kalerkantho


হঠাৎ তাঁরা হারিয়ে গেলেন

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



হঠাৎ তাঁরা হারিয়ে গেলেন

ছবি : কালের কণ্ঠ

পৃথুলা রশিদ ছিলেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের প্রথম নারী ক্যাপ্টেন। ফেসবুকে তাঁর শেষ স্ট্যাটাস ছিল ‘খোদা হাফেজ’, সম্প্রতি লিখেছিলেন ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবার বুলে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে বাংলাদেশে আসার সময়। গতকাল সোমবার তিনি সত্যি সত্যিই বিদায় নিলেন। ‘টু সেভ দ্য প্যাসেঞ্জারস দ্য ফার্স্ট পাইলট ওয়াজ ইন দ্য লিস্ট। রেস্ট ইন পিস ফার্স্ট অফিসার পাইলট।’ নিহত পাইলট পৃথুলা রশীদের একটি ছবি ফেসবুকে দিয়ে এভাবেই স্ট্যাটাস দেন ইকফা নিশিতা নামের একজন।

শুচিস্মিতা সীমন্তি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, এত বড় দুঃসংবাদ তাঁকে শুনতে হবে। বন্ধুর পোস্ট থেকে সীমন্তি প্রথম পৃথুলার মৃত্যুর খবর পান। একসময়ের সহপাঠীর ছবি ফেসবুকে দিয়ে সীমন্তি লেখেন, ‘উই ইউজড টু গো ফর সেইম টিউশনস। আই অলওয়েজ অ্যাডমায়ারড হার ফর বিয়িং পাইলট। আই ক্যান্ট বিলিভ দিস। রেস্ট ইন পিস।’ সীমন্তি নেদারল্যান্ডসে মাস্টার্স করছেন। যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পৃথুলার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই কথা হতো ফেসবুকে। তার সঙ্গে গণিত ক্লাস করতাম। পরে যখন পাইলট হলো, এ নিয়ে অনেক দুষ্টুমি করতাম।’

দুর্ঘটনার খবরের সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে ভাইরাল হচ্ছিল যাত্রীদের ছবিও। এমনই একটি ছবিতে দেখা যায়, আলোকচিত্রী ফারুক হোসেন প্রিয়ক স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন অতিক্রম করছেন। প্রিয়কের স্ত্রী এ্যানি ছবিটি ফেসবুকে দিয়ে লেখেন, ‘রেডি টু ফ্লাই কাঠমাণ্ডু ফ্রম হযরত শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। প্লিজ কিপ আস অন ইওর প্রেয়ার।’ কে জানত, দুপুর গড়াতে গড়াতে সত্যিই পরিবারটির জন্য, তাদের সব সহযাত্রীর জন্য প্রার্থনা করা হবে দেশজুড়ে!

“সকালে বিমানবন্দর থেকে Annie Priok চেকইন দিল নেপাল যাচ্ছি...অন্য দিনের মতো ফান করলাম, ‘ভাই, সম্পত্তি না দিয়ে বউ-বাচ্চা নিয়ে চলে যাচ্ছে।’ FH Priok ভাই আমার যথারীতি বোনের কমেন্টে লাভ রি-অ্যাকশন দিয়ে লিখল, ‘দোয়াপ্রার্থী।’ এর পর থেকে আর কোনো খোঁজ নাই...বিধ্বস্ত বিমানের যাত্রী তালিকায় আমার খুব আদরের স্নেহের প্রিয়ক এবং ওর বাচ্চা প্রিয়ন্ময়ীর নাম পেলাম। প্রিয়ক ভাই, তোমরা ফিরে আসো। তোমার আম্মা বড্ড একা মানুষ। উনি অপেক্ষা করছেন তোমাদের জন্য। আমরা সবাই অপেক্ষা করছি তোমাদের সুস্থতার সংবাদের জন্য।” ফেসবুকে কথাগুলো লেখেন আলোকচিত্রী এফ এইচ প্রিয়কের (ফারুক হোসেন প্রিয়ক) একজন স্বজন। পরে নিশ্চিত হওয়া যায়, সত্যিই পরিবারটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাওয়া খবর অনুযায়ী, শিশু প্রিয়ন্ময়ী আর নেই। চিকিৎসাধীন আছেন প্রিয়ক ও এ্যানি।

