kalerkantho


জাফর ইকবাল পুরোপুরি সজ্ঞান সচেতন ও শঙ্কামুক্ত

নেপথ্যে জঙ্গি সংগঠন ফয়জুরের অস্বীকার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও সিলেট   

৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



নেপথ্যে জঙ্গি সংগঠন ফয়জুরের অস্বীকার

ঘাতকের হামলায় আহত জনপ্রিয় লেখক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল সম্পূর্ণভাবে সজ্ঞান, সচেতন ও শঙ্কামুক্ত। তাঁর চিকিৎসায় গঠিত পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গতকাল সোমবার এই মূল্যায়ন করেছে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানিয়ে বলা হয়েছে, ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই শিক্ষাবিদের দ্রুত আরোগ্য লাভ ও সংক্রমণ রোধে দর্শনার্থী প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

এদিকে ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ফয়জুল হাসান ওরফে ফয়জুর ওরফে শফিকুর নিজেকে স্বতঃপ্রণোদিত উগ্রপন্থী হিসেবে দাবি করেছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, সে কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নয়।

তদন্তকারীরা বলছেন, গতকাল সোমবার পর্যন্ত তিন দিনের তদন্তে ফয়জুর কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে—এমন বেশ কিছু আলামত তাঁরা পেয়েছেন। এর মধ্যে ফয়জুরের নামাজ পড়ার ভিন্ন রীতি, একাকী চলাফেরা করা, পারিবারিকভাবে সালাফি মতাদর্শী, আত্মঘাতীর মতো হামলা চালানো, আটকের পর স্বাভাবিক থাকার বিষয়গুলো রয়েছে। কিন্তু ফয়জুর বা কোনো জঙ্গি সংগঠন এ ব্যাপারে দায় না স্বীকার করায় বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারছে না তারা।

তবে আচার-আচরণ ও হামলার ধরন দেখে তাকে আনসার আল ইসলামের সদস্য ধরে নিয়েই তদন্ত করা হচ্ছে। সিলেট এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আনসার আল ইসলামের জঙ্গিদের সঙ্গে ফয়জুরের কোনো সম্পর্কে আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও আত্মীয়-স্বজনদের দেওয়া তথ্যে জানতে পেরেছি যে ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ফয়জুর সেলফ র‌্যাডিকালাইজ হয়ে (স্বতঃপ্রণোদিত) জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে অসুস্থ থাকায় তাকে বেশিক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ হয়নি। তার পরিবার ও নিকট আত্মীয়-স্বজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এই হামলায় ইন্ধনদাতা, পরিকল্পনাকারী বা সহায়তাকারী যে-ই থাকুক না কেন, খুঁজে বের করা হবে।’

একই অনুষ্ঠানে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘জঙ্গিরা তাদের নিজেদের শক্তির জানান দিতেই এই হামলা করেছে। বিষয়টি কাউন্টার টেররিজম ইউনিট তদন্ত করছে। হামলার নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা হবে। যেকোনো মূল্যে জঙ্গিবাদী তৎপরতা প্রতিহত করব।’

জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত সিলেটে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কড়া পুলিশ পাহারায় হামলাকারী ফয়জুরের চিকিৎসা চলছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে তার কোনো জঙ্গি সহযোগীর নাম প্রকাশ করেনি। ঢাকা থেকে যাওয়া কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সদস্যরা ফয়জুরকে থেমে থেমে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।

সিটিটিসির এক কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফয়জুরের মধ্যে সংগঠিত জঙ্গি বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে। তবে সে অস্বীকার করছে। জঙ্গিরা কিন্তু সংগঠন বা নিজেদের কাজের ব্যাপারে অস্বীকার করে না। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।’

সূত্র জানায়, এরই মধ্যে সিলেটের আনসার আল ইসলামের জঙ্গিদের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সূত্রে ফয়জুরের সংশ্লিষ্টতা যাচাই শুরু হয়েছে। ফয়জুল যেভাবে হামলা চালাতে গেছে সেভাবে হামলায় বিপদ নিশ্চিত। এখন পর্যন্ত দেশে কোনো ‘স্বতঃপ্রণোদিত জঙ্গি’ এভাবে আত্মঘাতী হামলা চালায়নি। প্রতিটি আত্মঘাতী হামলা সংগঠিত এবং প্রশিক্ষিত দল করেছে। ফয়জুরের লক্ষ্য ছিল ড. জাফর ইকবালকে হত্যা করা। সে বেপরোয়া কুপিয়ে জখম করলেও সৌভাগ্যক্রমে জাফর ইকবালের আঘাতগুলো গুরুতর হয়নি। বিষয়টি প্রথমে সন্দেহের তৈরি করে। পরে তথ্য মিলেছে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই ফয়জুর অধ্যাপক জাফর ইকবালকে আঘাত করার প্রাণান্ত চেষ্টা চালায়। 

সূত্র মতে, ফয়জুরের দুই প্রবাসী চাচা তাকে সালাফি মতাদর্শী উগ্রপন্থী করে তোলে। এরপর পারিবারিকভাবে সে মতে বিশ্বাসী হয় ফয়জুর। সে শীর্ষ জঙ্গিদের মতোই একা একা চলত এবং ভিন্ন তরিকায় একা নামাজ পড়ত। এতে ধারণা করা হচ্ছে, জঙ্গি হওয়ার সব ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে ছিল ফয়জুর। এরপর তাকে কোনো সংগঠন বা জঙ্গি দল হামলায় উদ্বুদ্ধ করে তোলে। এ ক্ষেত্রে আনসার আল ইসলামকে সন্দেহ করা হলেও গতকাল পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো সূত্র মেলেনি।

ফয়জুরের মা-বাবার আত্মসমর্পণ : জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ফয়জুর হাসান ওরফে ফয়জুলের মা-বাবা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। গত রবিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে ফয়জুরের বাবা মাওলানা আতিকুর রহমান ও মা মিনারা বেগম জালালাবাদ থানায় এসে আত্মসমর্পণ করেন। বর্তমানে তাঁরা পুলিশ হেফাজতে। সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মুহাম্মদ আব্দুল ওয়াহাব আত্মসমর্পণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এদিকে হামলার ঘটনায় গতকাল আরো একজন আটক হলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।


মন্তব্য