kalerkantho

হলো না!

১৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



হলো না!

অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছে সব। আরেকবার স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় বিলীন বাংলাদেশ। ছবি : মীর ফরিদ

কিছু স্মৃতি হারিয়ে যায় না। বারবার ফিরে ফিরে আসে। শ্বাপদের মতো দাঁত নখ বের করে। প্রেতের মত অশরীরী হয়ে। বছর দুই আগে, বেঙ্গালুরুতে এমনই এক মার্চ মাসের রাতটা ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের সেই দুঃস্বপ্নের নাম। ভারতের উদ্যান নগরীর সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সম্পর্কটা এতই মনোবেদনার যে ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের একমাত্র টেস্টের ভেন্যু হিসেবে বেঙ্গালুরুর নাম প্রস্তাব করা হলেও বিসিবি সেটা বাতিল করে দেয়। বছর দুই আগের সেই রাতটাকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য যখন দুঃস্বপ্নটাকে মাটিচাপা দিয়ে এনেছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা, ঠিক তখনই অভিশপ্ত পিশাচের মতো জেগে উঠল সেই অশরীরী। এবার আরো ভয়াল রূপ নিয়ে।

বেঙ্গালুরুতে তা-ও তিনটে বলের ব্যাপার ছিল। কলম্বোতে হারজিতের ব্যবধান নিষপত্তি হতে দরকার ছিল মাত্র ১ বল। সৌম্য সরকারের করা নিদাহাস ট্রফির শেষ বলটাতে জিততে হলে ভারতের প্রয়োজন ৫ রানের হলেও দরকার ছিল একটি ছক্কাই। ক্রিকেটের আইনে একটি বৈধ বলে সর্বোচ্চ যত রান নেওয়া সম্ভব। সৌম্য বলটা নো-বল বাঁচিয়ে, দুই পা দৌড়ে ছোট্ট রান আপে একটা শর্ট বলও করতে পারতেন, যাতে ব্যাটসম্যানকে অনেক দূর এসে পেতে হত বলের নাগাল। অর্থাৎ একটা ছয়ের মার এড়াতে সম্ভাব্য সব কিছুই তিনি করতে পারতেন। কিন্তু করলেন সেটাই, যাতে ফের মাথাচাড়া দেয় সেই অতীতের ভূত। সৌম্যর নির্বিষ মিডিয়াম পেসে অফ স্টাম্পের অনেক বাইরে হাফভলি লেন্থে করা বলটায় দেহের সব জোর চাপিয়ে দিয়ে মেরেছেন দীনেশ কার্তিক। খুব বেশি না উড়ে কাভার অঞ্চল দিয়ে উড়ে সীমানা দড়ির একটু ওপাশে গিয়েই মাটিতে চুমু খেল বলটা। ততক্ষণে সর্বনাশ যা হওয়ার, হয়ে গিয়েছে। হাঁটু গেড়ে কাঁদছেন সৌম্য, বিহ্বল চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। এই প্রথম রবি শাস্ত্রীকে উল্লাসে চেয়ার ছেড়ে উঠে মাঠে আসতে দেখা গেল, ভারতীয় দলের সবাই ঢুকে পড়েছে মাঠে। আর লাল-সবুজ সৈনিকরা তখন দ্বিতীয়বার বজ্রাহত হয়ে স্তব্ধ।

অথচ ভারতের ইনিংসের ১৮তম ওভারটা শেষ হওয়ার পরও তো মনে হচ্ছিল, কাটছে ফাইনালের খরা। ১৮তম ওভারটা মুস্তাফিজুর রহমান করেছিলেন তাঁর হৃদয় দিয়ে। প্রথম চারটা বল ব্যাটেই ছোঁয়াতে পারেননি বিজয় শঙ্কর। পঞ্চম বলে কোনো রকমে প্যাডে লাগিয়ে লেগবাই, পরের বলে মনীষ পাণ্ডে আউট হয়ে যান সাব্বির রহমানের হাতে ক্যাচ দিয়ে। ১৮ বলে ৩৫ রানের সমীকরণকে নামিয়ে আনেন ১২ বলে ৩৪ রানে। পরের ওভারটা সাকিব বল তুলে দেন রুবেল হোসেনের হাতে। দুঃস্বপ্নের শুরু এখানেই। মাত্রই ব্যাট করতে আসা দীনেশ কার্তিক প্রথম তিন বলে তুললেন ছয়, চার, ছয়। একটা বল ডট, তারপর দুই এবং চার রান। তবু তো শেষ ওভারে ১২ রানের অঙ্ক মেলানো চাই ভারতের।