বসুন্ধরা গ্রুপের আইটি বিভাগের প্রজেক্ট ম্যানেজার সিফাত জাহান নুরের চাচাতো বোন তাহিরা শশী ও চাচাতো ভাই রেজওয়ানুল হক শাওন এই বিমানেরই যাত্রী ছিলেন। বিমান ছাড়ার মুহূর্তে দুজনকে ফেসবুকে অনলাইনে দেখা যায়। পরে দুর্ঘটনার পর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সিফাত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি অফিস থেকে বারবার বাসায় যোগাযোগ করছিলেন। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার রেজওয়ানুল হক শাওন। সিফাত জাহান নুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের এক আত্মীয় শাওন ও শশীর খোঁজ নিতে কাঠমাণ্ডু যাচ্ছি। আমরা অনিশ্চিত এক অবস্থায় আছি।’

গণজাগরণ মঞ্চের একাংশের মুখপাত্র কামাল পাশা চৌধুরী ফেসবুকে লেখেন, ‘রফিক জামান রিমু। ৯১-এর গণ-আদালত সংগঠিত করার সময় ও পরে যুদ্ধাপরাধের বিচারের আন্দোলনে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রকমান্ডের এক দুঃসাহসী যোদ্ধা হিসেবে দিন-রাত কাজ করেছেন। ইউএস-বাংলা বিমানে স্ত্রী ও শিশুসন্তানসহ যাত্রী ছিলেন। (উদ্ধারকৃত ও আহতদের কোনো তালিকায়ই তাদের নাম নেই) তাদের জন্য প্রার্থনা ছাড়া কিছু আর করার নেই।’

নেপালের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) আয়োজিত দুই দিনের সেমিনারে যোগ দিতে ইউএস-বাংলার ফ্লাইটে চড়েছিলেন দুই বিসিএস ক্যাডার নাজিয়া আফরিন চৌধুরী ও উম্মে সালমা। দুজনই কর্মরত পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগে (জিইডি)। এই প্রতিবেদন লেখার সময়ও এই দুই সরকারি কর্মকর্তার কোনো খোঁজ মেলেনি। জিইডি সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, ‘বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর এতটা সময় পেরিয়ে গেল, আমরা নেপাল দূতাবাস, হটলাইনে দফায় দফায় যোগাযোগ করেও কোনো তথ্য পাচ্ছি না।’ সন্ধ্যায় রাজধানীর সোবহানবাগে নাজিয়া আফরিন চৌধুরীর বাসায় গেলে নাজিয়ার স্বামী ব্যবসায়ী মনিরুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তার কোনো খবর জানি না। দোয়া করবেন তার জন্য।’ উম্মে সালমার আড়াই বছরের এক ছেলেসন্তান রয়েছে। গতকাল সকালেও অফিসে আসার সময় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আসেন উম্মে সালমা। এরপর ছেলেকে একটি ডে কেয়ার সেন্টারে রেখে বিমানে ওঠেন। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর উম্মে সালমার স্বামী মাসুদ উদ্দিন ভুঁইয়া ছেলেকে ডে কেয়ার সেন্টার থেকে বাসায় নিয়ে যান।

সানজিদা হক বিপাশা ছিলেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) অ্যাসোসিয়েট কো-অর্ডিনেটর (যুগ্ম সমন্বয়কারী)। তাঁর স্বামী রফিক জামান রিমু প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও কল্যাণে কাজ করেন। একটু সময় বের করে সাত বছরের ছেলে অনিরুদ্ধ জামানকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন নেপালে। রবিবার বিকেলে বিপাশা বিদায় নেওয়ার সময়ও সহকর্মীদের বলেছিলেন, ‘আমার যেতে খারাপ লাগছে!’ গতকাল সন্ধ্যায় সুজনের কার্যালয়ে গেলে সহকর্মী খুরশিদা লীন বলেন, ‘মাত্র পাঁচ দিনের জন্য যাচ্ছিলেন। অথচ এমনভাবে বললেন...।’ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মোহাম্মদপুরে সুজনের অফিসে গিয়ে বিপাশার কয়েকজন সহকর্মীকে কাঁদতে দেখা যায়। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারও বিমান দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন জায়গায় টেলিফোনে খবর নেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আশাব্যঞ্জক কোনো খবর পাওয়া যায়নি। খুব অসহায় লাগছে। বিপাশা ছিলেন সুজনের মধ্যমণি।’



মন্তব্য