kalerkantho


প্রত্যক্ষদর্শী

বজ্রকণ্ঠে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বজ্রকণ্ঠে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে

সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভের পরও আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় ফুঁসে উঠেছিল এ দেশের সাধারণ মানুষ। বিস্ফোরণোন্মুখ সেই পরিস্থিতিতে নেতার নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল জনতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে সেই নির্দেশনা পেতেই একাত্তরের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে জনতার ঢল নেমেছিল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উপস্থিত থাকা কয়েকজন ব্যক্তিত্ব কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপচারিতায় বর্ণনা করেছেন দিনটির। তাঁরা জানিয়েছেন কিভাবে কাদের নেতৃত্বে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে এলেন, কেন এলেন, সমাবেশে উপস্থিত জনতার মনোভাব কেমন ছিল, সমাবেশস্থলের আবহ, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়াসহ নানা বিষয়।

হযরত আলী

বঙ্গবন্ধু বললে ক্যান্টনমেন্টেও হামলা চালাত জনতা

‘৭ই মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনা জানার জন্য জনতার ঢল নেমেছিল। আগতরা সেদিন এতটাই ক্ষুব্ধ ছিল যে বঙ্গবন্ধু যদি বলতেন ক্যান্টনমেন্ট দখল করতে হবে তবে তারা পিছপা হতো না। আমরা সেদিন লাঠি হাতেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে নামতাম।’

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উপস্থিত থাকা আওয়ামী লীগ কর্মী হযরত আলী এভাবেই স্মৃতিচারণা করলেন ৭ই মার্চের সমাবেশের। তিনি বর্তমানে সূত্রাপুর থানা আওয়ামী লীগের কর্মী। ১৯৭১ সালে তিনি ১৬-১৭ বছরের কিশোর। বাস করতেন ঢাকার কেরানীগঞ্জে। স্কুলের সহপাঠীদের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসেছিলেন লাঠি হাতে। নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া হযরত আলী রাজনীতির জটিল হিসাব না বুঝলেও পশ্চিম পাকিস্তানিরা যে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করছে, অধিকার বঞ্চিত করছে এটুকু বুঝতেন। এটাও বুঝতেন এ শোষণমুক্তির লড়াইয়ের নেতা হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

হযরত আলী বলেন, ‘৭ই মার্চের সমাবেশে যোগ দিতে আমরা বেশ কিছু ছাত্র সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। বাঁশের লাঠি হাতে কেরানীগঞ্জের ইস্পাহানি হাই স্কুল মাঠে সমবেত হই। সেখান থেকে বাসে করে জিঞ্জিরা ও পরে নৌকায় করে নদী পার হই। কালিমন্দিরের পাশের গেট দিয়ে আমরা দুপুরের দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করি। তখন স্লোগানে উত্তাল ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। বঙ্গবন্ধুর নামে প্রকম্পিত হচ্ছিল আশপাশের এলাকা।’

সোহরাব হোসেন

ওই ভাষণ জাতিকে পথ দেখিয়েছে

বর্তমানে মগবাজারের বাসিন্দা সোহরাব হোসেন একাত্তরে তেজগাঁও থানার অধীন যাত্রাবাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তখন ২২-২৩ বছরের যুবক সোহরাব স্নাতক শ্রেণির শিক্ষার্থী। দলের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি জমায়েত নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উপস্থিত হন।

সেদিনের স্মৃতিচারণা করে সোহরাব হোসেন বলেন, ‘আদমজী জুট মিল থেকে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক হেঁটে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় এসে জমায়েত হয়। সেখান থেকে আমরা একসঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাই। আমাদের রওনা দিতে একটু দেরি হয়েছিল। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের পাশ দিয়ে উদ্যানে প্রবেশ করি।’

সোহরাব হোসেন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও তাঁর ভাষণ থেকেই আমরা ধরে নিলাম স্বাধীনতার জন্য লড়তে হবে। ভাষণ শেষে আমরা মিছিল নিয়ে এলাকায় ফিরলাম। সংগ্রাম কমিটি গঠন শুরু করলাম। যেকোনো পরিস্থিতির জন্য আমরা নিজেদের প্রস্তুত করতে লাগলাম।’

