kalerkantho


খালেদা জিয়ার জামিন রবিবার পর্যন্ত স্থগিত

► দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষকে লিভ টু আপিলের নির্দেশ
► খালেদার আইনজীবীদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



খালেদা জিয়ার জামিন রবিবার পর্যন্ত স্থগিত

ফাইল ছবি

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। চার মাসের জামিন আদেশ আগামী রবিবার পর্যন্ত স্থগিত করে ওই সময়ের মধ্যে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষকে লিভ টু আপিল করতে বলেছেন সর্বোচ্চ আদালত।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ গতকাল বুধবার এ আদেশ দেন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা এবং খালেদা জিয়ার পক্ষে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলী, জয়নুল আবেদীন, আবদুর রেজাক খান, ব্যারিস্টার আমিনুল হক, মীর নাছির উদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন, ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমুখ আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।

আপিল বিভাগের আদেশের পর গতকাল দুপুরেই খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার চেয়ে চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন করেছেন। এ আবেদনটির ওপর আগামী রবিবার আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

এদিকে শুধু দুদকের আইনজীবীর বক্তব্য শুনে স্থগিতাদেশ দেওয়ায় খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আদালতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তাঁরা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে তাঁদের বক্তব্য শুনে আদেশ দেওয়ার জন্য উচ্চৈঃস্বরে আদালতের কাছে দাবি জানাতে থাকেন। আদালতের উদ্দেশে তাঁরা চিৎকার করে বলেন, শুধু দুদকের বক্তব্য শুনে একতরফাভাবে আদেশ দিতে পারেন না। এই পরিস্থিতির একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনারা কী আদালতকে হুমকি দিচ্ছেন? আদালত জনগণের ধারণার দিকে তাকায় না।

আদালতের স্থগিতাদেশের পর দুদক আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, আদালতের আদেশে আমরা খুশি। হাইকোর্টের আদেশ পেলে বৃহস্পতিবার (আজ) লিভ টু আপিল আবেদন দাখিল করা হবে।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালতকে বলেছিলাম একতরফাভাবে শুনে আদেশ দিলে জনগণের ধারণা খারাপ হবে। এর পরও আদালত শুধু দুদকের বক্তব্য শুনে আদেশ দিলেন। আমাদের বক্তব্য শুনলেন না। এটা বিচার বিভাগের জন্য নজিরবিহীন। এতে আমরা ব্যথিত।’

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, আশা করি আজকের (বুধবার) মধ্যেই আদেশের সার্টিফায়েড কপি পেয়ে যাব এবং আগামীকালের মধ্যে লিভ টু আপিল আবেদন দাখিল করব। তিনি বলেন, মূল আদেশটি ছাড়া উভয় পক্ষের যুক্ততর্ক শুনলে কোনো লাভ হবে না। এ কারণে আদালত এ আদেশ দিয়েছেন।

আদালতে যা ঘটেছে

গতকাল সকাল ৯টা ৩ মিনিটে প্রধান বিচারপতিসহ চার বিচারপতি এজলাসে বসলে জামিন স্থগিত চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয়। দুদক আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, হাইকোর্ট চারটি যুক্তিতে চার মাসের জামিন দিয়েছেন। আমরা হাইকোর্টের আদেশের সার্টিফায়েড কপি পাইনি।

এ সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী হাইকোর্টের আদেশের কপি বিচারপতি ও দুদকের আইনজীবীকে সরবরাহ করেন।

দুদক আইনজীবী বলেন, সাজা কম হওয়ার কারণ দেখিয়ে এবং বয়স্ক নারী হিসেবে জামিন দেওয়া হয়েছে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, আগে সিপি (নিয়মিত লিভ টু আপিল) দাখিল করে আসুন।

