kalerkantho


নেপালে ১৭ বাংলাদেশির লাশ শনাক্ত, বাকিদের চেনা দায়

নাম শুনে স্বজনদের অঝোরে কান্না

১৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



নেপালে ১৭ বাংলাদেশির লাশ শনাক্ত, বাকিদের চেনা দায়

ফাইল ছবি

সকাল থেকেই শোকাহত স্বজনরা বিমর্ষ মনে অপেক্ষা করছে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশ দেখার জন্য। রাতে যৌথ কর্তৃপক্ষ জানায়, ৪৯ লাশের মধ্যে এ পর্যন্ত ২৮ জনের পরিচয়, তথ্য-উপাত্ত মিলিয়ে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ জন বাংলাদেশের। এরপর একে একে নাম ঘোষণা হচ্ছিল আর কান্নায় ভেঙে পড়ছিল স্বজনরা। বেদনা প্রকাশের এ দৃশ্য ছিল অসহনীয়।

গতকাল শনিবার নেপালে সাপ্তাহিক ছুটির দিনের সকালেও সরব হয়ে ওঠে কাঠমাণ্ডুর মহারাজগঞ্জের ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটি টিচিং মেডিক্যাল ক্যাম্পাসের মর্গ প্রাঙ্গণ। বাংলাদেশ ও নেপালের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা প্রথমবারের মতো লাশ শনাক্তকরণের কার্যক্রম শুরু করেন। এতে নেতৃত্ব দেন নেপালের ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটি টিচিং মেডিক্যালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. প্রমোদ শ্রেষ্ঠ। খবর পেয়ে দুই দেশের নিহতদের স্বজনরা এবং মিডিয়াকর্মীরাও ছুটে এসেছিলেন সকালেই। দুপুর ১২টার দিকে স্বজনদের জানানো হয়, আপাতত তাদের দেওয়া তথ্য লাশের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ কাজ শেষ হলে স্বজনদের ডেকে লাশ দেখানো হবে। স্বজনরাও ছয় দিনের মাথায় লাশ দেখতে পাওয়ার আশা বুকে নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। বিকেলের দিকে অনেকটা ধৈর্য হারিয়ে নেপালের স্বজনরা অবিলম্বে লাশ দেখানো ও শনাক্ত করার দাবিতে তাৎক্ষণিক ব্যানার লিখিয়ে এনে দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়।

পরে রাতে যৌথ কর্তৃপক্ষ ব্রিফ করে জানায়, ৪৯ লাশের মধ্যে এ পর্যন্ত ২৮ লাশের তথ্য-উপাত্ত মিলিয়ে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ জন বাংলাদেশের, ১০ জন নেপাল এবং একজন চীনের নাগরিক।

আগে নেপালিদের নাম ঘোষণা করেন ডা. প্রমোদ শ্রেষ্ঠ নেপালি ভাষায়। এরপর বাংলাদেশের ফরেনসিক টিমের সদস্য ডা. সোহেল মাহমুদ শনাক্তকৃৎত বাংলাদেশির নাম ঘোষণা করেন। নাম ঘোষণার সময় দুই দেশের স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। পরে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও শনাক্ত হওয়া ১৭ বাংলাদেশির তালিকা প্রকাশ করা হয়।

তাঁরা হলেন বিলকিস আরা, রকিবুল হাসান, হাসান ইমাম, মিনহাজ ইবনে নাসির, মতিউর রহমান, তাহিরা তানভিন শশী রেজা, অনিরুদ্ধ জামান, রফিকুজ্জামান, মাহমুদুর রহমান, তামাররা প্রিয়ন্ময়ী, আকতারা বেগম, সানজিদা হক, নুরুজ্জামান, ফয়সাল আহম্মেদ, পাইলট আবিদ সুলতান, কো-পাইলট পৃথুলা রশিদ ও ক্রু খাজা হোসেন।

নাম ঘোষণা করা হয়ে গেলে ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, শনাক্তকৃত নেপালিদের লাশ আগে হস্তান্তর করা হবে। তারপর বাংলাদেশের স্বজনদের লাশ দেখানো হবে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসফি বিনতে শামস কালের কণ্ঠকে বলেন, শনাক্তকৃত লাশগুলো স্বজনদের দেখানোর পরই ঢাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। বাকি লাশ শনাক্ত করার কাজও এগিয়ে চলবে।

কর্তৃপক্ষ জানায়, শনিবার রাতে প্রথমে নেপালিদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর রাতেই বাংলাদেশিদের লাশ দেখানো হবে স্বজনদের। নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে যাঁরা মুসলমান তাঁদের মরদেহ কাল গোসল করিয়ে কফিনে রাখা হবে। তারপর বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

এদিকে গতকাল কাঠমাণ্ডু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে আহত রাশেদ রুবায়েতকে। এ ছাড়া একই হাসপাতালে থাকা ইমরানা কবীর হাসিকে জরুরি ভিত্তিতে সিঙ্গাপুর এবং নরভিক হাসপাতালে থাকা ইয়াকুব আলীকে ভারতের দিল্লিতে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গতরাতেই তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে দিল্লিতে নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইউএস-বাংলা বিমান কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া কেএমসিতে থাকা বাকি দুই বাংলাদেশি যাত্রী শাহীন ব্যাপারি ও কবির হোসেনকে আজ-কালের মধ্যেই ঢাকায় পাঠানো হবে বলে জানান রাষ্ট্রদূত মাসফি বিনতে শামস।

বাংলাদেশ থেকে আসা মেডিক্যাল টিমের বার্ন বিশেষজ্ঞ ডা. হুসাইন ইমাম ইমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ইমরানা কবীরের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। আজ-কালের মধ্যে তাঁর শরীরে অপারেশন করতে হবে, যেটা এখানে বা বাংলাদেশেও সম্ভব ছিল। কিন্তু রোগীর বাবার চাহিদা অনুসারে তাঁকে সিঙ্গাপুর রেফার করা হয়েছে। একইভাবে ইয়াকুবকেও ভারতে রেফার করা হয়।

এদিকে গতকাল বাংলাদেশের ১৭ জনের লাশ শনাক্ত করার পর এখন আরো ৯ লাশ শনাক্ত বাকি রয়েছে। তাঁরা হলেন আলিফুজ্জামান, বেগম হারুন নাহার, নাজিয়া আফরিন, নজরুল ইসলাম, আঁখি মনি, এফ এইচ প্রিয়ক, পিয়াস রায়, উম্মে সালমা ও শারমিন আক্তার।

এ বিষয়ে ডা. সোহেল মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, শনাক্ত করতে না পারা লাশগুলোর মধ্যে কিছু পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে, কিছু বিকৃত। চেনার উপায় নেই বলে ডিএনএ টেস্ট করে শনাক্ত করতে হবে।


মন্তব্য