kalerkantho


বাইরের শক্তির দিকে তাকিয়ে বিএনপি

এনাম আবেদীন   

১৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বাইরের শক্তির দিকে তাকিয়ে বিএনপি

আন্দোলনের চেয়ে নির্বাচন-পূর্ব ‘আন্তর্জাতিক সমীকরণ’ থেকে রাজনৈতিকভাবে বেশি লাভবান হওয়া যাবে বলে মনে করছে বিএনপি। দলটির প্রত্যাশা—পরিস্থিতি এখন যেমনই থাক, বাংলাদেশে নির্বাচন প্রশ্নে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান নির্বাচনের সময় স্পষ্ট হবে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের অবস্থান এ ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে দলটি। তবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নে ভারতের অবস্থান নিয়ে কিছুদিন আগ পর্যন্ত বিএনপি যতটা আশাবাদী ছিল, সম্প্রতি তা কিছুটা কমে এসেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।

সূত্র মতে, ভারতের ভূমিকা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছে না বিএনপির হাইকমান্ড। এ বিষয়ে বিএনপি নেতাদের কাছে একেক সময় একেক রকম খবর বা মূল্যায়নের কথা শোনা যায়।

২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সফরকালে বাংলাদেশের সঙ্গে দুই হাজার ৪০০ কোটি ডলারের সমঝোতা স্মারক সই হয়। পরে দেশটির অর্থায়নে নৌবাহিনীর জন্য দুটি সাবমেরিন কেনায় ভারত রুষ্ট হয় বলে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবরে জানা যায়। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় তখন প্রায় একই সময়ে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রসচিব বাংলাদেশ সফরে আসেন। চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নীতিতেও যুক্ত হয় বাংলাদেশ। এরপর গত বছর এপ্রিলে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিতে সই করে। পর্যবেক্ষকদের মতে, দুটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কে ভারসাম্য আনতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশকে ওই চুক্তি করতে হয়।

এসব ঘটনার পর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করতে থাকে যে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ‘সব ডিম এক ঝুড়িতে’ নাও রাখতে পারে ভারত। বিএনপির পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগও বাড়ানো হয়। কিন্তু তাতে ভারতের অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে দলটি এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি। এর কারণ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত ও চীনের সঙ্গে বেশ ভারসাম্যমূলকভাবে সম্পর্ক রক্ষা করে চলছে বর্তমান সরকার। সম্প্রতি ভারতীয় সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

যদিও বিএনপির হিসাব হচ্ছে, ভারত ও চীনের প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে সরকারের এই ভারসাম্যের নীতি একসময় অকার্যকর হয়ে পড়তে বাধ্য। কারণ ভারত সংগত কারণেই বাংলাদেশকে তার বলয়ের মধ্যে রাখতে চায়। কিন্তু প্রতিরক্ষাসহ দু-একটি ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সরকারের ঘনিষ্ঠতা কখনো কখনো ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে বিভিন্ন মহল থেকে বিএনপির কাছে খবর পৌঁছায়। আর এটিই দলটির আশাবাদী হয়ে ওঠার কারণ বলে জানা যায়। বিএনপি নেতাদের মতে, এ রকম অবস্থায় ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে সুসম্পর্ক রক্ষা করা কঠিন। দলটির নেতারা মনে করেন, নির্বাচনের আগে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কোনো না কোনো সমীকরণ তৈরি হতে পারে; বিশেষ করে সমানভাবে নাও মিলতে পারে ভারত ও চীনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসাব। তেমন পরিস্থিতিতে তৈরি হতে পারে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রেক্ষাপট।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে তা কতটুকু কার্যকর প্রভাব ফেলবে, তা ভবিষ্যত্ই বলে দেবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনে যে ভূমিকাই থাকুক, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন একবাক্যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলছে। তাই আমরা প্রত্যাশা করতে পারি যে এ প্রশ্নে তাদের ইতিবাচক ভূমিকাই দৃশ্যমান হবে।’  

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, নির্বাচনের আগে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে তাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বসে থাকবে না। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ভূ-রাজনৈতিক কারণে এ দেশের রাজনীতির প্রতি অনেকের আগ্রহ রয়েছে। ফলে তাদের ভূমিকা থাকবে না, এটি বলা যাবে না। তিনি আরো বলেন, ‘গত নির্বাচনে যদি কোনো দেশ ভূমিকা পালন করেও থাকে, এবার সেটি করবে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যেমন মেরুকরণ ঘটবে, তেমনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও মেরুকরণ ঘটবে।’ বৈদেশিক ক্ষেত্রে বিএনপির পক্ষে দায়িত্ব পালনকারী এই নেতা বলেন, ‘চীন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপ করে না। তবে এক্সটারনাললি কী সাপোর্ট করে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।’

