kalerkantho


আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ

ক্রীড়াঙ্গনে রাঙা পা

সনৎ বাবলা    

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ক্রীড়াঙ্গনে রাঙা পা

দেশের ফুটবল হাড্ডিচর্মসার হয়ে গেছে, তবু বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ঠাটবাট কমেনি। ফুটবল ভবনে ঢুকতে গেলে আপনার কোষ্ঠী-ঠিকুজির বর্ণনা করতে হবে। সেটা পেরিয়ে ওপরে উঠলেন তো আরেক দফা প্রহরীর মুখোমুখি। টাকা চুরি যাওয়ায় নাকি জোরদার সুরক্ষা ব্যবস্থা। এ-ও এক হাসির ব্যাপার। রাজ্যের পাওনাদাররা খুঁজছে তাদের আর তারা ফাঁদছে চুরির গল্প। সবচেয়ে মানানসই অজুহাত হতে পারত নারী ফুটবলারদের

সুরক্ষা। চারতলায় তাদের আবাসিক ক্যাম্প। এই সময়ে তাদের চেয়ে বড় ধনরত্ন আর হতে পারে না ফুটবলের। পুরুষ আর নারী ফুটবলারকে পাশাপাশি দাঁড় করালে দেখা যায়, মিডিয়া ছুটছে মেয়েদের দিকেই। কারণ পরাজিতের আর্তির চেয়ে বিজয়ের গল্প শুনতেই বেশি পছন্দ করে মানুষ। তারা মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখে জীবনের এক নতুন ছবি। দারিদ্র্যের শিকল ছিঁড়ে শত প্রতিকূলতা জয় করে এক অসাধারণ মেয়ের ফুটবল বিপ্লব কাহিনি। পুরুষ ফুটবলে যখন বারবার নৌকডুবি হচ্ছে তখন ফুটবলের নবদিগন্তের পানে নৌকা ভাসিয়েছে মেয়েরা। মারিয়া-মার্জিয়াদের পায়ে রচিত হচ্ছে দিগন্ত জয়ের গৌরব। আর সেই গৌরব গায়ে মেখে কর্মকর্তারা জায়গা করে নিচ্ছেন ফিফায়।

দেশের নারী ফুটবলের বয়স বেশি নয়। এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে মাঠে নামার অধিকারে তারা প্রথম লড়েছিল মৌলবাদের বিরুদ্ধে। মানববন্ধন হয়েছিল, দেশের অনেক নারী সংগঠন রাস্তায় নেমেছিল মেয়েদের ফুটবল খেলার অধিকারের দাবিতে। সেই ২০০৪-০৫ সালে দাঁড়িয়ে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি আজকের নারী ফুটবলের অগ্রগতি। বিশেষ প্রগতির সময়কাল গত তিন-চার বছর আর অনুঘটক কলসিন্দুর স্কুল ও মফিজ স্যার। স্কুলের এই ক্রীড়ানুরাগী শিক্ষকের উদ্যোগে ময়মনসিংহের কলসিন্দুর গ্রামে তৈরি হয় ফুটবলের এক আনন্দলোক। সেখানে দারিদ্র্যের কশাঘাতে স্বপ্ন লুটায় মাটিতে, দুই বেলা খাবারের সংস্থানই বড় চ্যালেঞ্জ—জীবনের লড়াইয়ে অনেকখানি হেরে যাওয়া মানুষগুলোর জীবনে ফুটবল এক মুক্তির অবলম্বন হয়ে ফিরেছিল। তাদের মেয়েরা বঙ্গমাতা প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে রং ছড়িয়ে পৌঁছে গেছে জাতীয় দলে। সুবাদে চেহারা বদলে গেল বাংলাদেশ দলের, একই সঙ্গে ওই তহুরা-মার্জিয়াদের জীবনও দাঁড়িয়ে গেল নতুন সম্ভাবনার বাঁকে। ওই স্কুল এখন ফুটবল মডেল, অন্যরা এগোচ্ছে তাদের অনুসরণ করে। তাতে শ্রী বৃদ্ধি হচ্ছে দেশের নারী ফুটবলেরই। গত ডিসেম্বরে সাফ অঞ্চলের ফুটবলে সোনা জিতে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে অনূর্ধ্ব-১৫ নারী দল। এর আগে বাছাই পর্ব জিতে এশীয় অঞ্চলের পরাশক্তি কোরিয়া-জাপান-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে লড়াই করেছে। সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল এখন এই অঞ্চলের নতুন পরাশক্তি, আগে যে গৌরবটা ছিল দেশের ছেলেদের ফুটবলে।

অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা ফুটবল দলের সহকারী কোচ সাবিনা খাতুন অকপটে বলেই ফেলেছেন, ‘মেয়েরা পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পেলে অবশ্যই বিশ্বকাপ ফুটবল খেলবে।’ মহিলা ফুটবলের অগ্রগতির জোয়ারে চোখ রাখলে এই দাবি অতিকথন মনে হয় না। দেশের নারী ফুটবল প্রগতির কারিগর কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন দিনবদলের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘আগের তুলনায় মেয়েরা অনেক বেশি ঝুঁকছে ফুটবলের দিকে। তাদের সঙ্গে কাজ করার সুবিধা হলো, সবাই বাধ্য এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ। তাদেরকে যেভাবে বলা হয় তার একবিন্দুও এদিক-ওদিক হয় না। এই ধারায় চললে আমাদের মহিলা ফুটবলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।’

