kalerkantho


সিরাজুল আলম খান বললেন নাম হবে ‘মুজিব বাহিনী’

শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর

৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সিরাজুল আলম খান বললেন নাম হবে ‘মুজিব বাহিনী’

সিরাজুল আলম খান বললেন, ‘তোমাদের বাহিনীর নাম হবে মুজিব বাহিনী’। সঙ্গে সঙ্গে হলজুড়ে উল্লাসধ্বনি, ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে গগনবিদারী স্লোগান। ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে স্লোগানে কণ্ঠ মেলালেন। সবাই খুশি। এটা ১০ জুলাইয়ের ঘটনা। দেরাদুনের চাকারাতা ক্যাম্পে দিনে সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে রাতে মুজিব বাহিনীর চার প্রধান রাজনৈতিক ক্লাস নেওয়ার সময় বাহিনীর নামকরণ করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সিরাজুল আলম খান। উপস্থিত সবাইকে একটি সুন্দর নাম প্রস্তাব করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘দেখো মুক্তিবাহিনী নামটা বেশ সুন্দর। আমরা এমন একটা সুন্দর নাম রাখতে চাই। আমরা সবাই নামের জন্য চিন্তা করছি।’ এ সময় সিরাজুল আলম খান নিজেই ‘মুজিব বাহিনী’ নামটা বললেন। ১৯৬৯ সালেই ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াসের নেতারা গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়াস সমর্থিত নেতাকর্মীদের নিয়ে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী ছাত্র পরিষদ গঠিত হয়। তখন বাহিনীর নাম ছিল বিএলএফ (বাংলাদেশ লেবারেশন ফোর্স)।

এ প্রসঙ্গে আরেকটু আগে ফিরতে হবে, ১৯৭০ সালের মে মাস। নিউক্লিয়াসের অন্যতম নেতা আব্দুর রাজ্জাক খবর পাঠালেন রাত ১০টার পর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ডাকবাংলোয় যেতে হবে, তিনি আসবেন। রাত ১০টার সামান্য পর একজন দেহরক্ষীসহ আব্দুর রাজ্জাক এলেন। রাজ্জাক ভাই বললেন, ‘বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ আনুসারেই আমি, সিরাজুল আলম খান, কাজী আরেফ নিউক্লিয়াস পরিচালনা করছি। যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করতে হবে, যুদ্ধ করতে ও জীবন দিতে রাজি—তোমরা এমন ছাত্রকর্মীদের জোগাড় করতে শুরু করো।’ আমাদের নিউক্লিয়াসের সদস্য করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। রাজ্জাক ভাই বললেন, ‘দেশে নির্বাচন হয়তো একটা হবে, তবে পশ্চিমারা তা মানবে না, ক্ষমতাও ছাড়বে না। যুদ্ধ ছাড়া দেশ স্বাধীন করার কোনো বিকল্প নেই, প্রস্তুতি নিতে শুরু করো।’

১৯৭১-এ ফিরি।

১২ এপ্রিল। গেঁদে সীমান্তের শূন্য রেখায় প্রবেশের আগেই দেশের মাটিতে শুয়ে পড়লাম। ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার ওপর ঠেকাই মাথা’ কবিগুরুর এ গানটির কয়েক লাইন উচ্চস্বরে গাইলাম।

