kalerkantho


থেমে নেই নোংরা অপপ্রচার

গাউস রহমান পিয়াস   

৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



থেমে নেই নোংরা অপপ্রচার

এক যে ছিল ভূতের বাচ্চা, নাম ছিল তার সোলায়মান। দুষ্টু লোকের জম ছিল সে, ভাল লোকের জানের-জান। হঠাৎ করে এল দুষু্ব লোক এক দবির চাচা নামে। খাঁচার ভিতর ভূত ধরে সে, বেচতে চায় অনেক দামে। ভূতের বন্ধু বাচ্চাগুলো ভূতকে জানায় শেষ প্রণাম। সেই থেকে এক গল্পে হলো ভূত-মানুষের অবস্থান। এমন গল্প শোনেনি কেউ, শুনবে না কেউ কোনদিন। তোমাদেরই বলছি কেবল, শুরু করছি এক-দুই-তিন...। তারপর গল্প এগোয়। এক শিশুর কৌতূহলী ডাকে সাড়া দিয়ে আসে ভূতশিশু সোলায়মান। কিন্তু বাড়ির বয়স্ক অতিথি দবির চাচাকে তার পছন্দ হয় না লোকটির খারাপ চরিত্রের কারণে। তাই অদৃশ্য ভূতশিশু তাকে শায়েস্তা করতে থাকে। ‘কেন এমন করছো’ মানবশিশুর এ প্রশ্নে ভূতশিশু বলে, ‘তাহলে ও আমাকে কার্টুন দেখতে দেয় না কেন? আমাকে নিয়ে খারাপ কথা বলে কেন? যারা পচা মানুষ, দুষ্টু মানুষ, খারাপ মানুষ—তাদের আমরা নাক কামড়ে দেই।’

মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁর শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’-এ এভাবেই মানবসমাজের দুষ্ট প্রকৃতির লোকদের বিপরীতে শুভশক্তি হিসেবে দাঁড় করান কাল্পনিক সোলায়মানকে। ২০১৭ সালের বইমেলায় আনা জাগৃতি প্রকাশনীর এ বইয়ে ‘সোলায়মান’ নামটি ব্যবহৃত হওয়ায় মহলবিশেষ ক্ষুব্ধ; তাদের অভিযোগ—লেখক দুরভিসন্ধিবশে নবী সোলায়মান (আ.)-এর নাম ব্যবহার করেছেন গল্পে। তবে শিশুদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় গ্রন্থটি। গল্পটি নিয়ে একই শিরোনামে টেলিফিল্মও তৈরি হয়েছে। এই প্রতিবেদনের শুরুর গানটি সেখান থেকে নেওয়া।

কোনো ধরনের ধর্মীয় চরিত্র, ঘটনা বা বিবরণ না থাকলেও গত বছর বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে শুধু শিরোনামের কারণে মহলবিশেষ প্রতিবাদে নামে এবং লেখককে ‘নাস্তিক’ আখ্যা দেয়। নারায়ণগঞ্জে বিশাল জমায়েতে একটি ধর্মীয় সংগঠন তাদের সমর্থকদের উসকে দেয় জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে। এর ভিডিও গতকাল রবিবারও ফেসবুকে শাইখুল হাদীস মাওলানা মোহাম্মাদ মামুনুল হক সমর্থক নামের পেজে সাত হাজারবার দেখা হয়েছে, শেয়ার করেছে ১৯০ জন। কেউ কেউ কমেন্টে জাফর ইকবালের ফাঁসি দাবি করেছে।

সিলেটে জাফর ইকবালকে হত্যাচেষ্টার খবরে ফেসবুকে অসংখ্য আইডি থেকে হত্যাকে সমর্থন করা হচ্ছে, ব্যবহৃত হচ্ছে অকথ্য ভাষা। এর মধ্যে বেশ কিছু ভুয়া আইডির স্ট্যাটাসে ‘জিহাদ’, ‘কাতল’, ‘দাওলা’, ‘কায়েদা’র মতো শব্দ দেখা যায়। facebook.com/mdjamsed.hossain.146 আইডির ‘এমডি জামশেদ হোসাইনের’ অনুসারী ৩৬ হাজার ৪৮১। তিনি নিজের পরিচয় দিচ্ছেন আরাকান, কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানের সংবাদদাতা হিসেবে। জাফর ইকবালকে হত্যার সমর্থন করে লেখা হয়—‘মেনশন করুন সেইসব কুলাঙ্গার গণতান্ত্রিক ভ্রান্ত ইসলামী দলের কর্মীদের, যাহারা জাফর...(অকথ্য শব্দ) পক্ষ নিয়ে হামলাকারী মুমিন মুসলিমের শাস্তি কামনা করেছে। অনেক কওমী ও মডারেট জামায়াতী নিন্দা লজ্জিত বলে শত শত পোস্ট প্রসব করেছে, এসব পোস্টকারী আদৌ মুসলমান কি না আমার সন্দেহ। কারণ রাসূল (সাঃ)-কে অপমানকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে শরীয়তের হুকুম হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া।’

