kalerkantho


পিস্তল উঁচিয়ে বললাম—‘আগে মুজিব ভাইয়ের খবর দেন’

আ স ম আবদুর রব

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পিস্তল উঁচিয়ে বললাম—‘আগে মুজিব ভাইয়ের খবর দেন’

এপ্রিল মাসের শেষ দিকে ফেনী সীমান্তের বিলোনিয়া হয়ে আগরতলা পৌঁছি। আমার সঙ্গে ছিলেন আখতারউজ্জামান ও চন্দন পোদ্দার। আগরতলা পৌঁছতেই খবর পেলাম—কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের কয়েকজন এমপিএ-এমএনএ মিলে ওকে হোটেলে বসে সরকার গঠন করার দরবার করছেন। খবরটা আমাকে দিলেন ভারতের যুগান্তর পত্রিকার সাংবাদিক অনীল ভট্টাচার্য। তিনি বললেন, ‘দেখুন, ইতিমধ্যে একটি প্রবাসী সরকার গঠিত হয়েছে, এখন আরেকটি সরকার গঠন করা হলে তো মানুষ বিভ্রান্ত হবে।’ আমার আগরতলা পৌঁছার খবর ওকে হোটেলে থাকা নেতারাও পেয়ে গিয়েছিলেন এবং আমাকে তাঁরা সেখানে যাওয়ার জন্য লোক পাঠালেন। ওকে হোটেলে গিয়ে দেখি লবিতে অনেক লোক। তাদের মধ্যে বেশির ভাগ পরিচিত—কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম এলাকার এমপিএ-এমএনএরাও আছেন। তাঁদের কথা শোনার আগেই পকেট থেকে পিস্তল বের করে উঁচিয়ে ধরে চিৎকার করে বললাম—আগে বলেন, মুজিব ভাই কোথায় আছেন, তিনি জীবিত কি মৃত? তারপর সরকার গঠনের কথা ভাবুন। সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেল। তারপর বললাম, একটি সরকার গঠিত হয়েছে; একাধিক সরকার গঠন করলে আন্তর্জাতিক দুনিয়া ও দেশের মানুষের কাছে ভুল সংবাদ যাবে, এটা করা যাবে না। আগরতলায় সরকার গঠন বন্ধ হয়ে গেল।

ছাত্রলীগের বেশির ভাগ নেতাকর্মী তখন কলকাতায়। এ সময় আওয়ামী লীগের অনেক সিনিয়র নেতার মধ্যেই যুদ্ধ সম্পর্কে অনীহা দেখা দেয়। কেউ নিষ্ক্রিয় হয়ে যান, অনেকে দেশে ফিরে আসারও চিন্তা করতে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটা জনযুদ্ধ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল হলো ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধ। এখানে শুধু অস্ত্রে-অস্ত্রে যুদ্ধ হলে আমরা জনসম্পৃক্ততা হারাতে পারি—সেটা চিন্তা করে যুদ্ধের সঙ্গে জনতার সম্পর্ক নিবিড় করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এটা করতে হলে শিক্ষিত একটি যোদ্ধা বাহিনীর দরকার। এ ছাড়া যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রাজনৈতিকভাবে প্রশিক্ষিত যোদ্ধা ছাড়া টিকে থাকা দুরূহ হতে পারে—এমন ভাবনা থেকে ছাত্রকর্মীদের নিয়ে মুজিব বাহিনী গঠন করা হয়। অবশ্য ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে এ চিন্তা শুরু হয় ১৯৬২ সালে নিউক্লিয়াস গঠনের মাধ্যমে। এ চিন্তার অগ্রসেনা ছিলেন সিরাজুল আলম খান। শুরুতে এটার নাম ছিল বিএলএফ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স)।

মুজিব বাহিনীর চার প্রধান ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। যুদ্ধ কৌশল হিসেবে চারটি সেক্টরে এলাকা ভাগ করা হয়। মুজিব বাহিনীর এ চার অধিনায়কের সঙ্গে দায়িত্বে ছিলেন এক বা একাধিক সহ-অধিনায়ক।

প্রথম অঞ্চল ছিল ঢাকা, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল। হেডকোয়ার্টার শিলিগুড়ি। অধিনায়ক ছিলেন সিরাজুল আলম খান। এ অঞ্চলে সহ-অধিনায়ক ছিলেন মনিরুল ইসলাম (মার্শাল মনি)।

দ্বিতীয় অঞ্চল ছিল চট্টগ্রাম বিভাগ। হেডকোয়ার্টার আগরতলা। অধিনায়ক ছিলেন ফজলুল হক মণি। এ অঞ্চলের সহ-অধিনায়ক ছিলাম আমি ও আবদুল কুদ্দুস মাখন।

তৃতীয় অঞ্চল ছিল রাজশাহী-সিরাজগঞ্জ। হেডকোয়ার্টার ব্যারাকপুর। অধিনায়ক ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। এখানে সহ-অধিনায়ক ছিলেন সৈয়দ আহমেদ।

চতুর্থ অঞ্চল ছিল ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা ও খুলনা বিভাগ। হেডকোয়ার্টার ব্যারাকপুর। অধিনায়ক তোফায়েল আহমেদ। সহ-অধিনায়ক ছিলেন নূরে আলম জিকু। সার্বিকভাবে মুজিব বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় জেনারেল সুজন সিং উবান।

মুজিব বাহিনীকে শুধু সমরাস্ত্র প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। এই বাহিনী গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি রাজনৈতিক যুদ্ধেও জয়লাভের প্রশিক্ষণ নেওয়া। সে জন্য রাজনৈতিক মোটিভিশন দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। বিভিন্ন দেশের গেরিলা যুদ্ধের সিনেমা দেখানো হতো। আগেই বলেছি, এ যুদ্ধ শুধু ৯ মাসের যুদ্ধ ছিল না। হঠাৎ করে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়নি। এ যুদ্ধের পেছনে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম ও জীবনদানের ঘটনা আছে। ইতিহাসের অনেক বাঁক ঘুরে এ যুদ্ধ এসেছিল। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগরিত হয়েছিল। ভাষা-সংস্কৃতির লড়াই ছিল। আমি ১৯৭১ সালের ২ মার্চ প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তোলন করেছিলাম। আজ চিন্তা করে দেখুন পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে থেকে পাকিস্তানের পতাকা পদদলিত করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পতাকা ওড়ানো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হতে পারে। পরে আমিই সে পতাকা বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দিয়েছিলাম, তিনি উত্তোলন করেছিলেন; তখনো কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রই বহাল ছিল; তাঁর জন্যও এটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে ফাঁসিয়ে দিতে পারত। আমরা তা গ্রাহ্য করিনি।

বলতে দ্বিধা নেই, ১৯৬২ সালে নিউক্লিয়াস গঠনের পর থেকে একাত্তরের সশস্ত্র সংগ্রামের সবখানেই স্বাধীনতা অর্জনের অগ্রণী ভূমিকায় ছিল ছাত্রলীগ ও ছাত্রকর্মীরা। আমাদের কাছে এটা ছিল অঙ্গীকার-প্রত্যয়। যুদ্ধের শুরুতেই দাড়ি রেখে দিয়েছিলাম—প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যুদ্ধে না জয়লাভ পর্যন্ত এভাবেই  থাকব।

(লেখক : মুজিব বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সহ-অধিনায়ক। ডাকসুর সাবেক ভিপি। স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতা। বর্তমানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি) অনুলিখন : লায়েকুজ্জামান)



মন্তব্য