kalerkantho


লন্ডনে হাসিনা-মোদি বৈঠক

রোহিঙ্গা ইস্যুতে অবস্থান পাল্টেছে ভারত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২০ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা ইস্যুতে অবস্থান পাল্টেছে ভারত

কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে দেশনেতারা এখন লন্ডনে। গতকাল সেখানে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি : ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ভারত তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে, যা বাংলাদেশের চিন্তার কাছাকাছি। যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে গতকাল বৃহস্পতিবার কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের দুই দিনব্যাপী ২৫তম শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে এই দুই নেতার বৈঠকের পর পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক এ তথ্য জানিয়েছেন।

পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক সাংবাদিকদের জানান, কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে দুই প্রধানমন্ত্রী লন্ডনের ল্যাংকাস্টার হাউসে বৈঠক করেছেন। তাঁদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

রোহিঙ্গা ও তিস্তা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, বৈঠকে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী কমনওয়েলথ ইস্যু নিয়েও আলোচনা করেন।

শহীদুল হক বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনাকালে ভারত তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে, যা আমাদের চিন্তার কাছাকাছি।’ তিনি বলেন, ভারত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সহায়তা করছে।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিশ্ব ভারতী ইউনিভার্সিটিতে ‘বাংলাদেশ হাউস’ উদ্বোধনের বিষয়টিও দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় স্থান পায়। সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিমও উপস্থিত ছিলেন।

আর দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম শাহরিয়ার আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান এবং এসডিজি-বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারী মো. আবুল কালাম আজাদ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক সম্পর্কে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবিশ কুমার এক টুইট বার্তায় বলেন, ‘প্রতিবেশীই প্রথম! প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর সঙ্গে সংযোগ, কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে গঠনমূলক মতবিনিময় করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’

এদিকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং প্রত্যাশা পূরণের জন্য কমনওয়েলথকে তার লক্ষ্য অর্জনে সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘চারটি স্তম্ভের নিরিখে এই সিএইচওজিএমে চিহ্নিত লক্ষ্য অর্জন করতে চাইলেও সংস্কার অপরিহার্য।’ কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে ল্যাংকাস্টার হাউসে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, কমনওয়েলথের বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা ও কার্যক্রমের পুনর্গঠন প্রয়োজন, যাতে সদস্য দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং প্রত্যাশা পূরণ হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা কমনওয়েলথের ব্যাপক সংস্কারের জন্য একটি বিশিষ্ট ব্যক্তি গ্রুপ (ইপিজি) গঠনের সুপারিশ করছি।’ সিএইচওজিএম সভায় নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনেই এর প্রয়োজন রয়েছে মন্তব্য করেন তিনি।

নাজুক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে কমনওয়েলথ মিনিস্ট্রিয়াল অ্যাকশন (সিএমএজি) গ্রুপের ভূমিকা স্পর্শকাতর উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভালোভাবে বুঝে সে অনুযায়ী এবং কমনওয়েলথ ঐক্যের চেতনাকে সামনে রেখে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রযুক্তি ও গবেষণা বিনিময়ের আহ্বান : প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নীল অর্থনীতির সুফল পেতে হলে সামর্থ্য বিনির্মাণ এবং প্রযুক্তি, গবেষণা ও উত্তম উদ্যোগ বিনিময়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থাভুক্ত দেশগুলোর তাদের অঞ্চলের বাইরেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে ‘একটি অধিকতর সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ (কমনওয়েলথ ব্লু চার্টার)’ শীর্ষক এক অধিবেশনে অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

বাণিজ্য ব্যবস্থাকে অধিকতর টেকসই করার আহ্বান : প্রধানমন্ত্রী বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরো বেশি অংশগ্রহণমূলক ও টেকসই করতে কাজ করার জন্য কমনওয়েলথ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য কানেকটিভিটি এজেন্ডা বিষয়ক (উইন্ডসর) ঘোষণা গ্রহণ সংক্রান্ত ‘একটি অধিকতর সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে শেখ হাসিনার পাশে থাকার আহ্বান ট্রুডোর : এদিকে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় দৃঢ়তার সঙ্গে নেতৃত্ব দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে এই ইস্যুতে অবশ্যই তাঁর (শেখ হাসিনার) পাশে থাকতে কমনওয়েলথ নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হওয়ার পর প্রথম নির্বাহী অধিবেশনে ট্রুডো এই আহ্বান জানান।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও উপস্থিত ছিলেন। অধিবেশনে ট্রুডো বলেন, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষ নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। কমনওয়েলথ নেতাদের অবশ্যই তাঁকে সমর্থন দিতে হবে।’