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ভূ-রাজনৈতিক হিসাব থেকে এ ক্ষেত্রে ভারতকে সমর্থন করছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিয়ানমারসহ দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং সর্বশেষ মালদ্বীপে চীনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করা হয়। ব্যাপক বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশেও চীনের উপস্থিতি দৃশ্যমান। কিন্তু এরই মধ্যে আবার রোহিঙ্গা সংকট পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। চীন ও ভারত উভয় দেশই মিয়ানমারের বন্ধুত্ব লাভের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। আর বাংলাদেশে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ঢোকার মতো সংকট সৃষ্টিকারী মিয়ানমারকে আবার সমর্থন দিচ্ছে চীন। ফলে চীন সব ব্যাপারে আগামী দিনে নীরব থাকবে এমনটি মনে করেন না বিশ্লেষকরা। তাঁরা মনে করেন, প্রকাশ্যে না হলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে দেশটি নেপথ্যে ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীনের ভূমিকা আগে কখনোই দৃশ্যমান ছিল না। তবে ভারতের ভূমিকা আলোচনায় বেশি গুরুত্ব পায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব ওই নির্বাচন সমর্থন না করলেও শুধু ভারতের সমর্থন নিয়ে সরকার কোনো রকমে ওই নির্বাচন সম্পন্ন করতে সক্ষম হয় বলে দেশে-বিদেশে আলোচনা আছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কংগ্রেস সরকারের ভারত গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে একতরফা সমর্থন করলেও চীন তখন মাথা ঘামায়নি। কারণ চীন মূলত ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়েই বেশি মনোযোগী। এ ক্ষেত্রে দিল্লির সঙ্গে পেইচিংয়ের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু বিজেপির ভারত আগামীতে কী পদক্ষেপ নেবে, সেটি বলা মুশকিল। কারণ চীনের সঙ্গে এ দেশের সরকার কী করছে, সেটি ভারতের মূল কনসার্ন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই অধ্যাপক আরো বলেন, ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডের বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ঐকমত্য আছে। কিন্তু দিল্লি আবার এটিতে অসন্তুষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের দুটি সাবমেরিন কেনার বিষয়টিও ভারত ভালোভাবে নেয়নি। সরকারের চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ায় বিষয়টিও ভারত ভালোভাবে নেয়নি। ফলে আগামী নির্বাচনের সময় সব ডিম এক ঝুড়িতে ভারত নাও রাখতে পারে। সে হয়তো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারেই বেশি সচেষ্ট থাকবে।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. তারেক শামসুর রেহমানের মতে, বাংলাদেশে চীন ও ভারত উভয় দেশের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে, ভারতের স্বার্থ একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক। কিন্তু চীনের স্বার্থ শুধু অর্থনৈতিক। চীন কখনো অন্য দেশের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে না। সে তার অর্থনৈতিক স্বার্থগুলো পর্যবেক্ষণ করে। তিনি বলেন, ভারত চাইবে এই সরকার ক্ষমতায় থাকুক, যাতে তার সঙ্গে করা চুক্তিগুলোর ধারাবাহিকতা থাকে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই অধ্যাপক আরো বলেন, বাংলাদেশকে নিয়ে সূক্ষ্ম একটি প্রতিযোগিতা ভারত ও চীনের মধ্যে আছে, সেটি ভারতের সেনাপ্রধানের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ ভারত চায় না। কিন্তু এসব সত্ত্বেও ভারত আগের অবস্থানেই থাকবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির অবশ্য মনে করেন, নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সম্পৃক্ত হবে কি না সেটি সম্পূর্ণ তাদের ওপর নির্ভর করছে। নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে কি না সে সিদ্ধান্তও তাদের। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বলয় প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় জড়িত হওয়া এক কথা নয়। বিএনপি আন্তর্জাতিক সমীকরণের জন্য চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে নির্বাচন করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এখন বিএনপি যদি বিদেশিদের অন্তর্ভুক্ত করতে চায় তাহলে তারা সেটি নির্বাচন কমিশনকে বলতে পারে। কমিশন তাদের বলবে, তোমরা পর্যবেক্ষক পাঠাও। আওয়ামী লীগের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ মনে করেন, যত দিন চীনে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার রয়েছে, তত দিন চীনের কাছ থেকে বিএনপির সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার ঢাকায় তাইওয়ান সেন্টার খুলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করেছে। সেই সময় বিরোধী দলে থেকেও আওয়ামী লীগ ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে চীনকে সমর্থন করে। এ ঘটনা গত ১৬ বছরেও চীনারা ভুলে যায়নি। সুতরাং বিএনপি চীন থেকে কোনো সুবিধা পাবে না।

ভারতের কাছ থেকেও বিএনপি সুবিধা পাবে না—এমন অভিমত ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এই নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, “২০০১ সালের নির্বাচনের আগে ‘র’-এর মাধ্যমে তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে একটি বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। ওই সময় কিছুদিনের জন্য আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা খারাপ হলে পরে আওয়ামী লীগ আবার সেটি পুনর্বহাল করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে সেই সম্পর্কেরই ধারাবাহিকতা চলছে।” কাজী জাফরুল্লাহ আরো বলেন, বিএনপি নানাভাবে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে। সময় বলে দেবে ভারত কোন পক্ষে অবস্থান নেয়।

 

 



মন্তব্য