kalerkantho


রাখাইনে এখনো জাতিগত নিধন চলছে : জাতিসংঘ

গণহত্যাবিষয়ক জাতিসংঘের উপদেষ্টা আসছেন আজ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



রাখাইনে এখনো জাতিগত নিধন চলছে : জাতিসংঘ

মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এখনো জাতিগত নিধনযজ্ঞ চলছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অ্যান্ড্রু গিলমোর। চার দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে গতকাল মঙ্গলবার সকালে ব্যাংকক ও জেনেভা থেকে একযোগে প্রকাশিত বিবৃতিতে তিনি এ কথা জানান।

এদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার আশঙ্কা করায় পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে আট দিনের সফরে আজ বুধবার বাংলাদেশে আসছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত গণহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা আদামা ডিয়েং। সফরকালে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন ছাড়াও ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সফর শেষে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে প্রতিবেদন দেবেন তিনি।

অন্যদিকে গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সফর করে যাওয়া মানবাধিকারবিষয়ক আসিয়ান পার্লামেন্ট সদস্যদের জোট (এপিএইচআর) গতকাল সকালে তাদের ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে রোহিঙ্গা পরিস্থিতিকে পুরো অঞ্চলের সংকট হিসেবে উল্লেখ করে এটি সমাধানে পুরো অঞ্চলকেই ভূমিকা রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। আসিয়ান এমপিরা প্রতিবেদনে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ানোর জোর তাগিদ দিয়েছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর জানায়, মানবাধিকারবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অ্যান্ড্রু গিলমোরের বাংলাদেশ সফর ছিল মূলত এ দেশে গত বছরের আগস্ট থেকে আশ্রয় নেওয়া প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গার পরিস্থিতি দেখা। রাখাইন রাজ্যে গত বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় হত্যা ও যৌন সহিংসতার হার কমে এসেছে। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা অ্যান্ড্রু গিলমোরকে এবং কক্সবাজারে জাতিসংঘের অন্য কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যা বলেছে তাতে রাখাইনে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অপহরণ অব্যাহত থাকার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য মিলেছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইনের মংডু এলাকা এরই মধ্যে কার্যত রোহিঙ্গাশূন্য হয়ে পড়েছে। এখন যারা আসছে তারা রাখাইনে আরো ভেতরের এলাকাগুলোর বাসিন্দা ছিল।

অ্যান্ড্রু গিলমোর বলেন, ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে। কক্সবাজারে আমি যা দেখেছি ও শুনেছি তা থেকে আমরা এটি ছাড়া (জাতিগত নিধনযজ্ঞ অব্যাহত) অন্য কোনো উপসংহারে পৌঁছাতে পারি বলে আমি মনে করি না।’

তবে অ্যান্ড্রু গিলমোর বলেন, ‘সহিংসতার ধরন বদলে গেছে। গত বছর ছিল উন্মত্ত রক্তপাত ও গণধর্ষণ। এখন ভয়ভীতি প্রদর্শন ও কৃত্রিম খাদ্য সংকট সৃষ্টির প্রচেষ্টা চলছে। রোহিঙ্গাদের নিজেদের বাড়িঘর থেকে তাড়াতে ও বাংলাদেশে পাঠানোর লক্ষ্যে এসব করা হচ্ছে।’ জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বেশ কিছু ব্যক্তি তাঁকে বলেছেন, যে রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যে তাদের গ্রাম, এমনকি বাড়িঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের ধরে নিয়ে যায় এবং এরপর তারা আর কখনো ফিরে আসে না।

একজন রোহিঙ্গা যুবক গত ফেব্রুয়ারিতে তার বাবা অপহৃত হওয়ার বিবরণ দিয়েছে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবকে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী তার বাবাকে অপহরণ করে নেওয়ার কয়েক দিন পর মরদেহ আনতে তাকে খবর পাঠায়। ওই রোহিঙ্গা বলেছে, তার বাবার মৃত্যু কিভাবে হয়েছে সেনাবাহিনীকে সে প্রশ্ন করার সাহস সে পায়নি। তবে তার বাবার মরদেহ ছিল ক্ষতবিক্ষত।

আরেকজন রোহিঙ্গা বলেছেন, মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি গত জানুয়ারিতে তাঁকে বাড়িতে বেঁধে তাঁর ১৭ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে যায়। প্রতিবাদ করলে বিজিপি তাঁকে উপর্যুপরি লাথি মেরেছে। গত ১৫ জানুয়ারি থেকে মেয়েটির আর কোনো খোঁজ পাননি তিনি।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর বলেছে, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নারী ও মেয়েদের অপহরণ এবং ফিরে না আসার এমন অনেক তথ্য পাওয়া যায়। তাদের স্বজনদের আশঙ্কা, ধর্ষণের পর তাদের মেরে ফেলা হয়েছে।

জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অ্যান্ড্রু গিলমোর বলেন, ‘মিয়ানমার সরকার বিশ্বকে বলে বেড়াচ্ছে যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে তারা প্রস্তুত। অথচ একই সঙ্গে তারা আবার রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে বাংলাদেশে পাঠানো অব্যাহত রেখেছে।’

অ্যান্ড্রু গিলমোর আরো বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসইভাবে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। আলোচনায় এখন অবশ্যই রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বন্ধ, হোতাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং  রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার জন্য মিয়ানমারের পরিবেশ সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’

জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক তৎপরতার প্রশংসার পাশাপাশি আগামী বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও ভূমিধসের বিপজ্জনক পরিস্থিতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যে মহানুভবতা দেখিয়েছে তা বিশ্বের অনেক প্রান্তে এমনকি এ অঞ্চলেও অভাব আছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশের ওপর পড়েছে।

জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। প্রথমত—হত্যা, ধর্ষণ ও অন্যান্য সহিংসতা বন্ধ করা; দ্বিতীয়ত—খাদ্য সংকট সৃষ্টি ও জীবিকা বিনষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা এবং তৃতীয়ত—রোহিঙ্গাদের নিপীড়নের মূল কারণ সমাধান করা।

অ্যান্ড্রু গিলমোর বলেন, ‘সর্বোপরি, এই বর্বর জাতিগত নিধনযজ্ঞ, যাকে অনেকে গণহত্যা বলে মনে করছে, সেটি যারা করছে তাদের বাহবা দিতে পারে না বিশ্ব। রোহিঙ্গাদের তাদের দেশ ও বাড়িঘরে প্রত্যাবাসন জরুরি। তবে একই সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দোষীদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

একই সঙ্গে রোহিঙ্গারা যত দিন বাংলাদেশে আছে তত দিন তাদের সম্মানের সঙ্গে বসবাসের সুযোগ, জীবিকা ও শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অ্যান্ড্রু গিলমোর।


মন্তব্য