kalerkantho


আবদুর রাজ্জাক ছাত্রদের খুঁজে এনে প্রশিক্ষণে পাঠাতেন

সৈয়দ কবিরুল আলম মাও

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আবদুর রাজ্জাক ছাত্রদের খুঁজে এনে প্রশিক্ষণে পাঠাতেন

২১ এপ্রিল ফরিদপুর শহরে পাকিস্তানি সেনারা প্রবেশের পরই আমরা শহর ছেড়ে গেঁদে সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করি। কলকাতায় তখন আমাদের একমাত্র পরিচিত মানুষ দুলাল রায়। দুলাল রায় বঙ্গবাসী কলেজের ছাত্র এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ছাত্রসংগঠন ‘ছাত্র পরিষদে’র নেতা। ২২ এপ্রিল বিকেলে বঙ্গবাসী কলেজে যাই। কলেজেই দুলালকে পেয়ে যাই। তিনি আমাদের কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যান, থাকার ব্যবস্থা করেন।

বঙ্গবাসী কলেজের ছাত্রাবাসেই দিন দশেক কেটে যায়। খবর পেলাম, কলকাতার থিয়েটার রোডে আমাদের মন্ত্রী-এমপি ও রাজনৈতিক নেতারা এসে উঠেছেন। শাহ জাফরকে নিয়ে থিয়েটার রোডে গেলাম। দেখা হলো রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী (পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতির সচিব) ও ক্যাপ্টেন খুরশিদের সঙ্গে। ত্রিবেদীদার কাছ থেকে জানতে পারলাম, থিয়েটার রোডেই প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের অফিস।

ত্রিবেদীদা লেখক ও সমাজকর্মী মৈত্রেয়ী দেবীর ঠিকানা দিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন। মৈত্রেয়ী দেবী শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করছিলেন। তাঁর সঙ্গে কাজে লেগে গেলাম। একদিন দেখা হলো এমএনএ ব্যারিস্টার কামরুল ইসলাম সালাউদ্দিনের সঙ্গে, তিনি তো তাজউদ্দীন আহমদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে বললেন, চলো দেশে ফিরে যাই।

খবর পেলাম, কে এম ওবায়দুর রহমান কলকাতায় এসেছেন। তিনি আছেন মহাত্মা গান্ধী রোডে শ্রীনিকেতন হোটেলে। শ্রীনিকেতন হোটেলে ওবায়দুর রহমানের সঙ্গে দেখলাম বর্তমান লন্ডন আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান শরীফ ও ছাত্রলীগ নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী আছেন। আমিও হোটেলের একটি কক্ষে থাকা শুরু করলাম। মাঝেমধ্যে ফণী ভূষণ মজুমদার আসতেন এখানে। ফণীদার সুবাদে এখানে থাকার ব্যবস্থা হলো। ওবায়দুর রহমান টাকা-পয়সা দেন, সে টাকায় আমরা চলি। ফণীদাও মাঝেমধ্যে কিছু দেন।

একদিন শ্রীনিকেতন হোটেলে এসে আমাকে খুঁজে বের করলেন আবু জাফর মিয়া (বড় জাফর)। খবর দিলেন, আবদুর রাজ্জাক আমাকে খুঁজছেন, জরুরিভাবে। পরে জেনেছি, আবু জাফর মিয়ার মাধ্যমে রাজ্জাক ছাত্র কর্মীদের খুঁজে বের করতেন। তিন দিন পর দুপুরে রাজ্জাক ভাই থাকবেন রাজেন্দ্র পার্কে।

দুপুর ১২টার দিকে রাজেন্দ্র পার্কে গিয়ে দেখি রাজ্জাক ভাই একটি বেঞ্চে বসে আছেন। শাহ মোহাম্মাদ আবু জাফর এলেন। আবদুর রাজ্জাক সরাসরি বললেন, ‘তোমরা নেতা। দেশে যুদ্ধ চলছে, যদি যুদ্ধে না যাও, দেশ স্বাধীন হলে কিন্তু নেতৃত্ব থাকবে না হাতে। এখন কী করবা সিদ্ধান্ত নাও।’ একবার যুদ্ধের কথা ভাবি, আবার যদি নেতৃত্ব না থাকে সেটাও ভাবি। বললাম, যুদ্ধে যাব। রাজ্জাক ভাই ঠিক করে দিলেন, ‘আগে যাবে শাহ মোহাম্মাদ আবু জাফর, তারপর মাও।’

৭৫ জনের নেতা বানিয়ে আমাকে প্রশিক্ষণে পাঠানো হলো। হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ি থেকে সেনাবাহিনীর বড় বড় গাড়িতে পাহাড়ঘেরা দার্জিলিংয়ে। পাহাড়ের পাদদেশে তাঁবু খাটানো। তাঁবুর দিকে এগিয়ে যেতেই একটি তাঁবু থেকে বের হয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন সিরাজুল আলম খান। এখানে সাধারণ সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বেশি হতো রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ। বক্তব্য দিতেন সিরাজুল আলম খান, ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। আমাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন, যুদ্ধে যাওয়ার বিষয়ে যাঁদের মধ্যে ইতস্ততা ছিল, দোদুল্যমানতা ছিল। রাজনৈতিক মোটিভেশনের পর তাঁরাই বলতে শুরু করলেন, ‘আমাদের দ্রুত যুদ্ধে পাঠান, অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিন।’

দার্জিলিং থেকে আমাদের সেনা বিমানে করে নিয়ে যাওয়া হলো দেরাদুনে। নামলাম শাহরানপুর বিমানবন্দরে। সেখানে গিয়ে প্রশিক্ষক হিসেবে পেলাম হাসানুল হক ইনু, শরীফ নূরুল আম্বিয়া ও কাজী আরেফ আহমেদকে। সামরিক প্রশিক্ষণের সঙ্গে চলত রাজনীতির বত্তৃদ্ধতা। ভারতীয় সামরিক অফিসারসহ আমাদের রাজনৈতিক নেতারা মিলে সবাইকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। তাবৎ দুনিয়ার গেরিলা যুদ্ধের ছুবি। সেখানেও যেতেন আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। প্রশিক্ষণ শেষে প্যারেড গ্রাউন্ডে মুজিব বাহিনীর ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক বক্তব্য দিলেন। সেখানে ছিলেন ভারতীয় জেনারেল সুজন সিং উবান। এটা সমাপনী ভাষণ। এরপর আমরা দেশের ভেতরে প্রবেশ করি।

প্রশিক্ষণ শেষে ৭৫ জনের কমান্ডার হিসেবে দেশে ফেরার পথে ধরা পড়ে দুই দিন যুদ্ধ করে ২০ জন সাথিসহ খানসেনাদের হাতে ধরা পড়ে গেলাম। আমাদের গাইড ছিল আসলে পাকিস্তানি সেনাদের এজেন্ট। ভুল পথ দেখিয়ে আমাদের নিয়ে আসে যশোর সেনানিবাসের কাছে। পালিয়ে যেতে পারতাম, সহযোদ্ধাদের রেখে পালাইনি বিবেকের তাড়নায়। বহু নির্যাতন সয়ে বেঁচে আছি ভাগ্যক্রমে।

লেখক : ১৯৭১ সালে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, মুজিব বাহিনী ফরিদপুর সদর মহকুমা প্রধান এবং ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্রসংসদের ভিপি ছিলেন। বর্তমানে কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা।

অনুলিখন : লায়েকুজ্জামান


মন্তব্য