পুরুষদের মতো নারী ফুটবল হয়তো এখনো পেশা হিসেবে দাঁড়ায়নি তবে ফুটবলের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় নারীর অংশগ্রহণ যে বাড়ছেই। জয়া চাকমা ফুটবল ক্যারিয়ারকে বিদায় জানিয়ে হাত পাকাচ্ছেন রেফারি ও কোচিং লাইনে। রাঙামাটির এই মেয়ে এখন ছেলেদের ফুটবলে রেফারিং করছেন। ২০১২ সালে প্রথম তিনি বাঁশি হাতে নামেন ছেলেদের ফুটবলের পাইওনিয়ার লীগে। সঙ্গে তো এএফসির মহিলা ফুটবলের ম্যাচ পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা আছেই। তবে ছেলেদের ফুটবল চালাতে গিয়ে জয়া নিজেকে দেখেন বিজয়িনীর বেশে, ‘ছেলেদের আন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ম্যাচে একজনকে লাল কার্ড দেখিয়েছিলাম। সেদিন ওই ফুটবলারটির সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ দর্শকরাও একটু বিস্মিত হয়েছিল আমার কঠোরতা দেখে। সত্যি বললে, বাঁশি হাতে আমি ছেলে-মেয়ে হিসাব করি না। যেটা ন্যায্য সেটা হবেই।’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা জয়া মেয়েদের ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচও পরিচালনা করেছেন। শুধু রেফারিই নয়, কোচ হিসেবেও সুখ্যাতি হয়ে গেছে ২৭ বছর বয়সী সাবেক এই ফুটবলারের। যেনতেন কোচ নন, এএফসি লাইসেন্স করা এই কোচ বলেন, ‘ফুটবল আমার প্যাশন। বিকেএসপিতে ৫০ জন মেয়েকে নিয়ে কাজ করি। গত বছর তাদের নিয়ে ভারতে সুব্রত কাপ ফুটবল জিতেছি।’

হ্যান্ডবল খেলোয়াড় ডালিয়া আক্তারের জীবনের গল্পেও আছে নতুন প্রেরণা। খেলা ছাড়ার পর কোচিং লাইনে এসে গত বছর ট্রেনিং করিয়েছেন ঢাকা জেলা পুরুষ হ্যান্ডবল দলকে। গত বছর তাঁর অধীনে ট্রেনিং করা দলটি জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে হয়েছে পঞ্চম। স্কুলজীবনেই হ্যান্ডবলের সঙ্গে সখ্য, তারপর বিজেএমসি দলের হয়ে খেলেছেন নিয়মিত। খেলোয়াড়ি জীবনের বড় গর্ব ২০১৬ এসএ গেমসে রুপা জয়। খেলা ছাড়ার পর ইউরোপিয়ান ‘বি’ লাইসেন্স কোর্স করে হয়েছেন হ্যান্ডবল কোচ, ‘কোচিং আমি বেশ সময় দিচ্ছি কারণ আমাদের দেশে মানসম্পন্ন কোচের বড় অভাব। কোচ হিসেবে আমি সব সময় সেরা হতে চাই। পুরুষ দলকে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা নতুন। তাদেরকে ধন্যবাদ যে ছেলেরা আমাকে সহযোগিতা করেছে।’

ছেলেরাও মহিলা কোচ মেনে নিচ্ছে! বলতেই হবে, পুরুষশাসিত এই সমাজে আস্তে আস্তে পুরুষদের চোখও বদলাতে শুরু করেছে। নইলে পুরুষ ক্রিকেটবোদ্ধাদের ভিড়ে সাথিরা জাকির জেসি কি ক্রিকেট ধারাভাষ্যে জায়গা করে নিতে পারেন! ফুটবলের মতো মহিলা ক্রিকেট দলের অমন চোখ-ধাঁধানো সাফল্য না থাকলেও খেলা ছাড়ার পরও সাবেক এই ক্রিকেটার টিভি-রেডিওতে ক্রিকেট-কথনে বেশ সফল। রেডিও স্বাধীনের নিয়মিত ধারাভাষ্যকার মনে করেন, ‘ক্রিকেট আমাকে জনপ্রিয়তা দিয়েছে খেলায় যেমন গর্ব তেমনি বলায়ও। ক্রিকেটের সঙ্গেই আমার নাওয়া-খাওয়া।’

ক্রীড়াঙ্গনের সুবাদে নারীর জীবনেও যোগ হচ্ছে কত নতুনত্ব। জীবন তো এমনই, নদীর মতো। তাকে নির্বিঘ্নে বইবার সুযোগ করে দিলে সে কোথায় গিয়ে থামবে তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের বাতাসেও নারী-অনুকূলের সুর। সুতরাং সামনের দিনেও নারী-প্রগতির সুখবর বাড়বে বৈ কমবে না।



মন্তব্য