এর আগে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা) ব্রিটেনের রানির বাসভবন বাকিংহাম প্যালেসে ২৫তম কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। এতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টসহ ৫৩টি সদস্য দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। দুই বছর পর পর কমনওয়েলথের সরকারপ্রধানদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘টুয়ার্ডস আ কমন ফিউচার’। দুই দিনের এই সম্মেলনে সদস্য দেশের নেতারা সমুদ্র সংরক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা ও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করবেন।

কমনওয়েলথ শক্তিশালী হচ্ছে—রানি: উদ্বোধনী বক্তব্যে সবাইকে স্বাগত জানিয়ে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ বলেন, ‘দিন দিন কমনওয়েলথ শক্তিশালী হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা আরো নিরাপদ, আরো সমৃদ্ধ এবং স্থিতিশীল বিশ্ব দিয়ে যেতে পারব।’ তিনি আরো বলেন, ‘১৯৪৯ সালে আমার বাবার শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ এই কাজটি প্রিন্স অব ওয়েলস আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।’ কমনওয়েলথকে বিশ্বের অন্যতম মিলিত শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে রানি বলেন, কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোকে তাদের যৌথ সামুদ্রিক সম্পদ ও বাণিজ্য রক্ষা করতে হবে।

সম্মেলনের শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য দেন প্রিন্স চার্লস ওয়েলস। এরপর সম্মেলনের যৌথ আয়োজক দেশ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে বক্তব্য দেন। কমনওয়েলথের বিদায়ী চেয়ারম্যান মাল্টার প্রধানমন্ত্রী জোসেফ মাসকাটের বক্তব্যের পর সম্মেলনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বক্তব্য দেন কমনওয়েলথের মহাসচিব প্যাট্রিসিয়া স্টকল্যান্ড। গার্ড অব অনার প্রদান এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পতাকা বহনের মধ্য দিয়ে এ অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাখা হয় সংগীত, নৃত্যসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন।

গতকাল সকাল থেকেই বাকিংহাম প্যালেসে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা আসতে শুরু করেন। বলরুমে রানি প্রবেশ করেন রাজপরিবারের সদস্যদের নিয়ে। সম্মেলন ঘিরে বাকিংহাম প্যালেসের বাইরের দিকটা সেজেছে রাজকীয় সাজে। বিশেষ পোশাকে সজ্জিত শতাধিক কর্মকর্তা ও সৈন্য ব্যান্ড ও ড্রাম বাজিয়ে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ও কমনওয়েলথ মহাসচিব সরকারপ্রধানদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান। এরপর সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ‘টুয়ার্ডস আ কমন ফিউচার’-এর ওপর দুটি সেশনে অংশগ্রহণ এবং কমনওয়েলথ মহাসচিবের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও অংশ নেন শেখ হাসিনা।

স্থানীয় সময় বিকেলে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। রাতে রানির দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেওয়ার কথা শেখ হাসিনার।

সম্মেলনে কমনওয়েলথ সদস্য দেশগুলোর লক্ষ্য অর্জনে সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। সম্মেলনে মাল্টার প্রধানমন্ত্রী জোসেফ মাসকাটের কাছ থেকে কমনওয়েলথ চেয়ার ইন অফিস ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মের কাছে স্থানান্তর হয়। টেরেসা মে ২০২০ সালে অনুষ্ঠেয় ২৬তম কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলন পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করবেন।

২০১৭ সালের শেষ দিকে ২৫তম কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। স্বাগতিক দেশ ছিল ভানুয়াতু। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যে আয়োজন করা হয়। সিঙ্গাপুরে ১৯৭১ সালে কমনওয়েলথ নেতাদের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালে মাল্টায়।

১৩ গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে সই প্রধানমন্ত্রীর : লন্ডন থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ১৩টি ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম জানান, লন্ডনে ব্যস্ত কর্মসূচি সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল ব্যবস্থায় অফিস চালিয়ে যাচ্ছেন এবং ফাইলে স্বাক্ষর ও নিষ্পত্তি করছেন। ১৭ এপ্রিল লন্ডনে পৌঁছার পর এ পর্যন্ত ক্রয় কমিটি, জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও জননিরাপত্তা বিভাগসংশ্লিষ্ট ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিকস ফাইলে (ই-ফাইলে) স্বাক্ষর করেছেন তিনি।

প্রেসসচিব আরো জানান, প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে সব গুরুত্বপূর্ণ ফাইল তাঁর কাছে পাঠানোর জন্য অফিসকে নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশের পর প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরকারের ডিজিটাইজেশনের সুবিধা ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো ই-মেইল করেছেন। সূত্র : বাসস।



মন্তব্য