kalerkantho


তাজউদ্দীনের সঙ্গে বিরোধ ছিল না মতভেদ ছিল

শরীফ নুরুল আম্বিয়া

৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



তাজউদ্দীনের সঙ্গে বিরোধ ছিল না মতভেদ ছিল

একটি ‘ওয়ার কাউন্সিল’ গঠন করে যুদ্ধ পরিচালনা এবং এর সঙ্গে নিউক্লিয়াস-সংশ্লিষ্ট চার নেতা ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে রাখার কথা ছিল। তা না করে প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন চিত্তরঞ্জন সুতারের মাধ্যমে; কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ সরাসরি যোগাযোগ করেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। এসব বিষয় নিয়ে মুজিব বাহিনীর নেতাদের সঙ্গে শুরুর দিকে কিছু মতপার্থক্য দেখা দেয়, পরে অবশ্য সেটা আর থাকেনি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ, ‘অ্যান কনভেনশনাল ওয়ার’, সে কারণে ওয়ার কাউন্সিল গঠনের কথা উঠেছিল। হয়তো ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচিত সরকার পরিচালিত যুদ্ধ পদ্ধতিই পছন্দ করেছিলেন। এ ছাড়া সে সময় তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃত সেকেন্ডম্যান। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত প্রবাসী সরকারকে সহযোগিতা দেওয়া ইন্দিরা গান্ধীর জন্যও সহজ ছিল।

তবে বঙ্গবন্ধু জাতিকে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন ১৯৬২ সালে। প্রথমে ছাত্রলীগ, তারপর আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলোর কেন্দ্র থেকে জেলা-থানা পর্যায়ে, ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বাধীনতার ধারণা প্রচার করতে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়াস গঠিত হয়। নিউক্লিয়াসের মূলে ছিলেন বলতে গেলে সিরাজুল আলম খান। তাঁর সঙ্গে সাংগঠনিক কাজ শুরু করেন আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ ও মনিরুল ইসলাম ওরফে মার্শাল মনি। ফজলুল হক মনি ও তোফায়েল আহমেদরা ছিলেন। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে গঠন করা হয় স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী ছাত্র পরিষদ। আমি এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হই ১৯৬৯ সালে। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের অনেকেই স্বাধীনতার প্রশ্নে এতটা অগ্রসর ছিলেন না, যতটা তরুণ-ছাত্ররা ছিলেন। ছাত্রলীগের অনেকেই নিউক্লিয়াসে ছিলেন না।

একসময় নিউক্লিয়াসের মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায় স্বাধীনতার প্রশ্নে দীক্ষিত কর্মীদের দিয়ে ছাত্রলীগসহ অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি দখল করা। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সে সময় দেখেছি আমাদের মতের বাইরে যারা ছিল তাদের কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারত না। আমাদের সিদ্ধান্তই পাস হতো।

আমরা কলকতায় পৌঁছানোর একদিন পর আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। আমি ও হাসানুল হক ইনু একসঙ্গে ভারতে যাই। রাজ্জাক ভাই জানালেন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হচ্ছে। কদিন পর আমাদের প্রশিক্ষণে নিয়ে যাওয়া হলো শিলিগুড়ি পাঙ্গা ক্যাম্পে। এর মধ্যে কাজী আরেফ আহমেদ চলে এসেছেন। সাত দিন পর বাগডোরা এয়ারবেসে গেলাম সামরিক বিমানে। তারপর শাহরানপুর হয়ে দেরাদুনের মুরতি ক্যাম্পে। মুরতি ক্যাম্প থেকে চাকরাতা ক্যাম্পে।

আমরা প্রথম ব্যাচে প্রশিক্ষণ নিলাম। দেখা গেল প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে ভাষার সমস্যা হচ্ছে। কারণ ভারতীয় সেনারা কথা বলে হিন্দি ভাষায়। এ ছাড়া আমাদের যে গেরিলা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল তা ছিল মূলত পাহাড়-পর্বত উঁচুভূমিতে কিভাবে অপারেশন করা যায় তা রপ্ত করা। কিন্তু আমাদের এলাকার ভূপ্রকৃতি ভিন্ন। এখানে খাল-বিল, নদী-নালা, সমতল ভূমি। এসব বিবেচনা করে আমাদের প্রথম ব্যাচের আটজনকে পরবর্তী ব্যাচগুলোর প্রশিক্ষক হিসেবে রাখা হয়। সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের দায়িত্ব ছিল আমাদের। মাঝে মাঝে মুজিব বাহিনীর চার প্রধানও যেতেন।

আটজনের মধ্যে আমি ছাড়াও ছিলেন হাসানুল হক ইনু, মাহাবুবুল হক, মাসুদ আহমেদ রুমি, তৌফিক আহমেদ, মোহন লাল সোম, সৈয়দ আহমেদ ফারুক ও রফিকুজ্জামান। মুজিব বাহিনীর সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ভারতীয় জেনারেল উবানকে। তিনি ছিলেন গেরিলা যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ।

মুজিব বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল শাহজাহান সিরাজকে। চার নেতা ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ চার সেক্টরে কাজ করতেন।

প্রতিদিন সকালে আমাদের প্রশিক্ষণ শুরু হতো জাতীয়সংগীত পরিবেশন ও বঙ্গবন্ধুর নামে শপথ পরিচালনার মধ্য দিয়ে। সামরিক প্রশিক্ষণের পর রাতে রাজনৈতিক ক্লাস হতো। যোদ্ধাদের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক কিভাবে নিবিড় করা যায়, তার প্রশিক্ষণ হতো। ৯ মাসেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা অনেকেরই ছিল না। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত যোদ্ধার দরকার হবে—এ ধারণা থেকেই মুজিব বাহিনী সৃষ্টি হয়েছিল।

লেখক : একাত্তরে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। ভারতের দেরাদুনে মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষক ছিলেন। বর্তমানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ একাংশের সভাপতি।

অনুলিখন : লায়েকুজ্জামান


মন্তব্য