kalerkantho


রাজনীতি

বাইরের শক্তিকে বুঝিয়েই এগোতে চায় বিএনপি

এনাম আবেদীন   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বাইরের শক্তিকে বুঝিয়েই এগোতে চায় বিএনপি

নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়ার ইস্যুটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিয়ে যেতে চায় বিএনপি। দলটি মনে করছে, বিএনপিকে সরকার নির্বাচনের বাইরে রাখতে চায়। আর এ লক্ষ্যেই বিএনপিকে নানাভাবে বাধা দেওয়া, এমনকি উসকানিও দেওয়া হচ্ছে। তাই সরকারের নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলকে জানানোর কৌশল নিয়েছে দলটি।

বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের ‘কূটকৌশলের’ কারণে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জন করতে হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সরকারের ওই কৌশল যেন দৃশ্যমান হয় সে লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন তাঁরা। অর্থাৎ বিএনপিকে ‘ষড়যন্ত্র করে নির্বাচনের বাইরে’ ঠেলে দেওয়া হচ্ছে—এমন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ‘কনভিন্স’ করাই দলটির লক্ষ্য।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব, এমনকি বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতও বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে। ওই দেশগুলোর এমন অবস্থান সম্পর্কে সরকারকে যেমন মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তেমনি বিএনপিকেও চাপ দেওয়া হচ্ছে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য।

অবশ্য বিএনপি প্রথম থেকেই বলে আসছে, তারা নির্বাচনে যাবে এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও তাদের আছে। কিন্তু দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের কারণে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বিএনপির দুই ধরনের কৌশল আছে। একটি হচ্ছে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা এবং অন্যটি হলো আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পরিস্থিতি অবহিত করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা একতরফা নির্বাচন না করতে পারে। দলীয় সূত্র মতে, বিএনপি আপাতত দ্বিতীয় কৌশলটি বেছে নিয়েছে। সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ বা বাধা পেরিয়ে তারা নির্বাচনের পথে থাকারই চেষ্টা করছে এবং করবে। ‘ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র’ বলে পরিচিত শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকে বোঝানো হবে যে বিএনপি নির্বাচনে যেতে চাইছে; কিন্তু সরকারের কর্মকাণ্ডই এ ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। 

বিএনপি স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিক সেটি সরকার চায় না। কারণ তারা জানে যে বিএনপি অংশ নিলে তাদের আর ক্ষমতায় আসার সুযোগ নেই। তাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথে সরকার বাধার সৃষ্টি করছে। এগুলোই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিএনপি জানিয়ে রাখছে। কারণ তারাও অংশগ্রহণমূলক তথা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপি নির্বাচনে যেতে চায়। আবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থানও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে। কিন্তু সরকার এর বিপক্ষে। তাঁর মতে, সরকারই নানা বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করে বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চাইছে। ফলে সময় সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা বিএনপির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। 

জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পরামর্শ অনুযায়ী বিএনপি সহিংস আন্দোলন বাদ দিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে আছে। তিনি বলেন, ‘এর ফলে নির্বাচনের সময় কোনো সমস্যা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলার জন্য বিএনপির সুযোগ তৈরি হবে। বিএনপি বলতে পারবে যে দেখো, তোমাদের কথা আমরা মেনে নিয়েছি। কিন্তু সরকার তো বিএনপিকে স্পেস দিচ্ছে না।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, পরিস্থিতির কারণেই বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সব কিছু জানাতে হচ্ছে।

তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপি যে নির্বাচন বর্জন করতে চায় না সেটি তাদের বোঝাতে হবে। এটি না বোঝাতে পারলে সরকার আবারও ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার সুযোগ পাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনপূর্ব পরিস্থিতিই বিএনপিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিয়ে যাবে। তবে আমি মনে করি, বিএনপির এখনই নির্বাচনে নেমে পড়া উচিত।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. তারেক শামসুর রেহমানের মতে, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা পালন করে—এটি মনে করেই বিএনপি তাদের কাছে যায়। আর এবারে গণমাধ্যমের রিফ্লেকশনে যতটুকু বোঝা যায় তাতে মনে হয় যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ দেশে অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের পক্ষে। ফলে বিএনপির কৌশল হলো এই শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে এবং তাদের আস্থায় নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, অভ্যন্তরীণভাবে রাজনীতি বা আন্দোলন করে বিএনপি সুবিধা করতে পারছে না। দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা আছে, সভা-সমাবেশেও পুলিশি বাধা রয়েছে। ফলে বিএনপির মধ্যে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে যে নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সময়ও এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। সবচে গুরুত্বপূর্ণ হলো খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্ত হবেন কি না। এর ফলে বিদেশি বন্ধুদের প্রতি বিএনপি বেশি মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নির্বাচনের আগে এই নির্ভরতা আরো বাড়বে।

আজ ৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ওয়ার্কার্স পার্টির জনসভা হবে। একই স্থানে ৭ মার্চ জনসভা করবে আওয়ামী লীগ। ২৪ মার্চ একই স্থানে জনসভা করার কথা রয়েছে জাতীয় পার্টির। আর খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ১২ মার্চ জনসভার অনুমতি চেয়েছে বিএনপি। দলটি মনে করে, অন্যান্য দলকে অনুমতি দেওয়া হলে বিএনপির মাঠ বরাদ্দ না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু অনুমতি না পাওয়া গেলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানানোই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে দলটি। এরপর সাতটি বিভাগীয় শহরে জনসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করবে বিএনপি। তবে দলটি মনে করে, ব্যাপক লোক সমাগম হবে এমন আশঙ্কা থেকে সরকার এ ক্ষেত্রেও বাধার সৃষ্টি করতে পারে, অর্থাৎ অনুমতি না মিলতে পারে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, কূটনৈতিক মহলের পরামর্শেই খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার পরও দলটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেছে এবং এখনো ওই ধারা অব্যাহত রেখেছে। খালেদা জিয়ার সাজা হওয়াটাও বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার কৌশল বলে মনে করে দলটি। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার বিভিন্ন দিকসহ উদ্ভূত পরিস্থিতি ঢাকাস্থ কূটনীতিকদের জানানো হয়। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি একই ইস্যুতে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে জানিয়ে চিঠি দেয় বিএনপি।


মন্তব্য