kalerkantho


শ্রমশক্তি জরিপ প্রকাশ হচ্ছে আজ

আরিফুর রহমান   

২০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



শ্রমশক্তি জরিপ প্রকাশ হচ্ছে আজ

ইমরান আহমেদ (ছদ্মনাম) ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়েছেন ২০১৪ সালে। তিন বছর ধরে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) ও কয়েকটি ব্যাংকে পরীক্ষা দিয়ে এখনো জোটাতে পারেননি চাকরি নামের সোনার হরিণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে বর্তমানে যে আন্দোলন চলছে, সেখানে একজন সক্রিয় কর্মী তিনি। তাঁর মতো হাজারো বেকার যুবক আছেন, শিক্ষাজীবন শেষ করে যাঁরা বেকার ঘুরছেন। পরিবার ও সমাজ তাঁদের বাঁকা চোখে দেখে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাটাই বেশি। উচ্চশিক্ষায় বর্তমানে বেকারের হার ১১.২ শতাংশ। এক বছর আগে এ হার ছিল ১০.২ শতাংশ। এক বছরে উচ্চশিক্ষায় বেকারের হার বেড়েছে ১ শতাংশ। শ্রমশক্তি জরিপে দেখা যায়, দেশে যেখানে বেকারের হার ৪.২ শতাংশ; সেখানে উচ্চশিক্ষা শেষ করে বেকার হয়ে বসে আছেন ১১ শতাংশ তরুণ। যাঁদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ এর মধ্যে। এই জরিপটি আজ মঙ্গলবার প্রকাশ হওয়ার কথা। শ্রমশক্তি জরিপটি পরিচালনা করেছে বিবিএসের শিল্প শাখা।

উচ্চশিক্ষায় বেকারের হার যে বাড়ছে, তা দেখা যায় বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের হার দেখে। ৩৮তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩২ জন। এর আগে ৩৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা দিয়েছিলেন দুই লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৬ জন। প্রতিবছর বিসিএসে অংশ নেওয়ার হার আগের বছরের রেকর্ড ভাঙছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে পরীক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়।

কেন বাড়ছে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা? এ প্রসঙ্গে দেশের অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা বলছেন, চাকরিদাতা তাঁর চাহিদামতো লোক খুঁজে পাচ্ছেন না। কর্মক্ষেত্রে এখন যে ধরনের চাকরি রয়েছে, সেখানে কাজ করার মতো যোগ্যতা নেই এসব শিক্ষার্থীর। অন্যদিকে বেকার তরুণরা যে ধরনের চাকরি, যে বেতনের চাকরি প্রত্যাশা করেন সেটিও পাচ্ছেন না। দুই প্রত্যাশার মধ্যে ফারাক অনেক হওয়ায় দেশে বেকারের হার বাড়ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শিক্ষিত মানুষের চাকরির সুযোগ আছে। সেটি অফুরন্ত; কিন্তু বাজারে যে ধরনের দক্ষ মানুষের চাহিদা রয়েছে, শিক্ষিতদের মধ্যে অনেকে সে চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। ফলে বিদেশ থেকে এনে চাহিদা মেটানো হচ্ছে। আর দেশে শিক্ষিতদের অনেকে বেকার থেকে যাচ্ছেন।

এদিকে শুধু উচ্চশিক্ষায় নয়; দেশে সব ধরনের বেকারের হার বাড়ছে। গত এক বছরে বেকার বেড়েছে এক লাখ। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, দেশে বর্তমানে বেকারের হার বেড়ে ২৭ লাখে উন্নীত হয়েছে। এক বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ বেকার ১৪ লাখ। নারী বেকার ১৩ লাখ।

উচ্চশিক্ষায় বেকার বাড়া প্রসঙ্গে সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চের (সিডার) নির্বাহী চেয়ারম্যান রুশিদান ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তিন কারণে দেশে উচ্চশিক্ষায় বেকারের হার বাড়ছে। প্রথমত, এখনকার কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। তাই যাঁরা চাকরিদাতা, তাঁরা প্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞ লোক চান। দ্বিতীয়ত, নিয়োগকারী যে ধরনের শিক্ষা ও শিক্ষার গুণগত মান চান, সেটি পাওয়া যাচ্ছে না। তৃতীয়ত, চাকরিপ্রত্যাশীরা তাঁদের প্রত্যাশার আলোকে কাজ পাচ্ছেন না। এসব কারণে দেশে উচ্চশিক্ষায় বেকারের হার বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মকে এখন চাকরির পেছনে না ছুটে আত্মকর্মসংস্থানের দিকে ছোটা উচিত।’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ এখন ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করছেন; কিন্তু উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে কারিগরি জ্ঞানের অভাব থাকায় তাঁরা চাকরি পাচ্ছেন না। এ কারণে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। তাঁদের বেকার থাকার আরেকটি কারণ হলো, সমাজে যে ধরনের কাজ পাওয়া যায়, উচ্চশিক্ষিতরা সে ধরনের কাজ করতে আগ্রহী নন; কিন্তু তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী চাকরির ক্ষেত্রও কম। আর তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী চাকরির জন্য যে ধরনের কারিগরি জ্ঞান দরকার, তা তাঁদের নেই। পাশাপাশি, দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যে হারে বাড়ছে, সে হারে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়াটাও এর একটি বড় কারণ।’ উচ্চশিক্ষার পেছনে না ছুটে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। 


মন্তব্য