kalerkantho


মোশতাককে প্লেন থেকে নামিয়ে আনা হয়েছিল

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মোশতাককে প্লেন থেকে নামিয়ে আনা হয়েছিল

মার্চের শুরু থেকেই আমরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ‘ডামি’ রাইফেল নিয়ে যুদ্ধের বাস্তব মহড়া দিই। সেই রাইফেল কাঁধে আমরা ঢাকা শহরেও মহড়া দিলাম। ২৫ মার্চ রাতে আমরা রাজধানীর নবাবপুর রোডসহ বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধে অবস্থান নিই। পরে অবশ্য বুঝি এ ধরনের প্রস্তুতি একেবারেই কাঁচা। দুই দিন পর আমরা কয়েকজন চলে যাই ঢাকার অদূরে মেরাদিয়া গ্রামে। সেখান থেকে আগরতলা।

আমরা আগরতলা গিয়ে একটি ক্যাম্প স্থাপন করেছিলাম। ধীরে ধীরে সেখানে আমাদের সমমনারা যোগ হতে থাকে। মে মাসে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠন করে। ভারত সরকার বামপন্থীদের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রের জোগান অনুমোদন দিলেও বিশ্ব পরিস্থিতির নানা দিক বিবেচনা করে বিষয়টি গোপন রাখে।

মে মাসের ৩ তারিখে কমিউনিস্ট পার্টি দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ঘটনা উল্লেখ করে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে চিঠি দেয়। এরপর দেখা যায়, ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্ক আরো গভীর হতে থাকে, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য খুবই ইতিবাচক ঘটনা। মে মাসের ২০ তারিখে আসামের তেজপুরের কাছাকাছি সলোনবাড়িতে আমাদের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ দিতে বিশেষ ক্যাম্প খোলা হয়। প্রথম ব্যাচে ২০০ জনকে প্রশিক্ষণের জন্য নেওয়া হয়। প্রথম ব্যাচের একজন আমি। চার সপ্তাহ পরে এদের মধ্য থেকে ৫০ জনকে উচ্চতর বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে নেওয়া হয় নেফা এলাকার ভালুকপংয়ের একটি দুর্গম ক্যাম্পে। ১১ জুলাই আমাদের প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ শেষ হয়। প্রশিক্ষণ থেকে ফিরে আমরা ত্রিপুরার বাইকোরার একটি নির্জন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা পাঠানো শুরু করি। পরে যুদ্ধের গতি ও তীব্রতা বাড়তে থাকলে আমরা শুধু গেরিলা যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকিনি, নিয়মিত যুদ্ধেও অংশ নিই।

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হতে থাকে আওয়ামী লীগের গঠিত প্রবাসী সরকারের অধীনে। সেখানে ন্যাপ  বা কমিউনিস্ট পার্টির কোনো স্থান ছিল না। বামপন্থীদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে আওয়ামী লীগের একাংশে ভিন্নমত ছিল। তবে সেসব ঝামেলা মিটে যায় অক্টোবর মাসে ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়ন একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়ার পর। এরপর সমন্বয়ের সমস্যা হয়নি।

আমরা ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ নিই। পার্টির পক্ষ থেকে প্রবাসী সরকার ও সেক্টর কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করা হয়। এ সময়ে আমাদের অনেকে এফএফ-এ (মুক্তি বাহিনীতে) যোগ দেন। আমরা যুদ্ধকালীন একটি ‘জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট বা ‘সর্বদলীয় সরকার’ গঠনের আহ্বান জানাই। তবে তা গ্রহণ করা হয়নি। পরে অবশ্য প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীতে বামপন্থীদের তিন নেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদকে নেওয়া হয়।

এদিকে আওয়ামী লীগের ভেতরেও নানা ধরনের উপদলের সৃষ্টি হলো। মুজিব বাহিনীর লোকেরাও প্রবাসী সরকারের বিরোধিতা করতে থাকে। এমনকি ভারতের মাটিতে বসেও ভয়ংকর ষড়যন্ত্র করা হচ্ছিল। এসব ঝামেলার সমাধান করতে প্রবাসী সরকারের বহু বেগ পেতে হয়।

খন্দকার মোশতাকরা রীতিমতো স্বাধীনতার বিরোধী ছিল। কিভাবে মুক্তিযুদ্ধ না করে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করা যায় সেই ষড়যন্ত্র নিয়ে ব্যস্ত ছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মোশতাক জাতিসংঘে গিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশনের প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে প্রবাসী সরকার বিষয়টি জেনে যাওয়ার কারণে মোশতাক জাতিসংঘে যেতে পারেনি, তাকে প্লেন থেকে নামিয়ে আনা হয়। পরে অবশ্য তাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। মোশতাক খুবই সেনসেটিভ একটি বিষয় নিয়ে প্রচারপত্রও বিলি করে। সেখানে প্রশ্ন করা হয়, ‘স্বাধীনতা না শেখ মুজিব?’ এতে বলা হয়, ‘তাজউদ্দীন আহমদ চান না বঙ্গবন্ধু ফিরে আসুক, সেই কারণে তিনি স্বাধীনতা নিয়ে একগুঁয়েমি শুরু করেছেন। পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন হলে তবেই আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধুকে আমরা ফিরে পাব।’

বাস্তবতা হলো, মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধে গেছে। বঙ্গবন্ধুর জীবননাশের যেকোনো খবর যোদ্ধাদের হতোদ্যম করতে পারে, এ জন্য মোশতাক এটা ব্যবহার করে। তবে প্রবাসী সরকারের নেতারা বিশেষ করে তাজউদ্দীন আহমদ দক্ষতার সঙ্গে ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেছেন।

(লেখক : ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। যুদ্ধকালীন একটি গেরিলা ইউনিটের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি। অনুলিখন : লায়েকুজ্জামান)


মন্তব্য