জয়দল হোসেন

বিপুল উপস্থিতি ছিল অবাক করা বিষয়

অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী মোহাম্মদ জয়দল হোসেন একাত্তরে ছিলেন ১৪-১৫ বছরের কিশোর। খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা জয়দল হোসেন বলেন, ‘কুমিল্লার দ্বেবিদারে এলাহাবাদ স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়তাম। আমার বড় ভাই থাকতেন খিলগাঁওয়ে। আমি ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে খিলগাঁওয়ে ভাইয়ের বাসায় আসি। ভাই ওলিউল্লাহ ভূঁইয়া তখন আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী। আমি ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ৭ই মার্চ প্রচণ্ড গরম পড়েছিল। বড় ভাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অনুরোধ করি সঙ্গে নিতে। তিনি রাজি হন।’

জয়দল হোসেন বলেন, ‘দুপুরের দিকে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী খিলগাঁও তালতলায় জমায়েত হলো। রাস্তায় বিপুলসংখ্যক মানুষ। অফিস, দোকানপাট বন্ধ। রাস্তায় যানবাহনও তেমন ছিল না। আমরা হেঁটে চলে গেলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। একই গন্তব্যে ছোট ছোট দলে বহু মানুষ যাচ্ছিল। সবার কণ্ঠেই স্লোগান—চলো চলো, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলো।’

জয়দল বলেন, ‘মৎস্য ভবন হয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের পাশ দিয়ে গিয়ে আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করলাম। এখনকার শিশু পার্কের ওই দিকে মঞ্চ ছিল। আমরা পৌঁছে দেখি বিপুলসংখ্যক মানুষ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কানায় কানায় পূর্ণ। তখন ঢাকায় লোকসংখ্যা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু এত মানুষ জমায়েত হওয়া ছিল আমাদের কাছে অবাক করা বিষয়। আমি ছোট একটি গাছের ওপরে উঠে মঞ্চ দেখি।’

জয়দল বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সময় সে কী স্লোগান। আজ ৪৭ বছর পরও যখন ভাষণটা শুনি শরীর কেঁপে ওঠে। বঙ্গবন্ধু যে ভাষণটা দিলেন তা আমাদের হৃদয়ে গেঁথে গেল। বড় ভাই বাসায় ফিরে ভাবিকে বললেন—বঙ্গবন্ধু যখন বলেছেন, তার মানে আমাদের যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’

ওসমান গনি

সোনারগাঁ থেকে হেঁটে গিয়েছি রেসকোর্সে

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে সোনারগাঁ থেকে হেঁটে রেসকোর্স ময়দানে হাজির হয়েছিলেন ওসমান গনি। তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। সক্রিয় কর্মী ছাত্রলীগের। স্মৃতিচারণা করে বললেন, ৩ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করার খবরে উত্তাল হয়ে উঠেছিল সোনারগাঁর মতো গাঁও-গেরামও। আমাদের গ্রাম মুগড়াপাড়ার সাজেদ আলী মোক্তার তখন আমাদের নেতা। স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। স্থানীয় এমএনএ সফর আলী ভুঁইয়া ও সাজেদ আলী মোক্তার এলাকায় জনসভা করে বললেন, ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে জনসভা করবেন। সেই জনসভা থেকেই বঙ্গবন্ধু চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন। চূড়ান্ত ঘোষণা কথাটি শোনার পর থেকেই এক ধরনের উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

একাত্তরে যাতায়াতের জন্য যানবাহন সহজলভ্য ছিল না। বাসের সংখ্যা ছিল খুব কম। আমরা ছাত্ররা মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, হেঁটেই রেসকোর্সে যাব। প্রায় হাজার তিনেক ছাত্র-যুবক যাত্রা করলাম সকাল ৯টার দিকে। কাঁচপুরে এসে কিছু সময় বিশ্রাম নিলাম। পথে কেবলই জনস্রোত। সবাই যাচ্ছে রেসকোর্স ময়দানে।

আমাদের সবার হাতে বাঁশের লাঠি। দুপুরে রেসকোর্সে পৌঁছে গেলাম। আমরা অবস্থান নিলাম মঞ্চের উত্তর-পশ্চিম দিকটায়। মঞ্চে কোনো চেয়ার ছিল না। একমাত্র বক্তা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্পষ্ট মনে আছে—বঙ্গবন্ধু এলেন। মঞ্চে উঠলেন। হাত নেড়ে জনগণকে অভিবাদন জনালেন। চশমাটা খুলে রেখে ভাষণ শুরু করলেন। ১৮ মিনিটের ভাষণ। মনে হলো কয়েক মিনিটে শেষ হয়ে গেল।



মন্তব্য