kalerkantho


মালিতে চার শান্তি সেনা নিহত

কাঁদছে স্বজনরা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



কাঁদছে স্বজনরা

মালিতে মাইন বিস্ফোরণে নিহত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্য জামাল উদ্দিনের চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাড়িতে চলছে মাতম। বাবার ছবি হাতে নির্বাক সাড়ে পাঁচ বছরের ছেলে রিহাদ। ছবি : কালের কণ্ঠ

মালিতে নিহত বাংলাদেশের চার সেনার পরিবারে এখন কান্নার রোল। তাঁদের গ্রামগুলোতেও শোকের ছায়া। বিদেশ থেকে বাবা কিছুদিনের মধ্যেই ফিরবেন—সেই স্বপ্নে দিন গোনা তাঁদের সন্তানরা এখন বারবার কাঁদছে আর চোখ মুছছে। গত বুধবার পুঁতে রাখা বোমার বিস্ফোরণে বাংলাদেশি সৈনিকদের নিহত হওয়ার ঘটনায় শোক ও পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীকে লক্ষ্য করে হামলা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। হামলার হোতাদের অবশ্যই আটক ও বিচার করা হবে।’

আমাদের পিরোজপুর প্রতিনিধি জানান, নিহত ওয়ারেন্ট অফিসার আবুল কালাম আজাদের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার উত্তর কলারদোয়ানিয়া গ্রাম ঘুরে এসে জানান, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন তাঁর স্ত্রী খাদিজা আক্তার। চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করছে তাঁর দুই সন্তান আশনিকা আজাদ ইমা ও ছেলে ফারদিল ইবনে আজাদ। গ্রামবাসী ভিড় করে ছিল তাঁর বাড়ি। স্ত্রী খাদিজা আক্তার বলেন, গত বছরের ২০ মে আফ্রিকার মালিতে যান তাঁর স্বামী। ওখানে গিয়ে যতবার ফোন দিয়েছেন, দিন গুনে গুনে বলতেন, ‘মাত্র এই ক’দিন পর ফিরছি দেশে।’ সর্বশেষ গত ২১ ফেব্রুয়ারি শেষ কথা বলেছিলেন, ‘আর মাত্র ৮৮ দিন পর দেশে আসব।’

পরিবার জানায়, মৃত মকবুল হোসেনের একমাত্র ছেলে আবুল কালাম আজাদ ১৯৯২ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ে আশনিকা দশম শ্রেণি এবং ছেলে ফারদিল চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।

আমাদের মাগুরা প্রতিনিধি জানান, নিহতদের একজন ল্যান্স করপোরাল আকতার হোসেন। গতকাল মোবাইল ফোনে তাঁর স্ত্রী রেনু খাতুনের সঙ্গে কথা বললে তিনি বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, তাঁর স্বামী মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার বরালিদহ গ্রামের আবু তালেব মোল্লার ছেলে। আকতার একসময় ময়মনসিংহে থাকতেন। যে কারণে চাকরিতে যোগদানের সময় ওই জেলার ঠিকানা দেওয়া ছিল। তাঁর শ্বশুরবাড়ি শ্রীপুরের নলখোলা গ্রামে। সেখানেই বাড়ি করেছেন আকতার।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রেনু বেগম জানান, ২৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তাঁদের দুটি মেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ে রিমি খাতুন এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছোট মেয়ে জান্নাতুল মাওয়ার বয়স সাত বছর। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে তাঁদের ভবিষৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

পাবনা প্রতিনিধি জানান, সৈনিক রায়হানের (৩১) দুই মাস পরে দেশে ফেরার আনন্দে উদ্ভাসিত পরিবার হঠাৎ তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে ভেঙে পড়েছে। রায়হান পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার কাশীনাথপুর ইউনিয়নের সমাজনারী গ্রামের মোসলেম উদ্দিনের বড় ছেলে। গতকাল দুপুরে ওই গ্রামে ঢুকতেই বোঝা যায়, রায়হানের মৃত্যু সংবাদে পুরো গ্রামটাই যেন মুষড়ে পড়েছে। প্রায় বাকরুদ্ধ তাঁর বাবা। মা রহিমা খাতুন আর স্ত্রী সোহানা আক্তারকে সান্ত্বনা দিতে পারছে না কেউই।

মা-বাবার দুই ছেলে আর এক মেয়ের মধ্যে রায়হান সবার বড়। ২০০৪ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১০ মাস আগে শেষ বাড়ি আসেন। বাবা মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘এরপর সে মিশনে যায়। বিদেশ থেকে প্রায় প্রতিদিন মা-বাবা, স্ত্রী আর বড় মেয়ে অপির (৬) সঙ্গে ফোনে কথা বলত। বাড়ির জন্য সব সময় সে উতলা থাকত।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সৈনিক মো. জামাল উদ্দিনের চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। তাঁর নিহত হওয়ার খবরে এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শিবগঞ্জ উপজেলার ঘোড়াপাখিয়া ইউনিয়নের ধুমিহায়াতপুর ঘাইসাপাড়া গ্রামে তাঁর বাড়ি। ব্যবসায়ী মেসের আলীর তিন সন্তানের মধ্যে বড় জামাল। ২০০৫ সালে যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। সাত বছর আগে বিয়ে করেন ফাহিমা আখতার শিল্পীকে। তাঁদের সাড়ে পাঁচ বছরের একটি ছেলে রয়েছে।

কালের কণ্ঠ’র কূটনৈতিক প্রতিবেদক জানান, জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক গত বুধবার রাতে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মালিতে শান্তিরক্ষী বাহিনীর ওপর হামলার খবর জানান। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব মালির মপতি অঞ্চলের দোয়েঞ্জা নামক স্থানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর আক্রান্ত হওয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।


মন্তব্য