kalerkantho


আইএসের উপস্থিতির তকমা দিল যুক্তরাষ্ট্র

কথিত ‘বাংলাদেশ শাখা’ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত

বিশেষ প্রতিনিধি   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আইএসের উপস্থিতির তকমা দিল যুক্তরাষ্ট্র

সরকার বাংলাদেশে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়ার (আইএসআইএস, সংক্ষেপে আইএস) উপস্থিতি অস্বীকার করে এলেও শেষ পর্যন্ত কথিত আইএসআইএসের বাংলাদেশ শাখাকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে কথিত ‘আইএসআইএস-বাংলাদেশ’সহ আইএসআইএস অনুগত তিনটি শাখাকে ‘ফরেন টেররিস্ট অর্গানাইজেশন (এফটিও)’ ও ‘স্পেশালি ডেজিগনেটেড গ্লোবাল টেররিস্ট’ (এসডিজিটি) হিসেবে তালিকাভুক্ত করার কথা জানিয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন এলাকায় কথিত ওই সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সব সম্পদ ও স্থাপনা বাজেয়াপ্ত হবে। এ ছাড়া জেনেশুনে ওই সংগঠনগুলোকে বস্তুগত ও অবস্তুগত সহায়তা দেওয়া বা দেওয়ার চেষ্টা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

কথিত আইএস বাংলাদেশ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি গোষ্ঠী ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে আইএসের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় ইতালির একজন ত্রাণকর্মীকে গুলি করে হত্যার মধ্য দিয়ে ওই গোষ্ঠীর তৎপরতা শুরু হয়। তখন থেকে বাংলাদেশে অনেক হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ওই গোষ্ঠী ঢাকায় হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশিসহ ২২ জনকে হত্যার দায় স্বীকার করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বলে আসছিলাম যে বাইরের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আমাদের দেশের সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ নেই। তাদের (যুক্তরাষ্ট্রে) দৃষ্টিকোণ থেকে তারা হয়তো মনে করেছে এ সংগঠনগুলো বিপজ্জনক। এ কারণেই তারা হয়তো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।’

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমাদের যতটুক সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার এখন তা করতে হবে। তারা তাদের দিক বিবেচনা করে কাজ করেছে। আমাদের এখন কাজ করতে হবে যাতে এ ধরনের সংগঠন তৎপরতা চালাতে না পারে এবং আমাদের বাংলাদেশের সুনাম যেন ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে।’

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বিগত বছরগুলোতে একের পর এক উগ্রবাদী হামলায় কূটনৈতিক মহলে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কর্মী জুলহাজ মান্নান এবং দুই বিদেশিকে হত্যার ঘটনাও ঢাকায় বিদেশি দূতাবাসগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। বিশেষ করে, ঢাকায় সুরক্ষিত কূটনৈতিক জোনের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে। তবে সরকারের ব্যাপক উদ্যোগে ঢাকাস্থ কূটনীতিকরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশ সরকার বরাবরই বলে আসছে, এ দেশে সন্ত্রাসী হামলা চালানো ব্যক্তিরা এ দেশেরই নাগরিক। প্রচারণা পাওয়ার জন্য কেউ নিজেকে আইএস বলে দাবি করে থাকতে পারে। তবে এ দেশে আইএস বলে কিছু নেই।

২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজান হামলার পর ২৯ আগস্ট ঢাকা সফর করেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। তিনি ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টই বলেছিলেন, ইরাক ও সিরিয়ায় সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের যোগসূত্র থাকার বিষয়ে আর কোনো দ্বিমত নেই। প্রমাণ আছে, ইরাক ও সিরিয়ার আইএসের সঙ্গে বিশ্বের আটটি অঞ্চলের যোগাযোগ আছে এবং দক্ষিণ এশিয়া তাদের অন্যতম।

তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো এখানেও এসব জঘন্য সহিংসতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সন্ত্রাসের মদদদাতাদের কোনো রাষ্ট্রীয় সীমারেখা নেই।’

জন কেরি বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যেই বলেছে ও স্পষ্ট করেছে যে এ দেশের কারো কারো সঙ্গে তাদের কিছু না কিছু যোগাযোগ আছে।

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আইএসের প্রতি আনুগত্য স্বীকারকারী হিসেবে কথিত আইএস-বাংলাদেশকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। ওই তালিকাভুক্তির আলোকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, অর্থ দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এখন থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থেকে নিয়মিতভাবেই এটি করে আসছে। গত বছর সিরিয়ায় আইএসের সাম্রাজ্যের পতন ঘটলেও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আগামী দিনগুলোতে ঝুঁকি আরো বাড়ার আশঙ্কা করেছিলেন। তাঁদের জোরালো ধারণা, আইএসের কর্মীরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করবে বা অন্যত্র ছড়িয়ে পড়বে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ যে সন্ত্রাস দমনে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে তাও স্বীকার করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপত্তা খাতে জোরালো সহযোগিতা রয়েছে।

৪০ আইএস নেতা ও শাখাকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত : যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, তারা ৪০ জন আইএস নেতা ও সংগঠনকে সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তারা যাতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থায় ঢুকতে না পারে সে প্রচেষ্টা ওয়াশিংটন অব্যাহত রাখবে। বিশ্বব্যাপী আইএসের নিরাপদ জাল ধ্বংস, বিদেশি সন্ত্রাসীদের দলে ভেড়ানো এবং অনলাইনে সন্ত্রাসী প্রপাগান্ডা ঠেকানোই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য।


মন্তব্য