kalerkantho


পলিথিনের বদলে আসছে পাটের পলিমার ব্যাগ

শওকত আলী   

২০ মে, ২০১৮ ০০:০০



পলিথিনের বদলে আসছে পাটের পলিমার ব্যাগ

পলিথিন তো নয়ই, এমনকি কোনো রকম প্লাস্টিক উপকরণ ছাড়াই শুধু পাটের আঁশ ব্যবহার করে বানানো হচ্ছে এক ধরনের পচনশীল পলিমার ব্যাগ, যা দেখতে হুবহু পলিথিনের মতো। আমদানি করা যেসব পচনশীল পলিমার ব্যাগ বাজারে পাওয়া যায় তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ দাম পড়বে এটির। অবশ্য দিন দিন দাম আরো কমে আসবে। এর নাম দেওয়া হয়েছে সোনালি ব্যাগ। পলিথিনের চেয়ে দেড় গুণের বেশি ভার বহন করতে সক্ষম এই ব্যাগ। পানিতে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকার পর ধীরে ধীরে এটি গলতে শুরু করে। কোনো ব্যাগ ফেলে দিলে সেটি পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে মিশে যায় মাটিতে।

পাটের সেলুলোজ থেকে এই পচনশীল পলিমার ব্যাগ তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করে দেশে-বিদেশে সাড়া ফেলেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহ্মদ খান। তিনি বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা। তাঁর তত্ত্বাবধানে বিজেএমসির আওতাধীন লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে পরীক্ষামূলকভাবে স্বল্প পরিমাণে তৈরি হচ্ছে এই পলিমার ব্যাগ। আয়োজন চলছে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাওয়ার। কিন্তু এরই মধ্যে দেশের ভেতরে, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প মালিকরা এই ব্যাগ কেনার জন্য বায়না দিতে শুরু করেছেন। দেশের বাইরেও যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চাহিদা আসছে এই ব্যাগের। শুধু পরিবেশ দূষণকারী পলিথিনের বিকল্প হিসেবেই নয়, প্যাকেজিং খাতে আরো বেশি ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এই সোনালি ব্যাগের।

দেশে অপচনশীল ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যবহার কোনোভাবেই বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। খুব সস্তা হওয়ায় দেদার চলছে এই পলিথিনের ব্যবহার। পবার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহৃত হয়। সোনালি ব্যাগ বাজারে এলে পলিথিনের প্রতি মানুষের আর আকর্ষণ থাকবে না বলে মনে করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ড. মোবারক আহ্মদ খান উদ্ভাবিত সোনালি ব্যাগ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের প্রস্তুতি চলছে। তবে তা বেশ সময়সাপেক্ষ। রাজধানীর ডেমরায় লতিফ বাওয়ানী জুট মিলের গুদামঘরের একটি কক্ষে এখনো চলছে স্বল্প পরিসরে উৎপাদন। তবে দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠানই আগ্রহ প্রকাশ করছে এই ব্যাগ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করতে। দেশি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি জাপানসহ কয়েকটি দেশের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহের কথা জানিয়েছে। তবে এখনো কোনো প্রতিষ্ঠানই বিনিয়োগের লিখিত প্রস্তাব দেয়নি।   

ড. মোবারক আহ্মদ খান বলেন, ‘সরকার যথেষ্ট আন্তরিক। আশা করি, এর বাণিজ্যিক উৎপাদনে যা যা দরকার সব কিছুতেই সরকারের দ্রুত সহযোগিতা পাব। এখন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ চলছে। এটাও একটু সময়সাপেক্ষ। কারণ বিভিন্ন দেশ থেকে মেশিনারিজ কাস্টমাইজ করে নিয়ে আসার বিষয় রয়েছে। কোন কোন দেশে মেশিনগুলো তৈরি করা সম্ভব হবে সে বিষয়ে খোঁজখবর নিতে হচ্ছে। এ কারণে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে ঠিক কত টাকা লাগবে তা এখনই বলা মুশকিল।’

সোনালি ব্যাগের বাজার সম্ভাবনা সম্পর্কে ড. মোবারক বলেন, ‘এই ব্যাগ সাধারণ পলিথিনের জায়গায় ব্যবহৃত তো হবেই, এর চেয়েও বড় বাজার রয়েছে প্যাকেজিংয়ে। আমাদের পরিকল্পনাও থাকবে সেভাবেই। এরই মধ্যে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো থেকে প্যাকেজিংয়ের জন্য চাহিদা আসছে।’

এখন যে মেশিনে ব্যাগ তৈরি হচ্ছে তার পুরো ডিজাইনও করেছেন ড. মোবারক আহ্মদ খান। তাঁর ২০ বছরের গবেষণার ফল এই সোনালি ব্যাগ। লতিফ বাওয়ানী জুট মিলের ফেলে দেওয়া পাটের অংশ থেকে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে এক হাজারের মতো ব্যাগ। সেখানে সেমি-অটোমেটিক প্লান্টে রয়েছে সেলুলোজ এক্সট্রাকশন মেশিন, রিঅ্যাকশন চেম্বার, কাস্টিং মেশিন, কাটিং অ্যান্ড প্রিন্টিং মেশিন ও প্যাকেজিংয়ের যন্ত্র। বিজেএমসির তত্ত্বাবধানে গত বছরের ১২ মে ওই প্লান্ট উদ্বোধন করা হয়।

আমদানি করা পচনশীল পলিমার ব্যাগের যে দাম তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ দামেই পাওয়া যাবে সোনালি ব্যাগ। বর্তমানে এক কেজি পলিথিন তৈরি করতে ২০০-২৫০ টাকা খরচ হয়। এর চেয়ে ৫০-১০০ টাকা বেশিতেই পাওয়া যাবে প্রতি কেজি সোনালি ব্যাগ। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে দাম আরো কমবে। ব্যাগটির দাম কমিয়ে দেবে মূলত এর বিভিন্ন বাই-প্রডাক্ট (উপজাত)। এর গুরুত্বপূর্ণ দুটি বাই-প্রডাক্ট হলো লিগনিন ও হেমোসেলুলোজ। বিভিন্ন ধরনের কসমেটিক সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহার করা হয় লিগনিন। এটি ভালো দামে বিক্রি হবে। আর হেমোসেলুলোজ সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পাটের যে আঁশ এই ব্যাগ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় তার মাত্র ২-৩ শতাংশ উচ্ছিষ্টাংশ হিসেবে বেরিয়ে আসবে। বাকি ৯৭-৯৮ শতাংশই হবে কোনো না কোনো প্রডাক্ট।

ড. মোবারক আহ্মদ খান বলেন, ‘কতটা বাই-প্রডাক্ট বের করা যায় এবং সেগুলো কতটা কাজে লাগে, এটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমার গবেষণায় এটি একটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।’

এই পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি এই বিজ্ঞানীকে ২০১৫ সালে স্বর্ণপদক দিয়েছে। এর বাইরেও তিনি পাটের সঙ্গে পলিমারের মিশ্রণে ঢেউটিন জুটিন, টয়লেটের রিং-স্ল্যাব, চেয়ার-টেবিল, হেলমেটসহ নৈমিত্তিক ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেছেন।



মন্তব্য

rubel commented 29 days ago
balo sangbad parte balo lage tar par o mone hoy dak dol ektu besi petano hoye gece bides theke offer asce dese onek silpo protistan kinte chache jar production E puro puro suru hoy ni..........