সৌম্য প্রথম বলটাই দিলেন ওয়াইড, এরপর দুটো সিঙ্গেল এলো। চতুর্থ বলে বিজয় শঙ্কর থার্ড ম্যান দিয়ে মেরে দিলেন চার। তখনো দুই বলে চাই ৫ রান। পঞ্চম বলটায় লংঅনে শঙ্করের ক্যাচ নিতে ছোটা দুইজনের ঠোকাঠুকিতে ক্যাচ প্রায় ফসকে যাওয়ার মতো অবস্থা থেকে সেটি ধরেই ভোঁ দৌড় মেহেদীর। এই ফাঁকে প্রান্ত বদল করে শেষ বলে স্ট্রাইকে কার্তিক। সাকিব ফিল্ডিং ছড়িয়ে দিলেন, নিদাহাস ট্রফি ও বাংলাদেশের মাঝে তখন স্রেফ একটা বল। কিন্তু এবারও যে শেষ বলের ট্র্যাজেডিই জুটল কপালে!

ফাইনালে টসটা হারলেন সাকিব আল হাসান। জয়ী দল ফিল্ডিং নেবে, এটাই জানা কথা। রোহিত শর্মা তাই করলেন। ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন আপকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে বড় সংগ্রহই দরকার ছিল বাংলাদেশের, যার জন্য চাই দারুণ একটা শুরু। কিন্তু হতাশ করেছেন সাব্বির রহমান বাদে ওপরের দিকের সব ব্যাটসম্যানই। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে রানতাড়ায় তামিম ইকবালের সঙ্গে জুটি বেঁধে ইনিংসের গোড়া পত্তনে নেমে ভালো করার পর থেকে লিটন দাশই আসছেন শুরুতে। কিন্তু সেই ইনিংসের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়নি আর একবারও। জয়দেব উনাদকাটের বলে ছক্কা মেরে একটা আভাস দিলেও ওয়াশিংটন সুন্দরের ওভারের দ্বিতীয় বলেই ক্যাচ তুলে দিয়ে আউট হয়েছেন ১১ রানে।

তামিম বরং নিজেকে দুর্ভাগা ভাবতে পারেন। যুজবেন্দ্র চাহালের বলে ডাউন দ্য উইকেটে এসে তুলে মারলেও ধরা পড়ে যান লংঅন বাউন্ডারিতে। প্রায় ছক্কা হতে যাওয়া বলটাকে ক্যাচ বানিয়ে দারুণ দক্ষতায় ধরে ভারসাম্য রেখেছেন শার্দূল ঠাকুর। ওই ওভারেই, তিন বল পর সুইপ খেলতে গিয়ে সৌম্য সরকার ক্যাচ দিয়ে বসেন স্কয়ার লেগে। ৫ ওভারের ভেতরই ৩ উইকেটের পতন, বড় সংগ্রহের আশা তখন সুদূরপরাহত। গোটা টুর্নামেন্টে ভালো ব্যাটিং করা মুশফিকুর রহিমও কাল ফিরে গেছেন যুজবেন্দ্র চাহালের গুগলি বুঝতে না পেরে। ডাউন দ্য উইকেটে এসে বল জায়গামতো না পেয়ে বলটা স্লাইস করার চেষ্টা করেছিলেন, বল লাগল ব্যাটের ডগায়। দৌড়ে এসে সুন্দর ডাইভ দিয়ে বলটা ধরেন বিজয় শঙ্কর। মুশফিকের রান তখন ৯। ততক্ষণে অবশ্য সাব্বির রহমানের সঙ্গে ৩৫ রানের ছোট্ট একটা জুটি হয়ে গেছে তাঁর। মুশফিকের বিদায়ে আসা মাহমুদ উল্লাহর সঙ্গেই সাব্বিরের জুটিটা ৩৬ রানের আর সাকিবের সঙ্গে ২৯ রান। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, একটা বড় জুটি গড়তে না পারলেও তিনটা ছোট ছোট জুটি গড়েছিলেন সাব্বির, ফাইনালে তাঁর ৫০ বলে ৭৭ রানের ইনিংসে।

