kalerkantho


মুসলিম লীগ নেতাকে ভারতীয় জেনারেল বললেন ‘আমাদের লোক’

হায়দার আকবর খান রনো   

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মুসলিম লীগ নেতাকে ভারতীয় জেনারেল বললেন ‘আমাদের লোক’

অবাক হচ্ছিলাম। সিলেটের মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী, আইয়ুব খানের ঘনিষ্ঠ। কনভেনশন মুসলিম লীগের এমএনএ ছিলেন। শিলংয়ে তাঁকে দেখিয়ে এক ভারতীয় জেনারেল বললেন, ‘হি ইজ আওয়ার ম্যান, অ্যান্ড হি ওয়াজ অলওয়েজ আওয়ার ম্যান।’

আগস্ট মাস। ১৯৭১। আগরতলা সিপিএম অফিস থেকে বের হতেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক গোয়েন্দা সামনে এসে দাঁড়ালেন। বাঙালি কর্মকর্তা। সোজা বলে ফেললেন, ‘আমার সঙ্গে শিলং যেতে হবে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কথা বলবেন।’ সঙ্গে কাজী জাফর আহমেদ। আমরা ছিলাম ত্রিপুরায়। শিলং পৌঁছলাম দু-দিন পর। কাজী জাফর ও আমাকে কখনো আলাদা করে, কখনো একসাথে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন এক ভারতীয় জেনারেল। নামটা মনে করতে পারছি না। অনেক কথা, অনেক প্রশ্ন। প্রধান আপত্তি—আমাদের চীনপন্থী-বিপজ্জক হিসেবে ধরা হয়েছে। দীর্ঘ কথা বলে জেনারেল উপলব্ধি করতে পারলেন, কেবল মুক্তিযুদ্ধই আমাদের তখনকার চিন্তা। তাঁর মনোভাব পাল্টে গেল।

একটা ঘটনার কথা বলি। আমাদের সঙ্গে আলোচনার শেষ দিকে জেনারেল জানতে চাইলেন, মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী নামের কাউকে চিনি কি না? তাঁকে আমরা  চিনি, অন্য কারণে; আমাদের এক সহকর্মী রেজা আলীর মামা তিনি। জেনারেলকে বললাম, ‘তিনি তো আইয়ুব খানের লোক। মুসলিম লীগের এমএনএ।’ জেনারেল হেসে জবাব দিলেন, তিনি এখনো তাঁদের লোক, আগেও ছিলেন। অবাক হওয়ার মতো ঘটনা। মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরীও ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, তাঁর মুসলিম লীগ করা ছিল পাকিস্তানিদের সঙ্গে ক্যামোফ্লেজ। আসলে তিনি মুক্তিযুদ্ধের এ দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন। জেনারেল বললেন, তাঁর সঙ্গে আলাপ করুন, তিনি আপনাদের কিছু সমাধান দিতে পারেন। চৌধুরী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দিল্লি যাচ্ছেন, ফেরার পর যোগাযোগ করতে বললেন। তবে আমরা আর যোগাযোগ করিনি।

মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরীকে দেখে ১৯৬২ সালের একটি গুজবের কথা মনে পড়ল। সে সময়ে গুজব রটেছিল, শেখ মুজিব সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতের ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় গিয়েছেন; গভীর রাতে মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী তাঁকে সীমান্ত পার করে দেন। শেখ মুজিবকে গাড়ি চালিয়ে নিয়েছিলেন রেজা আলী।

কলকাতার বেলেঘাটে আমরা আমাদের পার্টি ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলার সমন্বয় কমিটি’ ও ভাসানী ন্যাপের নেতাদের নিয়ে একটি সভা করি। কমরেড বরদা চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আমি ‘জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’ নামের একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করি। কমিটির সভাপতি করা হয় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে। কাজী জাফর আহমেদ, রাশেদ খান মেননসহ আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন। এ সভার পর তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করে আমরা প্রবাসী সরকারকে সমর্থনের কথা জানাই।

