kalerkantho


গুলশানে গারো মা ও মেয়ে খুন

সন্দেহে ভাগ্নে ও মেয়ের জামাইয়ের বন্ধু

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



গুলশানে গারো মা ও মেয়ে খুন

প্রতীকী ছবি

বাসায় ঢুকে খাটের ওপর শাশুড়ির লাশ দেখে চিৎকার করে ওঠেন জামাতা। ডেকে নেন বাড়ির দারোয়ানকে। হাজির হয় স্বজনরা। ছুটে আসে প্রতিবেশীও। খবর দেওয়া হয় থানায়। পুলিশের সঙ্গে আসেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। নিহত নারীর লাশ উদ্ধারের প্রক্রিয়া এবং স্বজনদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। বাসায় সাত সদস্যের ছয়জনকে পাওয়া গেলেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না নিহত নারীর বৃদ্ধা মাকে। এরই মধ্যে কেটে যায় দুই ঘণ্টা। পাশের কক্ষে পানির পাত্র খুঁজতে গিয়ে আরেক খাটের নিচে পাওয়া সেই বৃদ্ধার মৃতদেহ। তাঁর গলায় কাপড় দিয়ে ফাঁস জড়ানো।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানের কালাচাঁদপুরের বারিধারা শিশু মালঞ্চ কিন্ডারগার্টেন ও হাই স্কুল সড়কের একটি বাড়িতে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। ভাড়া বাসায় ঢুকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে গারো নারী সুজাতা চিরান (৪৫) এবং তাঁর মা বেসেথ চিরানকে (৬৫) শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। স্বজন, পুলিশ ও প্রতিবেশীরা বলছে, পারিবারিক বিরোধের জেরেই খুন হয়েছেন মা ও মেয়ে। ঘটনার সময় সুজাতার স্বামী, তিন মেয়ে ও এক মেয়ের স্বামী কর্মস্থলে ছিলেন বলে দাবি করছেন। তবে দুপুরে সুজাতার বোনের ছেলে সঞ্জিত ও মেয়ে মায়াবীর স্বামী পেরেস্তার বন্ধুসহ চার যুবক বাসায় এসেছিল। বাড়ির সিসি ক্যামেরায় তাদের আসা-যাওয়ার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এদিকে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, একটি অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে গত সোমবার রাতেও সুজাতাদের বাসায় ঝগড়া হয়। এ সময় সুজাতা ও তাঁর এক মেয়েকে বাসা থেকে বের করে দেন তাঁর স্বামী আশিষ মানকিন। পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, নিহতদের স্বজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার সূত্র বের করার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।

রাতে ঘটনাস্থলে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোশতাক আহমেদ বলেন, ঘটনার সময় নিহত সুজাতার স্বামী ও মেয়েরা কেউ বাসায় ছিলেন না। একজন বাসায় ঢুকে বিছানায় সুজাতার গলাকাটা লাশ দেখতে পান। পরে খাটের নিচে তাঁর মায়ের শ্বাসরোধ করা মৃতদেহ পাওয়া যায়। বাসা থেকে কিছু খোয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক বিরোধেই এই খুন হয়েছে।

কালাচাঁদপুরের বারিধারা শিশু মালঞ্চ কিন্ডারগার্টেন ও হাই স্কুল সড়কের ক-৫৮/২ নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলায় দুই কক্ষের একটি ছোট বাসা নিয়ে থাকত গারো যৌথ পরিবারটি। সেখানেই গতকাল এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। সরেজমিনে গেলে বাড়ির মালিক মৃত আবুল হোসেনের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ১৮ মাস আগে সুজাতা ও তাঁর স্বামী আশিষ বাসাটি ভাড়া নেন। বাসায় তাঁদের পরিবারের সাতজন থাকেন। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে দারোয়ান আব্দুল আজিজ ফোন করে বাসায় একটি লাশ পাওয়া গেছে বলে তাঁকে জানান। তখন তিনি পুলিশে খবর দেন। এর অনেক পরে আরেকটি লাশ পাওয়া যায়।

গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সালাউদ্দিন বলেন, বাড়িতে বৃদ্ধা বেসেথ, তাঁর মেয়ে সুজাতা, সুজাতার স্বামী আশিষ, সুজাতার তিন মেয়ে মায়াবী, মাধবী ও সুরভী এবং মায়াবীর স্বামী পেরেস্তা থাকেন। তাঁদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে। মায়াবী বিক্রয়কর্মী, আশিষ ও পেরেস্তা দারোয়ান, মাধবী পার্লারের কর্মী ও সুরভী কারখানার কর্মী। গতকাল হত্যাকাণ্ডের সময় তাঁরা সবাই বাইরে ছিলেন বলে দাবি করছেন। তবে এক আত্মীয়সহ কয়েকজন বাসায় এসেছিল।

পুলিশ ও প্রতিবেশীরা জানায়, ৬টার দিকে মায়াবীর স্বামী পেরেস্তা বাসায় ফিরে বিছানায় শাশুড়ির গলাকাটা রক্তাক্ত লাশ দেখে দারোয়ানকে ডেকে নিয়ে যান। এর দুই ঘণ্টা পর পুলিশ আরেক কক্ষে খাটের নিচে বেসেথের লাশ পায়। সুজাতার গলায় কাটা ছাড়াও পিঠে কয়েকটি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন আছে। বেসেথকে কাপড় দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়।

পুলিশের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, দুপুর ২টার দিকে বাসায় আসে সুজাতার বোনের ছেলে সঞ্জিত। এ সময় সঞ্জিত ও পেরেস্তার তিন বন্ধুও সঙ্গে ছিল। তারা ৪টার পর বের হয়ে যায়। বাড়ির সিসি ক্যামেরার ফুটেজে এই দৃশ্য ধরা পড়েছে। সেই ফুটেজ জব্দ করেছে পুলিশ।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রতিবেশী জানায়, সোমবার রাতে সুজাতাদের বাসায় মায়াবীর এক বোনের সঙ্গে জামাইয়ের অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে দুজন বাসা থেকে বের হয়ে যান।



মন্তব্য