kalerkantho


নোবেলজয়ী তিন নারী কক্সবাজারে

কোথায় ইরান কোথায় সৌদি কোথায় আরব আমিরাত

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কোথায় ইরান কোথায় সৌদি কোথায় আরব আমিরাত

নোবেল বিজয়ী তিন নারী—শিরিন এবাদি, মেরেইড ম্যাগুয়ার ও তাওয়াক্কল কারমান গতকাল রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী তিন নারী মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আরেক নোবেল জয়ী নারী অং সান সু চির বিচার ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে পদত্যাগের দাবি করেছেন। উখিয়ার থাইংখালী তাজনিমারখোলা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন ইয়েমেনের তাওয়াক্কল কারমান, উত্তর আয়ারল্যান্ডের মেরেইড ম্যাগুয়ার ও ইরানের শিরিন এবাদি। তাঁরা বলেন, ‘মিয়ানমারে যেভাবে জাতিগত নিধন, গণহত্যা, গণধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও শিশু হত্যার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটেছে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এর বিহিত হতেই হবে। এ জন্য তাঁরা আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কামনা এবং মুসলিম বিশ্বকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।’

শিরিন এবাদি বলেন, ‘আজ বাংলাদেশে এসে পরবাসে জীবনযাপন করছে মিয়ানমারের রাখাইনে নির্যাতিত, নিপীড়িত লাখ লাখ রোহিঙ্গা। তাদের জন্য অমুসলিম রাষ্ট্রগুলো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা দাবি করছে আন্তর্জাতিক বিশ্বের হস্তক্ষেপও। অথচ তাবৎ বিশ্বের প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলো আজ চুপ মেরে আছে। বিষয়টি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলেও বিস্মিত হওয়ার কথা!’ তিনি একপর্যায়ে রাগতস্বরে প্রশ্ন করেন, ‘আজ এমন সংকটময় সময়ে ওরা কোথায়? কোথায় ইরান? কোথায় সৌদি আরব? আজ কাতার কোথায়? কোথায় আরব আমিরাত? তারা রোহিঙ্গা মুসলিমদের সেবায় আসছে না কেন?’

এ সময় তাওয়াক্কল কারমান চোখের পানি মুছে বলেন, ‘আমরা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের কথা অনেক শুনেছি। আজ বাস্তবে দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না। এই অমানবিক নির্যাতনের জন্য আমার বোন অং সান সু চির পদত্যাগ করা উচিত।’ তাওয়াক্কল কারমান বলেন, অং সান সু চি মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর হিসেবে রোহিঙ্গাদের ওপর এ রকম ভয়াল নির্যাতনের দায়ভার এড়াতে পারেন না। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে নির্যাতনের বিবরণ শুনে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারছি না।’

মেরেইড ম্যাগুয়ার বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও মানবিক সেবা দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে উদারতা দেখিয়েছেন তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ১০ লক্ষাধিক নির্যাতিত লোককে আশ্রয় দেওয়া কোনোভাবেই ছোট বিষয় নয়।’ রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার দিয়ে স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানান। ম্যাগুয়ার বলেন, ‘রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ, উত্পীড়ন ও নির্যাতন করার দায়ে অং সান সু চি ও তাঁর সরকারের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হওয়া উচিত।’

এর আগে দুপুর ২টার দিকে তিন নোবেল বিজয়ী উখিয়ার থাইংখালী তাজনিমারখোলা রোহিঙ্গা  আশ্রয় শিবিরে পৌঁছলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও এনজিও সংস্থা সংশ্লিষ্টরা তাঁদের বরণ করেন। ক্যাম্পে উপস্থিত সরকারের উপসচিব মোহাম্মদ শাহীন তাঁদের জানান, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের পাশাপাশি সব ধরনের মানবিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

নোবেল বিজয়ীরা পরে তাজনিমারখোলা ক্যাম্পে একটি কক্ষে অপেক্ষমাণ মিয়ানমারের রাশিদংয়ের ছেয়াপ্রাং গ্রামের স্বামীহারা রোহিঙ্গা সাবেকুন নাহার (৩০), সন্তানহারা নুরজাহান (২৮), ছুফাইয়া বেগম (২০), মিয়ানমার সেনা কর্তৃক ধর্ষিত ফাতেমা খাতুন (২৫), রাজেয়া বেগম (২৩) ও ছেহের খাতুনের (২৪) মুখে নির্যাতনের বিবরণ শোনেন। এসব নির্যাতিত রোহিঙ্গা নারী পরে সাংবাদিকদের জানান, নোবেল বিজয়ীরা তাঁদের কিভাবে নির্যাতন করা হয়েছে তা জানতে চেয়েছেন।

নোবেল বিজয়ী তিন নারী গত দুই দিন ধরে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির ঘুরছেন কোনো পুলিশি নিরাপত্তা বা সহায়তা  ছাড়াই। বিদেশি ভিআইপি অতিথি এলে অনেক সময় বাড়তি নিরাপত্তার কারণে দীর্ঘ যানজট দেখা যায়। জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়। এই তিনজন ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁদের আনা-নেওয়াসহ দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা এনজিও নারীপক্ষর কর্মকর্তা শিরীন হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নোবেল বিজয়ীরা অবশ্যই ভিআইপি। কিন্তু তাঁরা শান্তিতে নোবেল বিজয়ী। তাই তাঁরা নিজেরাই পুলিশি নিরাপত্তা নিতে রাজি হননি।’ এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, নোবেল বিজয়ীরা মনে করেন, পুলিশি নিরাপত্তা নেওয়া মানেই যানজটের ফলে অন্যদের ভোগান্তির মুখে ফেলা।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ড. এ কে এম ইকবাল হোসেন বলেন, ‘রবিবার নোবেল বিজয়ীদের নিরাপত্তা দিতে যথারীতি আমার পুলিশ দল কক্সবাজার বিমানবন্দরে গিয়েছিল। কিন্তু নোবেল বিজয়ীরা পুলিশের নিরাপত্তা দলকে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়েছেন।’ এ রকম নজির খুব কম দেখা যায় বলেও জানান তিনি।


মন্তব্য