kalerkantho


নিরাপত্তায় ছিল ‘আনাড়ি পুলিশিং’

♦ কনস্টেবল ইব্রাহিম সাহসী ভূমিকা রাখলেও দুজন মগ্ন ছিলেন মোবাইল ফোনে
♦ ঘটনাস্থলে কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখা যায়নি

এস এম আজাদ   

৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



নিরাপত্তায় ছিল ‘আনাড়ি পুলিশিং’

শাবিতে শনিবারের অনুষ্ঠানে অধ্যাপক জাফর ইকবালের নিরাপত্তার সেই ছবি : ১. আবির (শিক্ষার্থী) ২. পুলিশ ৩. পুলিশ ৪. পুলিশ ৫. শিক্ষার্থী ৬. বহিরাগত ৭. শিক্ষার্থী ৮. রাহি (শিক্ষার্থী) ৯. রাশেদ (শিক্ষার্থী) ১০. শাহরিয়ার (শিক্ষার্থী) ১১. নিশাত (শিক্ষার্থী) ও ১২. রাইয়ান (শিক্ষার্থী)। মাঝে হামলাকারী ফয়জুর (গোল চিহ্নিত)। ছবি : কালের কণ্ঠ

সামনে অনুষ্ঠান চলছে। দর্শকসারিতে সোফায় বসে কয়েকজন অতিথি। তাঁদের মধ্যে একজন বরেণ্য শিক্ষাবিদ, লেখক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। উগ্রপন্থীদের হুমকির কারণে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা থাকায় সঙ্গে থাকে পুলিশ। তবে গত শনিবারের অনুষ্ঠানে তিন পুলিশ সদস্যকে দেখা যায় জাফর ইকবালের কাছ থেকে বেশ কিছুটা দূরে। তাঁদের মধ্যে দুজন হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে ইন্টারনেটে ফেসবুক বা তেমন কিছুতে ব্যস্ত। আরেকজন অনুষ্ঠানের দিকে তাকিয়ে। অন্যদিকে জাফর ইকবালের ঠিক পেছনেই দাঁড়ানো সাত যুবক, যাদের মধ্যে চারজনের নজর এই শিক্ষকের দিকে। আবার দু-তিনজনের বেশভূষা দেখে বহিরাগত বলেই মনে হয়। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত শনিবার বিকেলে ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলার আগ মুহূর্তে তোলা একটি ছবি থেকে এমন চিত্র দেখা গেছে। জাফর ইকবালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা ওই যুবকদের কাউকে সন্দেহ বা চ্যালেঞ্জ করেননি।

ওই ছবিটি ধারণ করার পর ড. জাফর ইকবালের ঠিক পেছনে ধারালো অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবক আঘাত করে তাঁকে। পাশের দু-তিনজনকেও হামলাকারীর সহযোগী বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ছবিতে এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের চরম উদাসীনতা ও অদক্ষতার প্রমাণ মিলেছে। পুলিশের গোয়েন্দা শাখার একাধিক কর্মকর্তাও বলেছেন, কোনো ব্যক্তির নিরাপত্তা দিতে পুলিশের কিছু সাধারণ নির্দেশনা আছে। শনিবার জাফর ইকবালের সঙ্গে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা এর সামান্যও পালন করেননি।

জানা গেছে, নিরাপত্তাবিষয়ক ব্রিফিং বা নির্দেশনা ছাড়াই পুলিশ কনস্টেবলদের দিয়ে ড. জাফর ইকবালের প্রথম স্তরের নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছিল। দ্বিতীয় স্তরে পুলিশের এসআই ও এএসআই পর্যায়ের কর্মকর্তারা থাকেন। এমন কোনো কর্মকর্তাকে শনিবার জাফর ইকবালের কাছাকাছি দেখা যায়নি। পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করার কারণে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা জাফর ইকবালের নিরাপত্তার গুরুত্ব এবং তথ্য সম্পর্কে সঠিকভাবে অবহিত ছিলেন না বলেও একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, ড. জাফর ইকবালের নিরাপত্তায় তাঁদের ২৩ সদস্যের একটি দল কাজ করছিল! হামলার পর একজন এএসআইসহ সদস্যরা তাঁদের গাড়িতে করেই এ শিক্ষককে হাসপাতালে নিয়ে যান। পুলিশ কনস্টেবলদের চেষ্টার কারণেই হামলাকারী ধরা পড়েছে। এর পরও নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নিরাপত্তায় ত্রুটি ছিল না বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানও। গতকাল রবিবার রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘জাফর ইকবালের নিরাপত্তায় কোনো ত্রুটি ছিল না। ত্রুটি থাকলে হামলাকারী ধরা পড়ত না।’

এসএমপি সূত্রে জানা যায়, ছবিতে যে তিন কনস্টেবলকে দেখা যাচ্ছে, তাঁরা হলেন ইব্রাহিম, সুমন সূত্রধর ও নূরুল। ইব্রাহিম ছিলেন জাফর ইকবালের কিছুটা কাছাকাছি। হামলা শুরু হলেই তিনি টের পেয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। এতে তিনি আহতও হন। তাঁর প্রতিরোধের মুখে হামলাকারী ফয়জুল ধরা পড়ে। তবে সুমন সূত্রধর ও নূরুল মোবাইল ফোনে মগ্ন ছিলেন।

