kalerkantho


বাংলাদেশে ‘আইএস আছে’ ‘আইএস নেই’

দুই মার্কিন দূতের দুই রকম বক্তব্য

মেহেদী হাসান   

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



দুই মার্কিন দূতের দুই রকম বক্তব্য

আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়ার (আইএসআইএস, সংক্ষেপে আইএস) বাংলাদেশে উপস্থিতি নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুজন দূত। বাংলাদেশ সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ দেশে আইএসের উপস্থিতির কথা নাকচ করে আসছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর গত মঙ্গলবার ‘আইএস-বাংলাদেশ’ নামে কথিত এক জঙ্গিগোষ্ঠীকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার ঘোষণা দেয়। তবে এর পরদিনই ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেছেন, ‘আইএস-বাংলাদেশ’কে বৈশ্বিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার অর্থ আইএসের উপস্থিতি বোঝায় না।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কাউন্টার টেররিজম বিষয়ক সমন্বয়ক ও অ্যাম্বাসাডর-অ্যাট-লার্জ নাথান অ্যা সেলস গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম অঞ্চল, যেখানে আইএসের উপস্থিতি জোরালো হচ্ছে। বাংলাদেশ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

‘আইএস-বাংলাদেশ’ নামের গোষ্ঠীকে বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্তির দিন গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছিল, ‘বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি গোষ্ঠী ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে আইএসের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় ইতালির এক ত্রাণকর্মীকে গুলি করে হত্যার মধ্য দিয়ে ওই গোষ্ঠীর তৎপরতা শুরু হয়। তখন থেকে বাংলাদেশে অনেক হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ওই গোষ্ঠী ঢাকায় হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে ২২ জনকে হত্যার দায় স্বীকার করেছিল।’

আইএসকে পরাস্ত করতে আইন প্রয়োগের চেষ্টা জোরদারবিষয়ক দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন শেষ করেই গতকাল ভোরে বিশেষ ব্রিফ করেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাম্বাসাডর-অ্যাট-লার্জ নাথান অ্যা সেলস। সেখানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন গত মঙ্গলবার ‘আইএস-বাংলাদেশ’সহ আইএস সম্পর্কিত সাতটি গোষ্ঠী ও নেতাকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করেছেন।

নাথান অ্যা সেলস বলেন, ওই সন্ত্রাসীরা বিশ্বের নানা প্রান্তে আইএসের ‘রক্তক্ষয়ী প্রচারাভিযান’ বিস্তৃত করেছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে কায়রোর কপটিক খ্রিস্টান ক্যাথেড্রালে ‘আইএস-মিসরের’ হামলায় ২৭ ব্যক্তি নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আইএস-বাংলাদেশ’ ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে ২২ জনকে হত্যা করেছে।

বিশেষ ব্রিফিংয়ে সরাসরি প্রশ্ন উঠেছিল বাংলাদেশ বিষয়ে। অ্যাম্বাসাডর-অ্যাট-লার্জকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতির বিষয়ে কোনো ধারণা দিতে পারেন? আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের ব্যাপারেও? দক্ষিণ এশিয়ায় আইএসের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এ অঞ্চলের দেশগুলো, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে আপনারা কিভাবে সমন্বয় করছেন?’

জবাবে অ্যাম্বাসাডর-অ্যাট-লার্জ নাথান অ্যা সেলস বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বের অন্যতম অঞ্চল, যেখানে আইএসের উপস্থিতি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আমি আগে যেমনটি বলেছি, ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় হলি আর্টিজান বেকারি হামলায় ২২ জনকে হত্যা করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায়ও আমরা আইএস সম্পর্কিত গোষ্ঠী ‘আইএস-খোরাসানের’ কর্মকাণ্ডে নজর রাখছি। এটি ক্রমেই উচ্চাভিলাষী ও সক্রিয় হয়ে উঠছে।” তিনি বলেন, ওই গোষ্ঠীগুলোর ঝুঁকি অনুধাবন ও মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে। ওই গোষ্ঠীগুলো কেবল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, এ অঞ্চলের সরকারগুলোর জন্যও ঝুঁকি।

নাথান অ্যা সেলস আরো বলেন, সন্ত্রাসীরা একটি সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে আরেকটি সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যায়। তাই তাদের প্রতিরোধ করতে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের সরকারগুলোর সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে সহায়তা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের বিষয়ে তথ্য বিনিময় করছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অংশীদার রাষ্ট্রগুলোকে অভিন্ন ঝুঁকি অনুধাবন করানোর মাধ্যমে আমরা তা মোকাবেলায় সক্ষম হব।’

এর আগে গত বুধবার ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেছিলেন, ‘আইএসের নামে এখানে কিছু গোষ্ঠী ও ব্যক্তি সহিংস তৎপরতা চালাচ্ছে। এখানে আইএস আছে, আমরা তা বলছি না। তাদের শাখা আছে, তা-ও বলছি না। এরা শাখা খোলে না। তবে আমরা বলেছি, আন্তর্জাতিক ওই সন্ত্রাসী সংগঠনটির সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু লোক নানাভাবে জড়িত আছে। এরা নানাভাবে সম্পৃক্ত। অর্থকড়ি থেকে শুরু করে অস্ত্রসহ নানাভাবে তারা সহায়তা পায়।’ বার্নিকাট বলেন, সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার ফলে তাদের আর্থিক সহায়তা, অস্ত্রের জোগান দেওয়াসহ যেকোনো মদদে যুক্ত লোকজনকে আইনের আওতায় আনা সহজ হয়ে যায়। সন্ত্রাসের মতো দুষ্কর্মে মদদদাতাদের বিচার করে শাস্তি দিতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশ সক্রিয় থাকলেও ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নেতৃত্বে আইএসবিরোধী বৈশ্বিক জোটে যোগ দেয়নি। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নীতিগত কারণেই বাংলাদেশ ওই সিদ্ধান্ত নেয়। আইএসবিরোধী বৈশ্বিক জোট যে পাঁচটি কৌশল নিয়ে কাজ করছে তার তিনটি (সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধ, বিদেশি সন্ত্রাসীদের চলাচল রোধ ও আইএসের পক্ষে প্রচার ঠেকানো) বাংলাদেশ আরো অনেক আগে থেকেই করে আসছে। বাকি দুটি কৌশলের একটি সামরিক সহায়তা এবং অন্যটি মানবিক সহায়তা প্রদান। এ দুটি বিষয়ে বাংলাদেশ সম্পৃক্ত হতে চায়নি। বর্তমানে আইএসবিরোধী বৈশ্বিক জোটের অংশীদার ৭৫টি দেশ ও সংস্থা।



মন্তব্য