kalerkantho


নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা শিবিরে যাচ্ছেন

মিয়ানমারের নৃশংসতার তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র

কূটনৈতিক প্রতিবেদক, ঢাকা ও নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার   

২৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



মিয়ানমারের নৃশংসতার তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ নৃশংসতার ব্যাপারে ব্যাপক পরিসরে তদন্তে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির একটি প্রতিনিধিদল কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে গিয়ে তাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর নির্যাতন-নিপীড়নের তথ্য সংগ্রহ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স গতকাল বুধবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, এই তদন্ত ও সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ব্যবহৃত হতে পারে।

এদিকে জাতিসংঘের সবচেয়ে শক্তিশালী ফোরাম নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা আগামী রবিবার কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করবেন। গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে রোহিঙ্গা নিধন শুরুর পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে দেখতে এটিই তাদের প্রথম সফর। আর এই সফরকে ঘিরে সংকট সমাধানের আশা করছে আশ্রিত রোহিঙ্গারা।

জানা গেছে, নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদলটি আগামী শনিবার কক্সবাজার পৌঁছবে। পরদিন রবিবার রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সরেজমিন দেখে ঢাকায় ফিরবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহিরয়ার আলম তাঁদের সম্মানে রবিবার ঢাকার একটি হোটেলে নৈশভোজের আয়োজন করেছেন। পরদিন সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে প্রতিনিধিদলটি মিয়ানমার যাবে।

বাংলাদেশ আশা করছে, পরিস্থিতি সরেজমিন দেখার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা এ বিষয়ে প্রস্তাব আনবেন এবং সংকট সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।

রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নেতৃত্বে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে যে তদন্ত চলছে তাতে এক হাজারেরও বেশি নারী ও পুরুষের সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০০৪ সালে সুদানের দারফুর অঞ্চলে গণনৃশংসতার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের ফরেনসিক তদন্ত চালিয়েছিল। ওই তদন্ত শেষে যুক্তরাষ্ট্র ওই নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ অভিহিত করে সুদান সরকারের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, গত মার্চ ও চলতি এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০ জন তদন্তকারী রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এই তদন্তকারীরা আন্তর্জাতিক আইন ও ফৌজদারি বিচারে অভিজ্ঞ। রুয়ান্ডা ও সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার ট্রাইব্যুনাল নিয়েও তাঁরা কাজ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যগুলো ওয়াশিংটনে বিশ্লেষণ করা হবে। এরপর এসংক্রান্ত প্রতিবেদন আগামী মে বা পরের মাস জুনের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পাঠানো হবে। ট্রাম্প প্রশাসন ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করবে কি না বা মিয়ানমারের ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপের ক্ষেত্রে তা ব্যবহার করা হবে কি না তা স্পষ্ট নয়।

তদন্তকারীদের একটি নথির বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, তদন্তের উদ্দেশ্য হলো রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর কী ধরনের নৃশংসতা হয়েছে সে ব্যাপারে প্রকৃত তথ্য বের করে আনা এবং সেই নৃশংসতার জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশে তদন্তকাজে নিয়োজিত কয়েকজন তথ্য অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে রয়টার্সকে নিশ্চিত করেন। তদন্তকারী রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দাদের কাছে রাখাইন রাজ্যে তাদের আবাসস্থল, মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে আসার তারিখ এবং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের হামলা সম্পর্কে জানতে চান। তদন্তকারীরা রোহিঙ্গাদের কাছে তাদের ওপর হামলাকারী মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ব্যাটালিয়ন এবং ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন সম্পর্কেও জানতে চেয়েছেন।

তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন বলেছেন, প্রথম ধাপে এক হাজার ২৫ জন রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকার নেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে মিয়ানমারের সামরিক ইউনিটগুলোর বিষয়ে জানতে চাওয়া হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন ও নৃশংসতার বর্ণনা ছিল ভয়াবহ। প্রতিটি সাক্ষাৎকারে পাওয়া অপরাধ, যেমন—হত্যা, ধর্ষণ, যৌথ সহিংসতাকে সেগুলোর শিরোনামে সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া হামলাকারী ব্যক্তিদের পরিচয়, যেমন—বেসামরিক ব্যক্তি, মিয়ানমারের সামরিক সদস্য, পুলিশ—এসব ক্যাটাগরিতেও তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।

একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এক হাজার সাক্ষাৎকার ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের পর আমরা অপরাধীদের এবং তাদের অপরাধ সম্পর্কে নিশ্চিত উপসংহারে পৌঁছতে পারি।’ তিনি বলেন, এই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও তদন্তের পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গুরুতর অপরাধ তদন্তে একটি আন্তর্জাতিক তদন্তদল গঠন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে।

তবে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নৃশংসতাকে কী নামে সংজ্ঞায়িত করা হবে সে বিষয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরেই মতপার্থক্য আছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পররাষ্ট্র দপ্তরের পূর্ব এশিয়া বিভাগ ও ইয়াঙ্গুনে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা সু চি সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলতে চান না। তাঁদের মতে, মিয়ানমারে আরো গণতন্ত্রায়নে সু চিই সবচেয়ে ভালো ভরসা।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম বিভাগের কূটনীতিকরা মিয়ানমারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে।

এদিকে কক্সবাজারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিনিধিদলের আসন্ন সফর সম্পর্কে সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা ও দেখার জন্য সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধি মিলে প্রায় ৪০ জন কক্সবাজার সফর করবেন। এর আগে বিশ্বের অনেক দেশের সরকারপ্রধানসহ নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও খ্যাতনামা ব্যক্তিরা রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করেছেন। তবে এবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদের সফরে এই সংকটের প্রতি বৈশ্বিক গুরুত্ব নতুন করে প্রতিফলিত হচ্ছে। তাই রোহিঙ্গা নেতারাও সংকট সমাধানে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

রোহিঙ্গা নেতা আবু ছিদ্দিক বলেন, ‘জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদই হচ্ছে বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী পরিষদ। এ পরিষদের সিদ্ধান্তই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে অনেক কাজ করতে পারে।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেছেন, আগামী রবিবার সকালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দলটি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু কোনারপাড়া শূন্যরেখা এলাকা পরিদর্শনে যাবে। এরপর তারা কুতুপালং রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করবে।

প্রতিনিধিদলের সদস্যরা চার ভাগে ভাগ হয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে একান্তে আলাপ করবেন। এরপর প্রতিনিধিদলটি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক ও সংবাদ সম্মেলন করবে।

 



মন্তব্য