দুদক আইনজীবী বলেন, সার্টিফায়েড কপি পাইনি। আদেশের কপি পেলে সিপি দাখিল করব। এ সময় পাশে বসা অ্যাটর্নি জেনারেল দুদকের আইনজীবীকে রবিবার পর্যন্ত স্থগিতাদেশ চাওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর দুদক আইনজীবী বলেন, রবিবার বা সোমবার পর্যন্ত স্থগিতাদেশ চাচ্ছি। এ সময়ের মধ্যে সিপি দাখিল করব।

এরপর প্রধান বিচারপতি রবিবার পর্যন্ত জামিন স্থগিত করে আদেশ দেন।

এই আদেশ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমাদের বক্তব্য আছে। আমাদের বক্তব্য শুনতে হবে। শুধু দুদকের বক্তব্য শুনে আদেশ দেওয়া ঠিক হবে না।’ তিনি তাঁদের বক্তব্য শোনার জন্য চাপাচাপি করতে থাকেন। এ সময় খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলীও বলেন, ‘আমাদের বক্তব্য না শুনে আদেশ দেওয়া ঠিক হচ্ছে না।’ এ সময় বিএনপিপন্থী বেশ কয়েকজন আইনজীবী দাঁড়িয়ে যান।

এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি সবাইকে বসতে বলেন। তিনি বলেন, ‘এটা তো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ। রবিবার সিপি শুনব। এই মুহূর্তে আপনাদের বক্তব্য শোনার প্রয়োজন নেই। আদালতকে আদালতের মতো কাজ করতে দিন।’

এরপর আইনজীবীরা আদালত কক্ষ থেকে বের হতে থাকেন। আদালতের কার্যতালিকায় তিন নম্বরে থাকা মামলার শুনানি শুরু হয়। অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমেদ রাজা শুনানি করতে থাকেন। তখনো খন্দকার মাহবুব হোসেন, মওদুদ আহমদ, এ জে মোহাম্মদ আলী, জয়নুল আবেদীন, মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ খালেদা জিয়ার বেশ কয়েকজন আইনজীবী দাঁড়িয়ে ছিলেন। এটা দেখে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনারা দাঁড়িয়ে কেন? বসুন।’

এ পর্যায়ে অ্যাডভোকেট গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘আপনি আমাদের কথা না শুনে আদেশ দিলেন। আমাদের কথা শুনুন।’ তিনি উচ্চৈঃস্বরে বারবার একই কথা বলতে থাকেন। আদালতের স্থগিতাদেশের বিষয়ে আপত্তি জানাতে থাকেন। এ পরিস্থিতিতে তিন নম্বর মামলার শুনানি বন্ধ হয়ে যায়।

তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, কার কথা শুনব আর কার কথা শুনব না তা কি আপনাকে বলতে হবে? এর পরও গিয়াস উদ্দিন উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে থাকেন। জয়নুল আবেদীন তাঁর সঙ্গে যোগ দেন।

বিক্ষোভ মিছিল

আদালত থেকে বেরিয়ে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ মিছিল করেন। তাঁরা প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ দাবি করেন। অ্যাডভোকেট আবেদ রাজা, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, কায়সার কামাল, সগীর হোসেন লিয়নসহ অর্ধশতাধিক আইনজীবী ওই মিছিলে অংশ নেন।

কুমিল্লার আদালতে খালেদা জিয়াকে ২৮ মার্চ হাজির হওয়ার নির্দেশ বহাল কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জগমোহনপুর এলাকায় যাত্রীবাহী নৈশকোচে পেট্রলবোমা হামলায় আটজনকে হত্যার মামলায় কুমিল্লার আদালতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁকে আদালতে উপস্থাপনের জন্য জারি করা প্রজেকশন ওয়ারেন্ট প্রত্যাহার ও জামিন আবেদনের শুনানি ২৮ মার্চ নির্ধারণ করেছেন আদালত। ওই দিন খালেদা জিয়াকে কুমিল্লার আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কুমিল্লার ৫ নম্বর আমলি আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক মো. মুস্তাইন বিল্লা গতকাল এ আদেশ দেন বলে খালেদা জিয়ার আইনজীবী কাইমুল হক রিংকু জানান।

 

 

 



মন্তব্য