kalerkantho


আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ

তৃণমূলের চাকা কোমল হাতে

আবুল কাশেম    

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



তৃণমূলের চাকা কোমল হাতে

বর্তমানে ষাটোর্ধ্ব চিমুলির বয়স যখন ছিল ২০ বছরেরও কম, তখন এক সন্তান রেখে তাঁর স্বামী মারা যান। স্বামীর সম্পদ বলতে ছিল গ্রামে ৪ শতাংশ বসতভিটা, একটি কুঁড়েঘর। শিশু আমানুল্লাহকে নিয়ে সেই থেকে সংগ্রাম শুরু চিমুলির। বর্গা নিয়ে গরু-ছাগল পালতেন, মানুষের কাজ করে দিয়ে কিছু ধান-চাল পেতেন। দুজনের ছোট সংসারের খরচ মেটানোর পর দু-চার আনা করে জমাতে থাকেন। সঞ্চয় কিছুটা বড় হলে বছর দশেক আগে দুবাই পাঠান ছেলেকে।

আমানুল্লাহ পাঁচ বছর পর ফিরে এসে জমি কেনেন, কুঁড়েঘর ভেঙে টিনের ঘর তুলেছেন। বিয়ে করেছেন। সচ্ছলতা আসে জীবনের বড় সময় অভাব-অনটনে কাটানো চিমুলির সংসারে। আমানুল্লাহর দুই সন্তান এখন স্কুলে পড়ছে। টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার ফুলতলা গ্রামে তাদের বাড়িতে এখন বিদ্যুতের আলো।

একই গ্রামের ধনী চিকিৎসকের মেয়ে নাজমা আক্তার ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন গরিব পরিবারের ছেলে সমবয়সী আশরাফকে। দুই বছর আগে তাঁদের বড় ছেলের এসএসসি পরীক্ষার দিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান আশরাফ। তখন ছোট ছেলের বয়স বছর তিনেক। গ্রামীণ ব্যাংকে ছোট পদে চাকরি করা আশরাফের মৃত্যুতে দুই বাচ্চা নিয়ে নাজমার সংসার টিকবে কি না, তা নিয়েই এলাকার মানুষের মনে সন্দেহ ছিল। কিন্তু এসএসসি পাস করতে না পারা নাজমা এখন দুই সন্তান নিয়ে সুখে আছেন। তিনি গ্রামে গ্রামে গিয়ে মহিলাদের কোরআন শিক্ষা দিয়ে মাসে আট থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর গ্রামীণ ব্যাংক থেকে পাওয়া ছয় লাখ টাকার ডাকঘর সঞ্চয়পত্র কিনে রেখে দিয়েছেন।

নাজমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কোরআন শিখিয়ে যা পাই তাই দিয়ে বড় ছেলেকে ইন্টারমিডিয়েট পড়াচ্ছি, ছোট ছেলেও স্কুলে যাচ্ছে। প্রতি মাসের আয় থেকে একটু একটু টাকা জমিয়ে বাড়িতে ফ্লোর পাকা করে টিনের চারচালা ঘর দিয়েছি।’

এঁদের মতোই বাংলাদেশের প্রান্তিক নারীর হাতে জেগে উঠছে তার সংসার, ফিরছে সচ্ছলতা। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতেই শুধু নয়, সন্তানদের পড়াশোনা করে ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তুলতেও দক্ষ কারিগরের ভূমিকা পালন করছে তৃণমূলের সাধারণ নারীরা। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করা হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও শুধু মায়ের ত্যাগ-তিতিক্ষার কারণে তিনি আজ ডাক্তার হতে পেরেছেন। ‘মা আমাকে পড়াতে গিয়ে এক জোড়া স্যান্ডেল, আর একটি শাড়ি পরে পাঁচ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। খাবারের সংকট ছিল, দুপুরের খাবার মা না খেয়ে আমার জন্য রেখে দিতেন। মায়ের আত্মসম্মানবোধ প্রকট, তার পরও অন্যের বাড়িতে কাজ করে আমার প্রাইভেটের টাকা জোগাড় করে দিতেন। কত যে কষ্ট করতেন, তা আমাকে কোনো দিন বুঝতে দেননি।’ কালের কণ্ঠকে বলেন হেলাল উদ্দিন।

বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি শিক্ষিত সন্তানের পেছনে রয়েছে তার মায়ের অবর্ণনীয় কষ্ট, ত্যাগ-তিতিক্ষা আর সংগ্রাম। গ্রামগঞ্জের নারীরা দিন-রাত পরিশ্রম করছে, কাজ করছে ক্ষেতে-খামারে, ঘরে-বাইরে, হাটবাজারে ও শিল্প-কারখানায়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয়ের উৎস ‘তৈরি পোশাক’ খাতও নারী শ্রমিকনির্ভর। গ্রামের নারীরা শহরে আসছে। বিভিন্ন কলকারখানায় শ্রমিকের কাজ ছাড়াও গৃহকর্মীর কাজ, ছোটখাটো দোকান পরিচালনা করে অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে তারা। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশেও ছুটে যাচ্ছে নারীরা।

