kalerkantho


আসল গোয়েন্দা পুলিশের ত্রুটিতে নকলের দাপট!

রেজোয়ান বিশ্বাস    

২০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আসল গোয়েন্দা পুলিশের ত্রুটিতে নকলের দাপট!

ঘটনা এক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে যাচ্ছিলেন শিক্ষার্থী মুজাহিদুল ইসলাম লিও। রাজধানীর রাজাবাজার এলাকা থেকে হেঁটে পশ্চিম তেজতুরী বাজারে আসতেই কয়েকজন তাঁকে টেনে মাইক্রোবাসে তোলে। হাত-মুখ বেঁধে, কপালে অস্ত্র ধরে কিল-ঘুষি মারতে মারতে বলে, ‘চিৎকার করবি না, আমরা ডিবির লোক। তোর পরিবারকে ফোন দে, দুই লাখ টাকা দিতে বল।’ লিও বাসায় ফোন দেন। পরিবার টাকা জোগাড় করে বিকাশের মাধ্যমে ৪৫ হাজার টাকা দেয়। আর চার ঘণ্টা রাস্তায় মাইক্রোবাসে ঘোরানোর পর দুর্বৃত্তরা লিওকে প্রায় চলন্ত মাইক্রোবাস থেকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। গত বৃহস্পতিবার সকালের এই ঘটনার পর লিও এখনো ভয় কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

ঘটনা দুই। ২৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম থেকে বাসে এসে রাত ১১টার দিকে ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে নামেন আল আমিন (১৯) ও মাহিন (১৯) নামের দুই তরুণ। নামতেই এক দল যুবক নিজেদের গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয় দিয়ে দুজনকে ‘আটক’ করে টার্মিনাল এলাকার একটি বাসায় নিয়ে যায়। তারপর পরিবারের কাছে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এরপর কিশোরদের পায়ুপথে স্ক্রু ড্রাইভার ঢুকিয়ে দেওয়া, প্লাস দিয়ে হাত-পায়ের নখ উপড়ে ফেলা, ইলেকট্রিক শক দেওয়ার মতো নির্যাতন চালায়। এর মধ্যে আমিন কৌশলে পালিয়ে এসে ধলপুরে র‌্যাব-১০-কে খবর দেয়। দ্রুত গিয়ে র‌্যাব ওই বাসা থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাস্থল থেকে চাপাতি, স্ক্রু ড্রাইভার, চুল কাটার কাঁচি ও

বাঁশের লাঠি জব্দ করে র‌্যাব। তবে মাহিনকে পাওয়া যায়নি। এখনো তাঁকে উদ্ধার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় গত ১ মার্চ আল আমিন মামলা করেছেন।

এমন ঘটনা আরো কিছু আছে। গত ৯ মার্চ সকাল ১১টার দিকে জাফর ইকবাল ও মিরাজ গাজী নামের দুই ব্যবসায়ীকে দিনেদুুপুরে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা থেকে অপহরণ করা হয়। পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করার পর অপহরণকারীরা টর্চারসেলে দুজনকে হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে নির্যাতন চালায়। তারা অপহৃতদের আর্তচিৎকার ফোন দিয়ে পরিবারকে শোনায়। ভয়ে দুই পরিবার ১০ লাখ টাকা চক্রের কাছে পাঠায়। এদিকে খবর পেয়ে র‌্যাব টর্চারসেল থেকে দুই ব্যবসায়ীকে উদ্ধার এবং দলনেতা সেলিম মোল্লা ও তার ছেলে রাজীবসহ ১০ জনকে আটক করে। এরপর গত ১১ মার্চ রাজধানীর বারিধারা থেকে ডিবি পরিচয়ে সজল চৌধুরী নামে আরেক ব্যবসায়ীকে তাঁর বাসা থেকে তুলে নেয়। এই ব্যবসায়ী গত রবিবার ফিরে এসে বলেছেন, তিনি ‘নরক’ দেখে এসেছেন। শিক্ষার্থী লিও কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘আমি মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরেছি। সেই দৃশ্য ভোলার চেষ্টা করেও পারছি না।’

গত এক মাসে শুধু রাজধানীতেই এ রকম অন্তত ২০টি ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, গত এক বছরে রাজধানীসহ সারা দেশে শতাধিক অপহরণ, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, এসব ক্ষেত্রে সাধারণত পুলিশ বা গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয় দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ ও র‌্যাবের তথ্যমতে, গত এক বছরে সারা দেশে ভুয়া বা নকল পুলিশ ধরা পড়েছে শতাধিক। তাদের কাছ থেকে ওয়াকিটকি, অস্ত্র, হাতকড়া এবং তাদের ব্যবহার করা গাড়িও উদ্ধার করা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও কিছু অনিয়ম রয়েছে জানিয়ে একজন পুলিশ কর্তকর্তা বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে এ ধরনের অপরাধীদের তৎপরতা বাড়ছে। তবে এ ক্ষেত্রে আসল ডিবিরও অনেক ত্রুটি আছে। নিয়মানুযায়ী ডিবি পুলিশের সদস্যরা অভিযানে গেলে সাদা পোশাকের ওপর তাঁদের অবশ্যই ডিবি লেখা জ্যাকেট পরতে হবে। তা মানা হচ্ছে না বলে অন্যরাও সুযোগ নিচ্ছে।’

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, ডিবি পরিচয়ে অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতির অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে গোয়েন্দা টিম অর্থাৎ ডিবি পরিচয়ে কোথাও অভিযানে গেলে অবশ্যই তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে কেউ যদি তার সিনিয়র কর্মকর্তাকে না জানিয়ে অভিযানে যায়, তাহলে অবশ্যই তাকে জবাবদিহি করতে হয়। কখনো কখনো বিশেষ প্রয়োজনে নিয়মের কিছুটা ব্যতিক্রমও ঘটে। সে ক্ষেত্রেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানোর নিয়ম আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় এই নির্দেশনা ডিবি সদস্যরা মেনে অভিযান চালান না।’ জ্যাকেট ছাড়া অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। আসামি ধরতে গিয়ে অনেক সময় নানা কৌশল নিতে হয়। সে ক্ষেত্রে জ্যাকেট ছাড়াই সাদা পোশাকে অভিযান চালাতে হয়। তবে কোনো কারণ ছাড়াই নিয়ম ভঙ্গ করে কেউ অভিযানে গেলে কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ড করে ধরা পড়লে তাকে বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হতেই হবে।

এদিকে এ ধরনের ঘটনা বেড়ে চললেও ঢাকা মহানগর পুলিশ তেমন কোনো (ডিএমপি) কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। কয়েক দিন আগে ডিএমপি সদর দপ্তরে মাসিক ক্রাইম কনফারেন্সে এ নিয়ে আটটি ক্রাইম জোনের উপকমিশনারদের (ডিসি) কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন খোদ ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তিনি বলেন, নকল বা ভুয়া পুলিশের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আসল পুলিশের কাজও কখনো কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

র‌্যাবের পক্ষ থেকেও এই চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানান সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান। তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধীদের ধরতে র‌্যাব বরাবরই তৎপর রয়েছে। সম্প্রতি অপহরণকারী একটি বড় চক্রকে ধরতে পেরেছে র‌্যাব। সেই সঙ্গে অপহৃত দুই ব্যবসায়ীকে  উদ্ধার করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ‘হ্যাঁ এটি বেড়েছে। অপরাধীরাও এখন ডিবি পরিচয়ে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে। বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।’


মন্তব্য