নাসীম ওমর আইডি থেকে লেখা হয়, ‘কত্ত...দিন হয় আনন্দে কাঁদি না। তুই কাঁদিয়েছিস। জাযাকাল্লাহ! তোর কপুলে ভালবাসার চুমু রইল। যা হয়েছে তাতেই খুশী। আরেকটু ভাল হলে ভাল হতো।’ কল্লোল সুবাস আইডি থেকে মন্তব্য করা হয়, ‘চাপাতি হাতে যেগেই যারা নাস্তিক শাতিমের খুন ঝরালো। চাপাতি ওয়ালাদেরকে হাজার সালাম।’ নাসীম ওমর ‘জাযাকাল্লাহ’ জবাব দিলে ‘কল্লোল সুবাস’ লেখেন ‘আফওয়ান ইয়া আখি’। আইডির সংক্ষিপ্ত ইউআরএল : http://bit.ly/2CXlNju।

‘জিহাদের ময়দানে আসো’ আইডির অধিকারী লেখেন, ‘জাফরকে উন্নত চিকিৎসা দেয়া হলেও মুজাহিদ ভাইকে কোনো ভাল চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না। সবাই মুজাহিদ ভাইয়ের জন্য দোআ করবেন। তারিক বিন জিয়াদের উত্তরসূরি হিসেবে আল্লাহ তাকে কবুল করুক। ইসলামের শত্রর কোনো স্থান মুসলিম দেশে হবে না। এবার জাফর ইকবাল বেঁচে গেলেও হামলা অব্যাহত থাকবে।’ পৃথক স্ট্যাটাসে আইডির অধিকারী নিজেকে ‘দাউলা’ তথা ইসলামিক স্টেটের ‘সমর্থক’ দাবি করেছেন। তাঁর সংক্ষেপিত আইডি : http://bit.ly/2tihEHj।

কওমী সমাচার আইডি (bit.ly/2Fd8aTi) থেকে লেখা হয়, ‘হে মুজাহিদ ভাইরা সবাই আজকে তাহাজ্জুদ পরে আল্লাহর কাছে দুয়া করো যেন নাস্তিক ইকবাল মারা যায়। কে কে করবে?’

অনেক আলেম হামলার নিন্দা করে ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এর সমালোচনায় Abu Abdullah AL Faysal আইডি থেকে লেখা হয় : ‘এই ধরনের কাঠ মোল্লারা জিহাদকে সন্ত্রাসবাদ আক্ষা দিয়েছে। এরাই মানুষকে জিহাদের বিরুদ্ধে অবস্থান দিতে উদ্ভুধ্য করছে। আগে বাংলার বুক থেকে এই ধরনের নামধারী মুনাফিক মোল্লাদের জবাই করতে হবে। এরা শুধু মুরগীর রান খাওয়ার জন্য মোল্লা হইছে।’

জঙ্গিগোষ্ঠী আনসার আল ইসলামের লোগো প্রফাইল ছবি করা হয়েছে ‘দ্বীন কায়েমের সঠিক পথ’ আইডিতে (bit.ly/2FQlJVx)। তার স্ট্যাটাসে লেখা হয়, ‘হে আল্লাহ! তুমি আশঙ্কামুক্তকে (জাফর ইকবাল) আশঙ্কাযুক্ত করে দাও! শয়তানটা যেন এই হামলায়ই শেষ হয়ে যায়। আর হামলাকারী ভাইকে জালিমের হাত থেকে মুক্ত কর।’

অনেকে খুব সম্ভবত আসল পরিচয়ে খোলা ফেসবুক অ্যাকাউন্টে অধ্যাপক জাফর ইকবালের বিষোদ্গার করছেন। সিলেট থেকে ‘হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ খাব্বাব’ পরিচয়ে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা একজন একটি পুরনো ছবি পোস্ট করেছেন। এতে দেখা যায়, কোনো একটি ইসলামী দলের এক দল নেতা সড়কে ‘কুলাঙ্গার জাফর ইকবাল সিলেট ছাড়’ লেখা স্লোগান সামনে রেখে মানববন্ধন করছেন।


মন্তব্য

Durjoy commented 17 days ago
যেটা নিয়ে বিতর্ক হবে বা হতে পারে এমন কাজ না করলেই তো হয়। আর লেখক যদি নিজের ভুলবশতঃ বা বেখেয়ালে করে থাকেন, তার উচিত ছিল ক্ষমা চেয়ে পরবর্তী সংস্করণ বের করে পরিবর্তন আনা। পা চাটা কিছু সংবাদ মাধ্যমের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। এসব নির্লজ্জ পা চাটা বন্ধ করে আসল সংবাদ পরিবেশন করুন।