অকুণ্ঠ প্রশংসাই তিনি পেতেন এই ইনিংসটার জন্য, যদি না রান আউট করিয়ে দিতেন মাহমুদ উল্লাহ ও সাকিব আল হাসানকে। আগের ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় মাহমুদ উল্লাহ কালও ছিলেন ছন্দে। সিঙ্গেলস আর সময়ে সময়ে বাউন্ডারির হিসাবেই তিনি খেলছিলেন, মাত্র ১৬ বলে ২১ রানের ইনিংসটার ইতি সাব্বিরের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝিতে। স্লোয়ার বলটা লেগেছিল মাহমুদের প্যাডে, সাব্বির দ্রুত এক রান নেওয়ার জন্য বোলিং এন্ড থেকে বেরিয়ে চলে এলেন মাহমুদের প্রান্তে। দুই ব্যাটসম্যান একই প্রান্তে চলে আসার পর ৪২ রানে অপরাজিত থাকা সাব্বিরকে বাঁচাতেই যেন আত্মাহুতি দিলেন মাহমুদ। সাব্বিরের সঙ্গে সিঙ্গেল নিতে গিয়ে রান আউট হয়েছেন সাকিবও। দলের সেরা অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ককে রান আউট করিয়ে দেওয়া সাব্বির অবশ্য খেলেছেন নিজের ক্যারিয়ার বাঁচানো ইনিংস। অনেকের চোখেই টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান কাল ২১ ইনিংস পর পেয়েছেন হাফসেঞ্চুরির দেখা। ৫০ বলে ৭ বাউন্ডারি আর ৪ ছক্কায় সাজানো ৭৭ রানের ইনিংসটায় বাংলাদেশ এগিয়ে যায় সম্মানজনক সংগ্রহের দিকে। শেষ ওভারে মেহেদী হাসান মিরাজ ১৮ রান নিলে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৮ উইকেটে ১৬৬ রানে। ৩ উইকেট নেন যুজবেন্দ্র চাহাল, জোড়া শিকার জয়দেব উনাদকাটের।

১৬৭ রান তাড়ায় রোহিত শর্মার ৪২ বলে ৫৬ রানের ইনিংসের পরও মাঝের ওভারগুলোয় বাংলাদেশি বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে চাপের মুখে পড়ে ভারত। সুরেশ রায়নার ব্যাটে লেগে যাওয়া বল মুশফিকের গ্লাভসে গেলেও আম্পায়ার দেন ওয়াইডের সংকেত। পরে রিভিউতে রায় আসে বাংলাদেশের পক্ষে। লোকেশ রাহুল, মনীষ পাণ্ডেরা শুধু তাল মিলিয়ে গেছেন, তবে মূল ধ্বংসলীলাটা চালিয়েছেন দীনেশ কার্তিক। মাত্র ৮টা বল খেলেছেন, প্রথম বলেই মেরেছেন ছক্কা। শেষ বলে ছয়ের মারটাও তাঁর ব্যাট থেকেই আসা। ৮ বলের ছোট্ট টর্নেডোয় তিনটা ছক্কা আর দুটো চারের মারে ২৯ রান। শেষ সময়ের এই বিস্ফোরণেই নিদাহাস ট্রফিটা জেতা হলো না বাংলাদেশের। এই নিয়ে পঞ্চমবারের মতো কোনো বহুজাতীয় আসরের ফাইনালে উঠে হারল বাংলাদেশ। আরো একবার শিরোপার খুব কাছে গিয়েও হলো না জয়োল্লাসে মেতে ওঠা, ওড়ানো হলো না বিজয় নিশান।

 



মন্তব্য