মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ টাকা করার দাবিতে অর্থমন্ত্রীর মন গলেনি। ফলে বছরে যাদের আয় আড়াই লাখ টাকার এক টাকাও বেশি হবে, তাকেই কর গুনতে হবে। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় পণ্য ও সেবা কেনাবেচা করে যখন তরুণ জনগোষ্ঠী নিজের পায়ে দাঁড়াতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে, উবার-পাঠাওয়ের মতো অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবার মাধ্যমে যখন তরুণ শ্রেণি ওঠার চেষ্টা করছে, তখন অর্থমন্ত্রী তাদের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট বসাতে চাইছেন। এ জন্য প্রস্তাবিত বাজেটকে নবীন বাংলাদেশের জন্য প্রবীণ বাজেট হিসেবে আখ্যা দিয়েছে সিপিডি। যদিও গতকাল বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, অনলাইনে পণ্য ও সেবা কেনাবেচার ওপরে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ ভুলক্রমে ছাপানো হয়েছে। এটি বাদ দেওয়া হবে। তামাকজাত পণ্য নিয়ে অর্থমন্ত্রীর দ্বিমুখী সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করে সিপিডি বলেছে, ‘আপনি একদিকে দেশের অভ্যন্তরে তামাকজাত পণ্যের শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করছেন; অন্যদিকে রপ্তানি উৎসাহিত করতে তামাকজাত পণ্যের ওপর আরোপিত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করেছেন।’ সিপিডি মনে করে, বিশেষ শ্রেণিকে সুবিধা দিতে এই প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি পাস হলে দেশে তামাকজাত পণ্যের উত্পাদন তো কমবেই না বরং বাড়বে। প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বাড়ানো নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই বলেও অভিযোগ সিপিডির।

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ তুলে ধরেন সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সিপিডির আরেক ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান, ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। আর সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থ বিভাগ আনুতোষিক সুবিধা (ইনভেস্টমেন্ট ইক্যুইটিস) বাবদ ২৪ হাজার ৫৫৬ টাকা রেখেছে। এই টাকা কোন কোন খাতে খরচ হবে তা স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে। আবাসন খাতে ১০ শতাংশ হারে জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ আবারও দেওয়া হয়েছে, তার সমালোচনা করে সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করি। এই সুবিধা দেওয়ার ফলে কালো টাকা ততটা সাদা হয়নি।’

বাজেটে অর্থমন্ত্রী রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছেন, সেটিকে অবাস্তব মনে করে সিপিডি। দেবপ্রিয় ভট্টচার্য বলেন, বাজেটে আয়করের চেয়ে ভ্যাট ও পরোক্ষ করের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এতে করে মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা বেশি হবে। এ ছাড়া মোট দেশজ উত্পাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির হারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না বলে অভিমত সংস্থাটির। বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বেশ কঠিনই হবে বলে মত সিপিডির। বাজেটে রাজস্ব আহরণ তিন লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭.৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির হার ৫.৬ শতাংশের মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেন অর্থমন্ত্রী। আর ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বর্তমান জিডিপির ২৩.২৫ থেকে ২৫.১৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা যদি অর্থমন্ত্রী পূরণ করতে চান, তাহলে ব্যক্তি খাতে বাড়তি এক লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে এবং সরকরি খাতে বাড়তি বিনিয়োগ করতে হবে ৩০ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭.৮ শতাংশ অর্জন করতে চাইলে আগামী অর্থবছর বর্তমানের চেয়ে বাড়তি এক লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে, যেটা অর্জন করা প্রায় কঠিন। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, চীন ও ভারতে মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় আগামী এক বছর মূল্যস্ফীতির হার ৫.৬ শতাংশের মধ্যে রাখা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগামী বাজেটে উচ্চবিত্তকে নানাভাবে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে করপোরেট কর হার কমানোর উল্টো সংকেত দেওয়া হয়েছে। আর তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, মেগা প্রকল্পগুলো শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়বে না। কিন্তু বড় প্রকল্পগুলো কবে নাগাদ শেষ হবে, তা বলা যাচ্ছে না। ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে এখনো একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজও শেষ হয়নি।

সিপিডি মনে করে, বাংলাদেশে গরিব দিন দিন আরো গরিব হচ্ছে। আর ধনী আরো ধনী হচ্ছে। এখানে শ্রমঘন উদ্যোগের পরিবর্তে পুঁজিপতি ও সম্পদশালীরা নানাভাবে পুরস্কৃত হয়। এখানে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। কিন্তু পাল্লা দিয়ে আয়, সম্পদ ও ভোগ—তিন বিভাগেই বৈষম্য বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে কম আয়ের ১০ শতাংশ মানুষের ৬০ শতাংশ আয় ক্ষয়ে গেছে। উল্টোদিকে সবচেয়ে বেশি আয়ের ১০ শতাংশের আয় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশ পূর্ব-পশ্চিম দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট পূর্বদিক। আর বরিশাল, খুলনা ও রাজশাহী পশ্চিম দিক। পূর্ব দিক উন্নত হচ্ছে। পশ্চিম অঞ্চলে দারিদ্র্য বাড়ছে। একই সঙ্গে বৈষম্যও বাড়ছে। এতেই প্রমাণিত, উন্নয়নের সুবিধা গরিব মানুষ পাচ্ছে না। বৈষম্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রবৃদ্ধির অঙ্কের বদলে সেই প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবন মানে কতটা পরিবর্তন আনতে পারছে, সেদিকে নজর বাড়ানো উচিত। কারণ আমরা বারবার বলেছি যে বিড়াল বড় হতে পারে, বিড়াল ছোট হতে পারে কিন্তু তাকে ইঁদুর ধরতে হবে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হার উঁচু হতে পারে, প্রবৃদ্ধির হার নিচু হতে পারে, কিন্তু প্রবৃদ্ধিতে গরিব মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন হতে হবে, তাদের বেশি পেতে হবে।’

বাজেটে অর্থমন্ত্রী ভ্যাট আইন কার্যকর করা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। ড. দেবপ্রিয় বলেন, ভ্যাট আইন কার্যকর নিয়ে অর্থমন্ত্রী নিশ্চুপ থেকেছেন। অথচ আর মাত্র এক বছর পর ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে কিছুই বলেননি। বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার বেশ কিছু এখনো পূরণ হয়নি। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ করেন ড. দেবপ্রিয়।

সিপিডি বলেছে, এবারের বাজেটে অর্থমন্ত্রী শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ ৫৩ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে বরাদ্দ কমেছে। চলতি অর্থবছরে মোট বাজেটের ১২.৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল শিক্ষা খাতে। অথচ আগামী অর্থবছর কমে দাঁড়াচ্ছে মোট বাজেটের ১১.৪ শতাংশে। শিক্ষা খাতে এবার যে টাকা রাখা হচ্ছে তা মোট জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ। এ বিষয়ে দেবপ্রিয় বলেন, ‘সরকার ২০২১ সালে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ, ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যেতে চায় শিক্ষা খাতে জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ অর্থ দিয়ে, যেখানে দরকার জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা ছাড়া উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ বলি আর উন্নয়নশীল দেশ বলি, তা অর্জন সম্ভব হবে না।’ সিপিডি বলেছে, স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা আরো করুণ। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে জিডিপির ১ শতাংশেরও কম, ০.৯২ শতাংশ। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নেই বলে অভিযোগ করেন মোস্তাফিজুর রহমান। সব মিলিয়ে একটি ফলাফলভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের দাবি করেছে সিপিডি।



মন্তব্য