kalerkantho


এইচএসসির প্রশ্ন ফাঁসের আগাম ঘোষণা

♦ সৌদি থেকেও অনলাইন পেজ চালাচ্ছে চক্র
♦ সিআইডির ১৫ সুপারিশ

এস এম আজাদ   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এইচএসসির প্রশ্ন ফাঁসের আগাম ঘোষণা

এবারের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের নজরদারির মুখে ওই চক্র সৌদি আরব থেকেও অনলাইন পেজ ও গ্রুপ চালাচ্ছে বলে জানতে পেরেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সংঘবদ্ধ অপরাধবিষয়ক দল। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্তে এ তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।

তবে অনলাইনে ঘোষণা দিয়ে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করলেও এর নেপথ্যের কারিগরদের শনাক্ত করতে পারছে না গোয়েন্দাদল। পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন, সংরক্ষণ এবং পরীক্ষা পর্যন্ত ব্যবস্থাপনায় কিছু দুর্বলতা থাকায় প্রথম যে বা যারা প্রশ্ন ফাঁস করেছে তাদের ধরা যায়নি বলে সিআইডির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী চক্রকে ধরতে না পারার ক্ষেত্রে ছয়টি দুর্বলতা শনাক্ত করেছেন সিআইডির গোয়েন্দারা। এ জন্য গত ১৯ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সদর দপ্তরে সুনির্দিষ্ট ১৫টি সুপারিশ করেছেন তাঁরা। পুলিশ সদর দপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পরীক্ষাসংক্রান্ত আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাধ্যমে এসব সুপারিশ তুলে ধরবে।

এদিকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), র‌্যাব ও সিআইডির তদন্তে দেখা গেছে, এসএসসি পরীক্ষার ১২টি প্রশ্নই ফাঁস হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ পরীক্ষার দিনে হলেও কয়েকটি পরীক্ষায় আগের দিন ফাঁস হওয়ার তথ্য মিলেছে।

পরীক্ষা চলাকালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে অন্তত ১৫৩ জন। এদের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রযুক্তির বিশ্লেষণ করে প্রশ্ন ফাঁসকারী পেজ ও গ্রুপের হোতাদের শনাক্তের চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা। ‘রকি ভাই’ ও ‘টপ টেন’সহ ছয়টি গ্রুপের অর্ধশতাধিক অ্যাডমিনকে নজরদারি করা হচ্ছে।

অন্যদিকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর এখনো এক মাস বাকি থাকতেই শতাধিক গ্রুপে এই পরীক্ষার প্রশ্ন দেওয়ার আগাম ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। এসব গ্রুপের হোতাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলেও তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধবিষয়ক দলের প্রধান, বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্ল্যা নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁসকারীদের মাথা ধরতে আমরা কাজ করছি। এরই মধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছি। তবে গোড়ায় যেতে পারিনি বলে আপনাদের (গণমাধ্যম) বলিনি। এমনও তথ্য পেয়েছি যে সৌদি আরব থেকেও গ্রুপ চালানো হচ্ছে। বেশ কিছু দুর্বলতার কারণে আমরা গোড়ায় পৌঁছতে পারছি না। তদন্তের স্বার্থে এর বেশি প্রকাশ করব না।’

এক প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কাছে যেসব বিষয় সমস্যা মনে হয়েছে তা আমরা হেডকোয়ার্টারকে জানিয়েছি। সিস্টেমে কিছু পরিবর্তন আনলে প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানো যাবে বলে আমরা মনে করি। তখন এ অপরাধ হলেও অপরাধীকে ধরা যাবে।’

সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধবিষয়ক দলের পক্ষ থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে—প্রশ্নপত্র প্রণয়নের জন্য প্রতিটি বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের দিয়ে আলাদা কমিটি গঠন করতে হবে। এসব সদস্যের ঠিকানা, মোবাইল ফোন নম্বরসহ বিস্তারিত তথ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী/গোয়েন্দাদের কাছে দিতে হবে। প্রশ্ন ছাপতে হবে অটোমেটিক মেশিনে, যেখানে অটোমেটিক প্যাকেট হয়ে যাবে। ছাপার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফোন নম্বরও প্রশাসন/গোয়েন্দাদের দিতে হবে। প্রতিটি প্রশ্ন ছাপার জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আলাদা কমিটি গঠন করতে হবে, যেন কার দায়িত্ব ছিল তা শনাক্ত করা যায়। ছাপার জন্য কপিপ্রুফ পেপার ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতিটি প্রশ্নের জন্য সিরিয়াল নম্বর থাকতে পারে, এতে কোন স্থানের কোন প্রশ্নের ছবি তোলা হয়েছে তা বোঝা যাবে। যেখানে ছাপা হচ্ছে সে প্রেসে ঢোকা ও বের হওয়ার পথে সিসি ক্যামেরা থাকতে হবে। ছাপাখানার দায়িত্বে কোন কর্মকর্তা থাকবেন তা ছাপার ৩০ মিনিট আগে নির্ধারিত হবে। প্রশ্ন ছাপার পর নির্দিষ্ট কেন্দ্রের জন্য আলাদা অস্বচ্ছ প্লাস্টিকের বাক্সে এমনভাবে সিল করে ঢোকাতে হবে যেন একবার খুললে আর আটকানো না যায়।

সিআইডির সুপারিশে আরো বলা হয়েছে, প্রশ্নপত্র পরিবহনের ক্ষেত্রে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির প্রশ্ন পরিবহনে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয় তা অনুসরণ করা যেতে পারে। উপজেলা পর্যায়ে প্রশ্ন পরিবহনেই বেশি প্রশ্ন ফাঁস হয় বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে সিআইডি। এ কারণে জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশ্ন বুঝিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি আলাদা দল গঠনের সুপারিশ করছে সিআইডি। প্রতিটি পরীক্ষার জন্য আলাদা দল থাকবে। পরীক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষক-কর্মচারীসহ কোনো ব্যক্তি যোগাযোগ ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবেন না।

সিলগালার ব্যাপারে সিআইডি বলছে, যিনি প্রশ্ন গ্রহণ করবেন তিনি সব সিলগালা বা ট্যাগ বা ওয়ানটাইম ঠিক আছে কি না তা পরীক্ষা করে নেবেন। ভাঙা সিল থাকলে তিনি সে বাক্স গ্রহণ করবেন না এবং কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। তা না করলে প্রশ্ন গ্রহণকারী দায়িত্ব বহন করবেন।

সিআইডির এক কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তদন্তে নেমে আমরা অসংখ্য গ্রুপ ও পেজ পেয়েছি—যেখান থেকে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে অনেককেই। এরা কেউই চক্রের পেছনে কারা তা বলতে পারছে না। সৌদি আরব থেকে যে গ্রুপ চালানো হচ্ছে, সেই অ্যাডমিনের ভাইকে আমরা আটক করেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য ফাঁসকারী চক্র। পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে সেটা খুব কঠিন মনে হচ্ছে।’

এদিকে ডিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তিনটি ধাপে প্রশ্ন ফাঁস হয়ে অনলাইনে ছড়াচ্ছে। তবে প্রথম ধাপের যারা, প্রশ্ন দিয়েই কাট-আউট পদ্ধতিতে বের হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপেরও অনেকে বের হয়ে যায়। ফলে ওদের নাগাল পেতে অন্য লাইনে যেতে হবে।’

অনলাইনে এইচএসসির প্রশ্ন ফাঁসের আগাম ঘোষণার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবির যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন, ‘যারা প্রশ্ন ফাঁসের এ ধরনের আগাম ঘোষণা দিচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করা হচ্ছে। আমরা এসব গ্রুপের হোতাদের খুঁজছি।’

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের প্রধান ও উপকমিশনার মো. আলিমুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ১৩টি চক্রকে শনাক্ত করতে পেরেছি। তারা প্রত্যেকেই মধ্যস্বত্বভোগী। তারা শুধু টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন সংগ্রহ করে।’ আর র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়ার উজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যাদের ধরেছি তারা প্রশ্ন সংগ্রহ করে অনলাইনে বিক্রি করে। ফাঁসকারীদের ধরতে প্রযুক্তির অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন।’


মন্তব্য