অ্যাসোসিয়েশন অব গ্রাসরুটস উইমেন এন্টারপ্রেনার্স বাংলাদেশের (এজিডাব্লিউইবি) তথ্য অনুযায়ী, সংসারে রুটিন কাজের বাইরেও নারীরা কৃষিপণ্য উৎপাদনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। বাংলাদেশে প্রায় ১২ কোটি মানুষ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত, এর ৫৩.২৫ শতাংশ পুরুষ ও ৪৬.৭৫ শতাংশ নারী। কৃষি খাতের জমিতে চাষাবাদ ছাড়াও শস্য প্রক্রিয়াকরণের পুরো কাজের সঙ্গেই সম্পৃক্ত নারীরা।

এ বছর ‘আনসাং উইমেন নেশন বিল্ডার্স’ পদক পাওয়া নাজনীন আক্তার নিপা এক একর জমিতে দুই হাজার প্রজাতির ৫০ হাজার ঔষধি গাছ চাষ করছেন। এই নার্সারি থেকে প্রতি মাসে তিনি আয় করছেন ২৫ হাজার টাকা। ‘শুরুতে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঘুরে একেকটি প্রজাতির গাছ সংগ্রহ করে জমিতে লাগাতাম। তখন এলাকার মানুষ আমার স্বামীকে বলত, নিপা পাগল হয়ে গেছে। ওরে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখো। এখন পুরো এলাকার মানুষ আমার প্রশংসা করে’, বলছিলেন নিপা।

বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য দিলারা আমজাদ তাঁর পাঁচ বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে হস্তশিল্প পণ্য উৎপাদন শুরু করেন। পরে ২০০৫ সালে রাজশাহীর একটি গ্রামে ১০ নারী শ্রমিক নিয়োগ দেন তিনি। বর্তমানে তাঁর কারখানায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা এখন ১০০-রও বেশি। দিলারার এই সফলতার কাহিনির বর্ণনা রয়েছে উইমেন চেম্বারের ওয়েবসাইটে। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের অংশীদারি এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছেনি। উন্নত দেশগুলোতে নারী উদ্যোক্তাদের অবদান যেখানে ২৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে নারীদের অবদান ১০ শতাংশেরও কম। তবে বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগই ২০০০ সালের পর যাত্রা শুরু করেছে। এর অর্থ হলো, তরুণ ও শিক্ষিত নারীরা ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে, একজন নারী একজন পুরুষের চেয়ে তিন গুণ বেশি কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে সন্তান লালন-পালন, দৈনন্দিন বাজার ও রান্না করা, সন্তানদের পড়াশোনার পেছনে সময় দেওয়া ও গৃহস্থালির কাজ। অর্থনীতিতে এসব কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, নারীরা আগে বিনা পয়সায় অনেক কাজ করত। এখন সে ধারায় পরিবর্তন এসেছে। ২০১০ সালে পরিবারভিত্তিক বিনা বেতনে কাজ করত ৯১ লাখ নারী। সেটি কমে দাঁড়িয়েছে ৮৪ লাখে। দেশে বর্তমানে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ছয় কোটি ১৪ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ চার কোটি ৩১ লাখ, নারী এক কোটি ৮৩ লাখ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা জরিপে বলা হয়েছে, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সের একজন নারী গড়ে প্রতিদিন একই বয়সের পুরুষের তুলনায় প্রায় তিন গুণ সময় কাজ করে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, কর্মজীবী একজন পুরুষ ২৪ ঘণ্টায় অর্থের বিনিময়ে ছয় ঘণ্টা ৫৪ মিনিট কাজ করে। অথচ কর্মজীবী একজন নারী ঘরে ফেরার পরও লম্বা সময় কাজ করে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো নাজনীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের নারী এটা পারবে না, ওটা পারবে না, এখন আর সেদিন নেই। আশির দশকে যখন নারীরা গার্মেন্টে কাজ করত, তখন সমাজে তাদের ভালোভাবে দেখা হতো না। অথচ তাদের ওপর ভর করেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হয়েছে বাংলাদেশ। দেশের নারীরা এখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তা হচ্ছে, যদিও তাদের সংখ্যা ৮-১০ শতাংশেরও কম। তবে এটা বাড়ছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণেও নারীর ভূমিকা বাড়ছে। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন তাদের অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছে।


মন্তব্য