kalerkantho


হোলির রঙে রক্তের লাল

পুরান ঢাকায় কলেজছাত্রকে ছুরি মেরে হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পুরান ঢাকায় কলেজছাত্রকে ছুরি মেরে হত্যা

এইচএসসি পরীক্ষার্থী রনোকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে খুন করে তাঁরই পরিচিতজনরা— এমন অভিযোগ স্বজনদের

দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে চলছিল আবির উৎসব। রং ছিটিয়ে চলছিল হোলি খেলা। এ উৎসবে যোগ দিতে তরুণ-তরুণীর একটি দল নিজেদের মধ্যে রং মাখামাখি করতে করতে কোর্ট হাউস স্ট্রিটে আদালতপাড়ার দিকে এগোতে থাকে। রেবতী ম্যানশনের কোনায় শনি মন্দিরের সামনে হঠাৎ জটলা দেখা দেয়। শুরু হয় দৌড়াদৌড়ি। এর মধ্যে একজন রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। হোলির রংমাখা কয়েকজন দৌড়ে পালিয়ে যায়। লুটিয়ে পড়া তরুণটি উঠে পাশে আদালতের কোনায় এক আইনজীবীর চেম্বারের সামনে গিয়ে বলতে থাকেন, ‘আমাকে বাঁচান...।’ তাঁকে সাহায্য করতে কয়েকজন এগিয়ে গিয়ে দেখে, হোলির রঙের সঙ্গে তাঁর শরীরের রক্ত মিশে একাকার হয়ে গেছে। হোলি খেলার ভিড়ে তাঁকে পেটানো ও ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। শেষে হাসপাতালে নেওয়া হলেও তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আদালতপাড়াঘেঁষা শাঁখারীবাজার রোডে শত শত মানুষ, আদালতপাড়ায় কর্তব্যরত পুলিশ ও আইনজীবীদের সামনে ঘটে এই হত্যাকাণ্ড। নিহতের নাম রওনক হোসেন ওরফে রনো (১৯)। তিনি আজিমপুর নিউ পল্টন লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র, এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। পুলিশ ও স্বজনরা বলছে, হোলি খেলায় অংশ নেওয়ার জন্য ডেকে এনে পরিকল্পিতভাবে রনোকে হত্যা করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রেমসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সমবয়সী সাত-আটজনের একটি দল রনোকে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রনোর এক বান্ধবী এবং আরিফ, সুমনসহ আটজনকে আটক করেছে পুলিশ। 

জানা গেছে, রনো কামরাঙ্গীর চর রনি মার্কেট এলাকার মৃত শহিদ মিয়ার ছেলে। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে রনো ছোট। তাঁদের পৈতৃক বাড়ি হাজারীবাগে। রনোর মা হেনা বেগম স্থানীয় ওয়ার্ডের মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী। তিনি জানান, গতকাল সকাল ৯টার দিকে ফোন এলে তাঁর ছেলে বাসা থেকে বের হন। ঘুরতে যাবেন বলে তাঁর কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে যান।

ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) এস এম মুরাদ আলী ঘটনাস্থলে গিয়ে বলেন, ‘হোলির মধ্যে কেউ ছুরি নিয়ে আসার কথা নয়। এটি পরিকল্পিত মনে হচ্ছে। কারা কিভাবে এ ঘটনা ঘটাল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জানে আলম বলেন, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে। এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। নিহতের কয়েকজন বন্ধু পলাতক।

রনোর বন্ধু মামুন, ফাহিম, আরিফ ও অমিত কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁরা দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে আবির উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন। গতকাল রং লেখার একপর্যায়ে তাঁরা দেখেন, রনো রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছেন। পরে দেখা যায়, শরীরের বাঁ পাশ জখম ও রক্তাক্ত। তাঁকে তিন বন্ধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। দুপুর সোয়া ১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। রনোর ডান ঊরুর নিচে ধারালো অস্ত্রের বড় জখম আছে। কারা রনোকে ছুরিকাঘাত করেছে তা জানাতে পারেননি তাঁর বন্ধুরা। তবে তাঁরা বলেছেন, এলাকায় প্রেমসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আগে থেকেই কয়েকজন যুবকের সঙ্গে তাঁর ‘গণ্ডগোল’ ছিল। হামলায় দুজন মেয়েও আহত হয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা।

খালাতো ভাই শামীম জানান, লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা এক কলেজছাত্রীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেম ছিল। মাস কয়েক আগে তাঁদের সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি লেগেই ছিল। পরে আরেক যুবকের সঙ্গে মেয়েটির প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রনো পুরনো সম্পর্ক আবারও জোড়া লাগানোর চেষ্টায় ছিলেন। কিন্তু মেয়েটি আর রাজি হয়নি। গতকাল সকালে হোলি উৎসবের নাম করে ওই মেয়ে মোবাইল ফোনে রনোকে লক্ষ্মীবাজারে ডেকে নেয়। এরপর মেয়েটির নতুন প্রেমিক ও তার বন্ধুরা মিলে রনোকে হত্যা করেছে বলে ধারণা করছেন শামীম।

যেখানে রনোকে ছুরি মারা হয়, সেখানে শহীদুল্লাহ মিয়া চায়ের দোকান চালান। তিনি বলেন, ‘কাউকে যে ছুরি মারা হয়েছে, এটা বোঝা যায়নি। আমরা মনে করেছি, সবই রং। যখন জটলার মধ্যে ছেলেটিকে ছুরি মারা হয়, তখন হৈচৈ শুরু হয়। আমার চায়ের দোকান ভেঙে যায়। আমি দোকান সামলানো নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। দেখি, একজন পড়ে যায়। আবার উঠে দাঁড়ায়।  কয়েকজন দৌড়ে চলে যায়।’

আইনজীবী চেম্বারের পাশেই একটি লন্ড্রির দোকানের মালিক সালাউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হোলির ওই মিছিলে প্রায় দেড় শ ছেলে-মেয়ে ছিল। তারা রং খেলছিল। হঠাৎ জটলার ভেতর থেকে একটি ছেলে দৌড়ে পাশের অ্যাডভোকেট চিত্তরঞ্জন তালুকদারের চেম্বারের সামনে চলে আসে। সেখানে চিৎকার করে। তখন বোঝা যায়, সে ছুরিকাহত হয়েছে। পরে শুনেছি সে মারা গেছে।’



মন্তব্য