দুলাল রায় আমার ছোটবেলার বন্ধু। দুলাল কংগ্রেসের ছাত্র ফ্রন্ট ‘ছাত্র পরিষদ’-এর নেতা। আগেই জানা ছিল, দুলাল শিয়ালদহ স্টেশনের পাশে হোটেল ব্যারেঞ্জে আড্ডা দেয়। আমাদের খবর পেয়ে অনেক লোক জড়ো হলো, তারা সবাই দেশের খবর নিতে চায়। তাদের বেশির ভাগ লোকের আত্মীয়-স্বজন আছে পূর্ব পাকিস্তানে, জানতে চায় তাদের খবর। দুলালের সুবাদে থাকার ব্যবস্থা হলো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ডিঞ্জ ছাত্রাবাসে। সেখানে ফ্রি খাবারের ব্যবস্থা হলো। দুলাল জানাল, আমাদের কয়েকজন নেতা এসেছেন, তাঁরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে আছেন। সন্ধ্যায় গেলাম। দেখা হলো তাজউদ্দীন আহমেদ, ফণিভূষণ মজুমদার ও আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে। তাজউদ্দীন আহমেদ বললেন, ‘চিন্তা করো না, ভারত সরকারের সঙ্গে কথা হয়েছে, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হচ্ছে।’ শুনে মনটা ভালো হয়ে গেল।

২০ এপ্রিল রাজ্জাক ভাই খবর দিলেন দেখা করতে। বললেন, ‘প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চূড়ান্ত হয়েছে। তোমাকে দেশে গিয়ে এলাকার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ভারতে নিয়ে আসতে হবে।’ মনে দ্বিধা ছিল; কিন্তু নেতার হুকুম। ২৪ এপ্রিল বন্ধু দুলাল ও সৈয়দ কবিরুল আলম মাওকে নিয়ে দেশে এলাম। ফের ভারতে প্রবেশ করি ২৭ এপ্রিল। দেশের ভেতর তখন পাকিস্তানি সেনা ও নব্য রাজাকারদের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। রাজ্জাক ভাই বললেন, প্রথম ব্যাচেই গেরিলা প্রশিক্ষণে যেতে, ভেবেছিলাম প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণটা দেখে দ্বিতীয় ব্যাচে যাব। কাউকে না জানিয়ে ভদ্রেশ্বর নামে একটা জায়গায় চলে গেলাম। কয়েক দিন পর বোয়ালমারীর আবু জাফর মিয়া গিয়ে হাজির সেখানে, জানালেন এখনই রাজ্জাক ভাই কলকাতা যেতে বলেছেন। এসে আবার উঠলাম হার্ডিঞ্জ ছাত্রাবাসে।

রাজ্জাক ভাই ছাত্রবাসে এসে বলে গেলেন, ২০ মে শিয়ালদহ রেলস্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মের চায়ের দোকানে হাজির থাকতে হবে। গিয়ে দেখি আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, বোয়ালমারীর আবু জাফর মিয়া দাঁড়িয়ে আছেন চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে আছেন।

সঙ্গে ২০০ লোক নিয়ে ২১ মে শিলিগুড়ির পাঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছালাম। সেখান থেকে দেরাদুনের চাকারাতা ক্যাম্পে। ক্যাম্প ইনচার্জ ছিলেন কর্নেল বুইক ও ডেপুটি ছিলেন লে. কর্নেল প্রকাশ চন্দ্র পুরকায়স্থ, ইনি আদিতে সিলেটি। চাকারাতা ক্যাম্পে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে আসতেন ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি হতো রাজনৈতিক মোটিভেশন। দেখানো হতো গেরিলা যুদ্ধের সিনেমা। ১৫ জুলাই প্রশিক্ষণের শেষ দিনে প্যারেড গ্রাউন্ডে এলেন মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী জেনারেল সুজন সিং উবান ও মুজিব বাহিনীর চার নেতা। তাঁরা বক্তব্য দিলেন। উত্তোলন করা হলো জাতীয় পতাকা, পরিবেশিত হলো জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। মুজিব বাহিনীর ফরিদপুর জেলার সহ-অধিনায়ক হিসেবে দেশে ফিরলাম।

লেখক : মুজিব বাহিনী ফরিদপুর জেলার সহ-অধিনায়ক। তৎকালীন ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, সাবেক এমপি। বর্তমানে বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশনের সভাপতি। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা।

অনুলিখন : লায়েকুজ্জামান



মন্তব্য