kalerkantho


বিপাকে খামারিরা

দুধের দাম কমার সুফল মেলে না

শওকত আলী   

১৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



দুধের দাম কমার সুফল মেলে না

খামারিদের কাছ থেকে যে কম্পানিগুলো তরল দুধ ক্রয়ের পর বাজারজাত করে, চলতি বছরের শুরুতে তারা তিন-চারবার দাম কমিয়েছে। এর ফলে ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রান্তিক দুগ্ধ খামারিরা। এই খামারিদের আয়ের প্রধান উৎস গাভির দুধ বিক্রি। সেই আয় দিয়ে তাঁরা সংসার চালান, ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন। কিন্তু বাজারজাতকারী কম্পানিগুলো খামারিপর্যায়ে দুধের দাম কমালেও ভোক্তাপর্যায়ে কমায়নি। উল্টো দাম বাড়িয়েছে।

সর্বাধিক গরুর দুধ উৎপাদন হয় পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায়। পাবনা অঞ্চলে সাড়ে চার লাখ পরিবারের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ পরিবারের গরুর খামার রয়েছে। এদের প্রায় অধিকাংশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গরুর খামার করেছে। আর ওই খামার থেকে উৎপাদিত দুধ দেশের মোট চাহিদার বড় একটি অংশ মেটায়। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বেশ কিছু কম্পানি লিটারপ্রতি সাড়ে তিন টাকা থেকে সাড়ে চার টাকা পর্যন্ত দাম কমিয়েছে। এতে করে উৎপাদন ব্যয় তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন প্রান্তিক খামারিরা।

পাবনা অঞ্চলের খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যখন বাজারে দুধের চাহিদা একটু বেশি থাকে তখন খামারিদের কাছে হন্যে হয়ে ছুটে যায় কম্পানির লোকেরা। চাহিদা পড়ে গেলে দুধও কেনে কম, সঙ্গে দাম কমিয়ে চাপের মধ্যে রাখে খামারিদের। ওই সময়টায় প্রান্তিক খামারিরা পরিবারের খরচ বহন করতে এবং ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হিমশিম খান। অন্যদিকে দেখা গেছে, চাহিদা কম থাকার সময়ও বাজারজাতকারী কম্পানিগুলো ভোক্তাপর্যায়ে দুধের দাম না কমিয়ে বরং বাড়ায়।

পাবনার চাটমোহর থানার খামারি খোকন বিশ্বাস জানান, তাঁর গরু রয়েছে ২০টি। এর মধ্যে আটটি গাভি প্রতিদিন দুধ দিচ্ছে ৩০-৩২ লিটার। তাঁর গাভির দুধে ফ্যাটের পরিমাণ ৪ শতাংশ। বর্তমানে তিনি নির্দিষ্ট একটি কম্পানির কাছে প্রতি লিটার দুধ বিক্রি করছেন ৩২ টাকা ৪০ পয়সায়। চলতি বছরের শুরুতে এই দুধ বিক্রি করতেন ৩৬ টাকা ৯০ পয়সায়। তিন ধাপে দাম কমানোর ফলে প্রতিদিন তাঁর আয় কমে গেছে ১৩৫ টাকা। কিন্তু উচ্চমূল্যে নিয়মিত খৈল, ভূসি কিনে গরু পালন করতে হচ্ছে তাঁকে।

সঙ্গে ব্যাংক ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করতে হচ্ছে।

এমন অবস্থা কেবল খোকন বিশ্বাসের নয়, পুরো পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার খামারিদের।