ছবিতে জাফর ইকবালের পাশে কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে দেখা যায়। তাঁর পেছনেই হামলাকারী ফয়জুলসহ সাত যুবক দাঁড়িয়েছিল। ফয়জুলের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবককে প্রথমে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার সদস্য বলে ধারণা করা হয়। তবে পরে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সে পুলিশের সদস্য নয়। ওই যুবককে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ চেনে না। তার পাশের আরো দুই যুবক এবং দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক তরুণও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয় বলে ধারণা সংশ্লিষ্ট অনেকের।

পেছনে দাঁড়ানো সন্দেহভাজন যুবক-তরুণদের মধ্যে আকাশি রঙের শার্ট পরা যুবক বহিরাগত বলে শনাক্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। হামলাকারী ফয়জুল ও বহিরাগত ওই যুবকের পাশে গোলাপি গেঞ্জি পরা সন্দেহভাজন তরুণকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে গতকাল পর্যন্ত তার পরিচয় পাওয়া যায়নি। তার পাশের জনও অচেনা। এদের সঙ্গে ড. জাফর ইকবালের ঠিক পেছনেই ফুডকোর্টের কর্মী রাহি আহমেদ। তার পাশে ড. জাফর ইকবালের বিভাগেরই ছাত্র রাশেদ আব্দুল্লাহ, শাহরিয়ার তানভীর, রিসাত তাসনিম মিতু ও রাইয়ান শোভন। একটু দূরে একই বিভাগের ছাত্র অনিক দাশ দাঁড়িয়ে, যার পাশে অপরিচিত এক তরুণ।

গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ছবিতে তিনজন পুলিশ কনস্টেবলকে নিরাপত্তার বিষয়ে আনাড়ি মনে হচ্ছে। কোনো ব্যক্তির নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে একাধিক সদস্য থাকলে সাধারণ নির্দেশনা থাকে—দুই দলে ভাগ হয়ে এক দল ব্যক্তির দিকে নজর রাখবে এবং অন্য দল পরিবেশ-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। এখানে সদস্যরা জাফর স্যারের কাছ থেকে দূরে সরে দাঁড়িয়েছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘কয়েকজন সন্দেহভাজন পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। হামলাকারীসহ কয়েকজনের চেহারা ছাত্রের মতো নয়। পুলিশ সদস্যদের উচিত ছিল ওদের সরিয়ে দেওয়া। ছাত্র কি না, সেটাও চ্যালেঞ্জ করা উচিত ছিল। তিনজন কনস্টেবল থাকলে সেখানে একজন অফিসার থাকার কথা। সেই অফিসার কোথায় ছিলেন, ছবিতে তা পরিষ্কার নয়।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘নিরাপত্তার কমন রুল হলো দুই দিকে নজর রাখা। কোনো সভা বা ভিভিআইপিদের ক্ষেত্রে এমনটি দেখবেন। এক দল অতিথির দিকে ফিরেই দাঁড়িয়ে থাকবে। অন্য দল দর্শক বা আশপাশ দেখবে। এখানে ব্রিফিংয়ের সমস্যা আছে কি না, খতিয়ে দেখা উচিত।’

নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে এসএমপির উপকমিশনার (সদর দপ্তর) রেজাউল করিম বলেন, ‘এসএমপি থেকে ফোর্স দেওয়া হয়।’ কারা কিভাবে দায়িত্ব পালন করছেন—জানতে চাইলে তিনি জবাব না দিয়ে মিডিয়া শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আব্দুল ওহাব মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কথামতো যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কনস্টেবল ইব্রাহিম ও সুমন আহত হয়েছেন। তাঁরাই হামলাকারীকে ধরেছেন। এর বেশি তথ্য চাইলে এসএমপি কমিশনারের সঙ্গেই কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

এসএমপি কমিশনার গোলাম কিবরিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই জাফর ইকবাল স্যারের নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। ২৩ জন এই টিমে আছে। ঘটনার সময় তিন কনস্টেবলই শুধু নয়, সেখানে গাড়িসহ একজন এএসআই ছিল। ওই গাড়িতেই উনাকে (জাফর ইকবাল) হাসপাতালে নেওয়া হয়।’ নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে কি না বা তদন্ত কমিটি করা হয়েছে কি না—জানতে চাইলে এসএমপি কমিশনার বলেন, ‘একটি কমিটি করা হয়েছে। কোনো ঘাটতি আছে কি না, তা দেখা হবে। তবে আমাদের দিক থেকে নিরাপত্তা জোরদারই ছিল।’

২০১৫ সালের ১২ মে অনন্ত বিজয় দাস হত্যার পর বিচার দাবিতে সক্রিয় ছিলেন ড. জাফর ইকবাল। এর আগে ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যার পর এবিটির হত্যার হিটলিস্টে তাঁর নাম পাওয়া যায়। ২০১৬ সালের অক্টোবরে এবিটির পরিচয়ে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে হত্যার হুমকির পর জালালাবাদ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন জাফর ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী। ২০১৬ সালের ৩০ এপ্রিল থেকেই জাফর ইকবালের নিরাপত্তায় পুলিশ প্রহরা দিয়ে আসছে সরকার।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র মতে, দিনে দুজন এবং রাতে তিনজন সশস্ত্র পুলিশ সব সময় জাফর ইকবালের নিরাপত্তায় ছিল। একেক সময় একেকজন দায়িত্ব পালন করত।



মন্তব্য