এর মধ্যে একদিন দেখা খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে। তিনি আমাদের ‘বাবা’ বলে ডাকতেন। বললেন, ‘তোমরা বাবা কমিউনিস্ট। আমি ডেমোক্র্যাট। আদর্শগতভাবে, অ্যাজ এ ডেমোক্র্যাট আই ক্যান নট সিট অ্যাক্রস দ্য টেবিল উইথ দ্য কমিউনিস্ট।’ তিনি বললেন, ‘আমি পাকিস্তানের জন্য লড়েছি। আমি পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী, সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী নই।’ একটু থেমে আরো বললেন, ‘আওয়ামী লীগের কোন ঘোষণায় স্বাধীন বাংলার কথা বলা আছে? সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলা আছে?’

৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনি। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম—এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে পুরো ময়দান স্লোগানে মুখরিত হয়ে গেল। পরে কী বললেন, তা আর শুনতে পেলাম না। ২৫ মার্চ পল্টনে আমরা শেষ জনসভা করি। আমরা বলেছিলাম—ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হতে বাধ্য, আসুন সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ধরি।

২৭ মার্চ কারফিউ শিথিল হলে জহির রায়হানের গাড়িতে করে আমি, রাশেদ খান মেনন, আমার ছোট ভাই হায়দার আনোয়ার খান ঝুনুসহ নরসিংদীর শিবপুরে যাই। জহির রায়হান ৭০০ টাকা এবং এক কার্টন সিগারেট দিয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসই জহির রায়হানের গাড়িটি শিবপুরে ছিল। আবদুল মান্নান ভুঁইয়া আগেই শিবপুরে যুদ্ধের বাস্তব প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে কাজী জাফর, তাঁর স্ত্রী-কন্যা, রাশেদ খান মেননসহ ফেনীর বিলোনিয়া হয়ে আগরতলা যাই।

ভারত সরকার আমাদের কোনো প্রশিক্ষণ দেয়নি। অস্ত্র দেয়নি। বরং আমাদের অনেক কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে, নাজেহাল করেছে। আমাদের সহযোগিতা করেছে সিপিএম। তারা বলেছে, অস্ত্র বাদে সব দিতে পারব। জ্যোতি বসু, কমরেড প্রমোদ দাসগুপ্ত ও কমরেড মোজাফফর আহমেদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, কথা হয়েছে। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে সিপিএম। আমরা নিজেরাই অস্ত্র জোগাড় করে যুদ্ধ করেছি।

আমাদের যুদ্ধের হেডকোয়ার্টার ছিল নরসিংদীর শিবপুরে। সাবহেডকোয়ার্টার ছিল ভারতের কলকাতা ও আগরতলা। শিবপুরের দায়িত্ব পালন করেছেন আবদুল মান্নান ভুঁইয়া। কলকাতায় রাশেদ খান মেনন, আগরতলায় আমি ও কাজী জাফর। দেশের ভেতরে আমাদের ১৪টি ঘাঁটি ছিল। এগুলোতে হায়দার আনোয়ার খান ঝুনু, মোস্তফা জামাল হায়দারসহ অন্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের বেশ কয়েকজন সেক্টর কমান্ডার গোপনে আমাদের অস্ত্র দিয়েছেন; তাঁদের মধ্যে আছেন নুরুজ্জামান, আবুল মনজুর ও মেজর জিয়া। অনেক সেক্টরে মুক্তিবাহিনী হিসেবে আমাদের লোকদের যুদ্ধ করার সুযোগ দিয়েছেন সেক্টর কমান্ডাররা। সেক্টর কমান্ডারদের সঙ্গে এ সমন্বয় করতেন জেনারেল মনজুরের ভাই ব্যারিস্টার আবুল মুনসুর।

লেখক : পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। প্রখ্যাত বামপন্থী নেতা, কলামিস্ট। বর্তমানে সিপিবির সঙ্গে জড়িত।

অনুলিখন : লায়েকুজ্জামান

 



মন্তব্য