যোগাযোগ করা হলে বেশ কজন খামারি টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে জানায়, বর্তমানে প্রতি কেজি খৈল কিনতে হয় ৪০ টাকায়। আর প্রতি কেজি ভূসি ৩৫ টাকায়। যাদের সাত থেকে আটটি গাভি রয়েছে, তাদের প্রতিদিন তিন কেজি খৈল ও তিন কেজি ভূসির প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া রয়েছে তাজা ঘাস। প্রতি কাঠা জমির ঘাস কিনতে খরচ হয় ৭০০-৮০০ টাকা। গাভি পালনে প্রতিদিনের খরচ, সংসারের খরচ এবং ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে স্বাভাবিক অবস্থায়ই চাপের মধ্যে থাকতে হয় খামারিদের। তার ওপর দফায় দফায় দুধের দাম কমানোয় বাড়তি চাপে পড়েছে তারা। আর কম্পানিগুলো দুধ নেওয়া কমিয়ে দিলে এই সমস্যা আরো প্রকট হয়ে ওঠে।

সিরাজগঞ্জের খামারি আমিনুল ইসলাম জানান, বর্তমানে গরুর খামার করতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় দুধের দাম স্থিতিশীল থাকলে লিটারপ্রতি দুই-তিন টাকা লাভ থাকত। কিন্তু বারবার দাম কমানোয় লাভের পরিবর্তে লোকসানে পড়ছেন তাঁরা। আবার কম্পানিগুলো দুধ না নিলে সেগুলো ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাবনা অঞ্চলে কর্মরত একটি কম্পানির একজন কর্মকর্তা জানান, কম্পানির সিদ্ধান্তই তাঁদের মানতে হয়। এখানে তাঁদের কিছু করার থাকে না। এ কথা ঠিক, যখন দুধের দাম কমানো হয় এবং দুধ নেওয়া হয় না তখন খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়ে।

দাম কমানোর কথা স্বীকার করে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা প্রাণ ডেইরির এজিএম শরীফ উদ্দীন তালুকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বছরের এই মময়টায় দুধের চাহিদা কিছুটা কম থাকে বলে সংগ্রহও কমে যায়। ফলে দাম কমিয়ে আনা হয়। আবার চাহিদা বাড়লে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অনেক সময় দাম বাড়িয়েও দুধ পাওয়া যায় না।’

পাস্তুরিত তরল দুধের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কম্পানিগুলো ২০০ মিলিলিটার পাস্তুরিত তরল দুধ বিক্রি করছে ২০ টাকায়। আর ৫০০ মিলিলিটার দুধ বিক্রি করছে ৩৫ এবং এক লিটার দুধ বিক্রি করছে ৬৫ টাকায়। একটি কম্পানি বিশেষ প্রক্রিয়ায় তরল দুধ বাজারজাত করছে। তাদের দুধ জাল না দিয়েই পান করা যায়। ওই কম্পানিটি প্রতি ২০০ মিলিলিটার দুধ বিক্রি করছে ২২ এবং ৫০০ মিলিলিটার ৪৫ টাকা। ওই কম্পানিটিই খামারি পর্যায়ে চলতি বছর তিন ধাপে প্রতি লিটার দুধের দাম কমিয়েছে সাড়ে চার টাকা। ট্যারিফ কমিশনের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি লিটার পাস্তুরিত তরল দুধ উৎপাদন করতে দেশের সবচেয়ে বড় কম্পানি মিল্ক ভিটার খরচ হয় ৫৩ টাকা ৬৬ পয়সা।

মিল্ক ভিটার কারণেই মূলত সিরাজগঞ্জ এবং পাবনা অঞ্চলে দুগ্ধ খামার জনপ্রিয় হয়েছে। মিল্ক ভিটার পথ ধরে বর্তমানে বেশ কটি প্রতিষ্ঠান তরল দুধ বাজারজাত করছে। দুধ বাজারজাতের জন্য প্রতিদিন প্রাণ ৪৫-৬০ হাজার লিটার, ব্র্যাক ১৫-২০ হাজার লিটার, আকিজ ১৫-২০ হাজার লিটার, অ্যামোমিল্ক ১০ হাজার লিটার, আফতাব ডেইরি, বিক্রমপুর, কোয়ালিটি মিল্ক ৫-১০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করে। এ ছাড়া মিষ্টান্ন তৈরি করতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও নিয়মিত দুধ সংগ্রহ করেন।

 


মন্তব্য